03/03/2023
শ্যামনগর সবুজ সংঘের আজীবনের সভাপতি, বাংলার কৃতি সন্তান তথা ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলার শ্রী সুব্রত ভট্টাচার্য আমাদের সকলের প্রিয় বাবলুদার শুভ জন্মদিনে তাকে ক্লাবের পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই॥
নিজের লেখাটি বাংলার আর এক কৃতি ফুটবল সংগঠক Nabab Bhattacharya র কলম থেকে সংগৃহিত।
ভালোবাসার মানুষ টা সম্মন্ধে লেখা, দেবাশিস সেনগুপ্ত দার লেখা, হুবহু কপি পেস্ট করে দিলাম, এখন দেখি নতুন প্রজন্মের অনেক মানুষ বাবলু দা কে ট্রোল করে, তাদের জানবার জন্যেও এই লেখা। দিনের শেষে আমি কিন্তু মোহনবাগানের সমর্থক নই, তবে আমি বলি বা না বলি, বাবলু দাই বাংলা ফুটবলের উত্তমকুমার। ভদ্রলোকের সাথে বহু সময় কাটিয়েছি ব্যক্তিগত পরিসরে, কোচিং পরিসরে, অদ্ভুত চরিত্র এই পরোপকারী দুর্বাসা মুনির। ভালো থেকো, সুস্থ থেকো ....
সুব্রত ভট্টাচার্য (বাবলু দা)
লেখক - দেবাশিস সেনগুপ্ত..
"বাঙাল মোহনবাগানী"দের একাধারে দু'টো "গল্প হলেও সত্যি" থাকে। সমর্থক ফুটবলার নির্বিশেষে।একটা একরোখা লড়াইর। আর একটা অনন্ত ঐতিহ্যর। আজ এক "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলারের গল্প। যে তার সূর্যোজ্জ্বল কেরিয়ারের টানা ১৭টা বছর (১৯৭৪ - ১৯৯০) বন্ধক রেখে দিয়েছিল তার প্রিয় ক্লাবের কাছে। এবং তার ক্লাবের অনেক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় এসেছিল যাদের হাত ধরে, তাদের পুরোভাগে ছিলেন অজস্র উচ্চতার ঐ "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলার।💚❤
১৯৭৪।
আমি ১৬। সদ্য হায়ার সেকেন্ডারী শেষ হয়েছে।বাবা-র সাথে মোহনবাগান মাঠে (তখনকার বাবা-দের কি জ্বালা ছিল, বুকে লাল-হলুদ আর মাথায় দেশভাগের যন্ত্রণা ভরেও ছেলেকে নিয়ে যেতে হত 'প্রতিপক্ষ'-র মাঠে, ওদের খেলা দেখাতে)। বনাম ইস্টার্ণ রেল। স্মরণীয় কালের অন্যতম দুর্বল দল সেবার মোহনবাগান। ড্র হলো ম্যাচ। যথারীতি ম্যাচশেষের ঝামেলা। এখনকার "সমর্থক"রা সে সব আর দেখলো কই? বাবা-ছেলে বেঁচে ফিরলাম কোনমতে। কিন্তু এক "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলার মনে ঢুকে গেলেন এক "বাঙাল মোহনবাগানী" সমর্থকের। ঐরকম ডাকাবুকো, লড়াকু ডিফেন্ডার আমি দেখিনি আজ অবধি (মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য-কে মনে রেখেও)। ঐ সময়ের ব্যর্থতার ইতিহাস যাদের জন্য অতীত হয়ে যায়, তাদের নেতা ছিলেন "বাঙাল মোহনবাগানী" ঐ ফুটবলার।
১৯৭৯।
রত্নখচিত দল সেবার ইস্টবেঙ্গল। লীগ শীল্ড সব পেলো ঐ "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলারের দল। লীগে সম্ভবত স্পোর্টিং ইউনিয়ন/পোর্ট ট্রাস্ট ম্যাচে ৬৭ মিনিট অবধি ০-০। কর্মস্থল (ব্যাঙ্কের চাকরী) রাণীগঞ্জে রাস্তায় নেমে এসে এক অশান্ত একুশ বছর বয়সী সমর্থকের ছোট্ট রেডিও সেট কানে অস্থির পদচারণাটা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। শেষ ৩ মিনিটে ৩ গোল দিল ঐ "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলারের দল। তার মধ্যে একটা গোল আর একটা অ্যাসিস্ট ঐ "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলারের। শান্তিতে মেসে ফেরে ঐ অশান্ত একুশ বছর বয়সী সমর্থক। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ ঐ "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলার সমার্থক হয়ে যান মোহনবাগানের। তার জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারত তখন যে কোন মোহনবাগান সমর্থক।
১৯৯০।
ঝামেলা শুরু হয়েছিল ক্লাবের একশ্রেণীর কর্তার সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরেই। তিনি বুঝে গেলেন, ওটাই হতে যাচ্ছে ক্লাবে তার শেষ বছর।সমর্থকরাও। লীগের শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ বি এন আর। মোহনবাগান মাঠে আর বাইরে যা লোক হয়েছিল সেদিন, তাতে ইডেন ভরে যেত অনায়াসেই। ১-০ গোলে জেতা সে ম্যাচেও সেরা ফুটবলার তিনিই। গোলটা কৃষ্ণেন্দু রায়ের করা। লীগ জিতে নেয় মোহনবাগান সেবার ঐ ম্যাচটা জিতে। টিকিট শেষ। ঢুকতে পারিনি মাঠে।দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকে গেটক্র্যাশ হয় তাকে ক্লাবের হয়ে শেষবার খেলতে দেখার জন্য। তখন মাঠে ঢুকি আমিও। সেবারেই মার্চ মাসে ১৯৮৯-এর আই এফ এ শীল্ড ফাইনাল খেলা হয়েছিল। মোহনবাগানের হয়ে তার শেষ আই এফ এ শীল্ড ম্যাচে তার সেন্টার থেকে করা গোলেই ফাইনালে টি এফ এ-কে হারিয়ে শীল্ড জেতে মোহনবাগান।
১৯৯১।
তবু তার কেরিয়ার শেষ হয় এই বছর।ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়েও সেবার তাকে কিনতে পারেনি মনোরঞ্জনকে হারিয়ে বেপরোয়া ও মরিয়া ইস্টবেঙ্গল। এক বিরাট ফুটবলারের লড়াকু ফুটবল জীবন অধ্যায় মাঝপথে মুড়িয়ে যায়। তখন তিনি "মাত্র ৩৮"। টানা ১৭ বছর "ঘটি"দের ক্লাবে বুক চিতিয়ে খেলে সেই কর্তাদের কারণে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলার। ঐ ১৭টা বছর নিজের চোখে দেখে ফেলেছিল ১৯৯০-এ তখনই ৩২ সেই ছেলেটা। কি আর করে সেই "বাঙাল মোহনবাগানী" সমর্থক? "বাঙাল মোহনবাগানী"-ই থেকে গেল।
ঐ "বাঙাল মোহনবাগানী" ফুটবলারের আজও "হাত কাটলে সবুজ মেরুন" রঙ বেরিয়ে আসে।আপাদমস্তক লড়াই আর ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরী ঐ ফুটবলার আজও কোটি কোটি মোহনবাগান সমর্থকের হার্টথ্রব। যতদিন কলকাতায় ফুটবল থাকবে, ততদিন থাকবেন ঐ ফুটবলার ঐ সমর্থকদের হৃদয়ে।💚❤
৭ বার কলকাতা লীগ (১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৬, ১৯৯০), ৮ বার আই এফ এ শীল্ড (১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৮৯), ৬ বার ফেডারেশন কাপ (১৯৭৮, ১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৮৭), ৮ বার ডুরান্ড কাপ (১৯৭৪, ১৯৭৭, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬), ৫ বার রোভার্স কাপ (১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৮১, ১৯৮৫, ১৯৮৮), ১ বার এয়ারলাইন্স গোল্ড কাপ (১৯৮৯), ৫ বার বরদলুই ট্রফি (১৯৭৪, ১৯৭৫, ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৮৪), ৪ বার সিকিম গোল্ড কাপ (১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬, ১৯৮৯), ৪ বার দার্জিলিং গোল্ড কাপ (১৯৭৫, ১৯৭৬, ১৯৭৯, ১৯৮২), ২ বার নাগজী ট্রফি (১৯৭৮, ১৯৮১), ১ বার জে সি গুহ মেমোরিয়াল ট্রফি (১৯৮৮) - এই ৫১টি ট্রফি লিখে রেখেছে ভারতের ফুটবল ইতিহাস মোহনবাগানের খেলোয়াড় সুব্রত ভট্টাচার্যের নামে। হৃদয় দিয়েই ফুটবলটা খেলে ১৭ বছরে মোহনবাগানের হয়ে ৫১টি ট্রফি জিতে ও ৪১টি গোল করে স্টপার সুব্রত ভট্টাচার্য প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ফুটবল মূলত হৃদয়জনিত মহাকাব্যিক খেলা।🙏🙏
১৯৮৯ সালে অর্জুন পুরস্কার পেলেও 'ঘরের'ক্লাব থেকে সেভাবে বিশেষরকম সম্মান পাননি তেমন। পেশাদার কোচ হিসেবেও বাগানে বেশ কয়েক ধাপে কোচিংয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০১৭তে ঘরের ছেলে কে স্বীকৃতি দিল মোহনবাগান। ওনাকে ২০১৭ সালের মোহনবাগান রত্ন সম্মানে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন বাগান কর্মকর্তারা। এর ফলে ওনার নয়, বাগান জনতার দীর্ঘদিনের আক্ষেপ মিটল এমনটাই মনে করেছে ময়দান মহল। ১৯৭৪ থেকে ৯০ সাল অবধি দীর্ঘ ১৭ বছর শুধুমাত্র সবুজ মেরুন জার্সিতেই খেলেছেন তিনি। ভারতের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার মোহনবাগানের এই টাফ স্টপার পেশাদার ফুটবলার হিসেবে কখনও অন্য ক্লাবের প্রস্তাবে সাড়া দেননি।
আজ তার ৭১তম জন্মদিন। নানা উদযাপনে ভালো কাটুক তার আজকের দিন। প্রতি সপ্তাহান্তে তিনি যেখানে নিয়মিত পৌঁছে যান আজও, সেই শ্যামনগরে তার গড়া ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আজ তার জন্মদিন পালন হয় প্রতি বছর, এখনো।এবারেও হবে।
তিনি। যাকে দেখে আমার শেষ পারানির কড়ি আর একমাত্র ঠিকানা হয়ে গিয়েছিল মোহনবাগান। যার নাম উচ্চারিত হলে আমরা একটাই শব্দ শুনতে পেতাম, যার নাম “লড়াই”।যাকে আমি এবং আপামর মোহনবাগানী চিনি বাবলুদা নামে।
নিজের গলফ গ্রীনের বাড়ির "একদিক খোলা বারান্দা"-তে ভালো থাকুন অনেক সহখেলোয়াড়ের প্রয়াণের পরে "আপাত একাকী" বাবলুদা।আমরা সবাই তো "আপাত একাকী" হবার গলি থেকে রাজপথেই হাঁটছি এখন।
ভালো থাকুন।
মোহনবাগানে থাকুন।
শুভ জন্মদিন, সুব্রত ভট্টাচার্য।🙏🙏💚❤
[Disclaimer:- এটি জন্মদিনের পোস্ট। এটি ভালবাসার পোস্টও। সেই সুর না কাটাই অভিপ্রেত।]