15/12/2023
~ আমি সেই মেয়ে ~
সুব্রত ঘোষ
******************************************
আমি সেই মেয়ে। বাবা মায়ের আদর যত্নে যার শৈশব ছিল আনন্দময়। পড়তাম,খেলতাম,ছবি আঁকতাম। মা বলেছিলেন তুই নাচ শেখ। বাবা চেয়েছিলেন গান। অবশেষে দুটোই। নেচে গেয়ে নানা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার তখন আমার কাছে জলভাত। আমার সাফল্যে ওঁরা খুশি হতেন। ঠাম্মা,ঠাকুরদা,কাকা,জ্যাঠারা খুব আনন্দ করতেন। বলতেন, " মা,আমাদের রূপবতী,গুণবতী। " হাতে পায়ে চঞ্চল ছিলাম বলে পাড়ার লোকে দস্যি বলতেন। জীবনযাত্রার গতি ছিল স্বাভাবিক,সুসজ্জিত।
বয়স বাড়তে লাগল
মাধ্যমিক পরীক্ষা। মা বললেন, " নাচ,গান থাক, পড়াশুনা কর। স্টার পেতে হবে।" কিন্তু বাবা? আমার গলায় রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে যিনি পৃথিবীর যাবতীয় শোক তাপ নিমেষে ভুলে যেতেন। তিনি বলেই ফেললেন, " পাড়া গেঁয়ে মেয়েদের এত নাচগান মানায় না। চাকরির যা বাজার,খুব ভালো রেজাল্ট না করলে ভবিষ্যৎ খুব কষ্ট পেতে হবে। আমি কিন্তু নাচ আর গান অন্তর থেকে ভালোবেসেছিলাম। বহু মানুষ আমাকে ধিঙ্গি বলতেন,আমি কানে নিতাম না। নিজের ভালোবাসাকে নেশায় পরিনত করে ফেলেছিলাম। পরিবারের ভাবনা,যখন রকে বসে থাকা নিছক পরচর্চার সাথে মিলে গেল তখন কেমন যেন একা হয়ে পড়লাম। মন থেকে ভেঙে পড়লাম। অভিমান গোপন করে কৃষ্টিচর্চায় বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
যাই হোক মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক তারপর গ্র্যাজুয়েশন। পুঁথিগত বিদ্যার তাড়নায় আমার স্বপ্ন,আমার সংস্কৃতিচর্চা কখন যে মলিন হয়ে গিয়েছিল বুঝতেই পারিনি। একদা বহুমূল্যের তানপুরা, হারমনিয়াম, তবলা বিস্মৃতির অতলে তলিয়েছিল অনেক আগেই।
আসলে আমার নেতিবাচক জেদও একটা বড় কারণ। অনুতাপ জয় করে একবারও ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করি নি। এখন বুঝি পুরনো ধ্যাণধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করা দরকার ছিল। সে লড়াই সমাজ কিংবা পরিবার যার বিরুদ্ধে হোক না কেন ! নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেলছিলাম সেটা বুঝে উঠতে পারিনি সেদিন।
একুশে পা রাখার সাথে সাথে এক বিশেষ মুহূর্তে একদিন আবার গান গাওয়ার সুযোগ হলো। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন রেলের এক অফিসার তাঁর বাবা মা আর দিদি জামাইবাবুকে নিয়ে আমায় দেখতে এসেছিলেন। আমার বাবা খুব গর্বের সাথে বলেছিলেন, " মেয়ে আমার রান্নাবান্না,ঘরের কাজ তেমন পারে না,তবে গানের গলা আর নাচের পা --"। কথা শেষ করার আগেই আমি বাবাকে থামিয়ে দিলেও,ওনারা গান শোনার জেদ ধরলেন। লৌকিকতার খাতিরে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলাম কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না।
কর্তব্যে খাতিরে ওনারা প্রশংসা করলেও আমার কখনো মনে হয় নি যে ওনারা কৃষ্টি বোঝেন।
যোগ্যতা বা দক্ষতা নয়, শেষ পর্যন্ত একজন পুরুষের সাথে একজন মহিলার বিবাহ সুসম্পূর্ণ হয়েছিল বেশ ধুমধাম করেই। সরকারি অফিসার হওয়ার সুবাদে পণ - দাক্ষিণ্যের অংকটাও স্বাস্থ্যবান ছিল। কিন্তু আমার নিজের পছন্দের কোন জায়গা ছিল না আমার শশুর বাড়িতে। শাড়িই ছিল একমাত্র পোশাক। কিন্তু আমি যে চুড়িদার,কুর্তি পছন্দ করতাম। প্যান্ট শার্ট পড়ে পাহাড়ে চড়তাম। সাজতে ভালোবাসতাম। গ্রামে বাস করলেও স্বাভাবিক আধুনিকতা ভীষণ পছন্দ করতাম । বাবা মা এমন করেই আমাকে গড়েতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন জানি না তাঁরা হঠাৎই নিজেদের একমাত্র সন্তানের মানসিকতা বুঝতে ভুল করলেন! কোন পক্ষের সমর্থক না হয়েও আমার স্বামীর অদ্ভুদ নীরবতা প্রকারান্তরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অন্ধ সমর্থক হয়ে উঠছিল ক্রমশ। আসলে শশুড় শাশুড়ি আমার আগমনে নিজেদের অধিকার ও ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় সংযম হারিয়েছিল। আর স্বামী অন্ধ আনুগত্যে নিজের বিচারবুদ্ধি অন্যত্র জমা রেখেছিলেন। এই দমবন্ধ অবস্থায় একমাত্র শশুড় মশাই মাঝে মধ্যে অনেক ঝামেলা সামলে দিতেন। আমি কিন্তু ওঁদের কারুর সমস্যার কারণ হতে চাই নি। আবার বাবা মায়ের বিশ্বাস ভঙ্গ করতে চাইনি। কেবল নিজের স্বপ্নগুলি ভাঙতে দেখতাম হাসিমুখে। সমাজ সংসারের নীরব অত্যাচার নীরবতা দিয়ে ঢেকে দিতে পেরেছিলাম হয়তো।
কাঠিন্যের মধ্যেও আমি সমাজে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। অনভ্যাসের অন্ধকারে অস্পষ্ট হওয়া অধিগত সামর্থ্যগুলিকে আবার আলোয় ফেরাতে উদ্যোগী হয়েলাম। কিন্তু সন্তান পালনের দায়বদ্ধতা পাথরের মতো চেপে বসলো আমার ছন্নছাড়া জীবনে। কিন্তু সন্তানের হাত ধরে সমাজ দেখার সুযোগও পেলাম। সেই ২০ বছর আগের সমাজ অনেক বদলে গেছে।
বদলেছে মানুষের ভাবধারা। জীবনযাত্রার রীতিনীতি,আশা আকাঙ্খা, সংগামের মানসিকতায় কি ব্যাপক পরিবর্তন। নারী পুরুষ নির্বিশেষে অভিমত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেকাংশে প্রতিষ্ঠিত।
বহু ভালো,মন্দ, সুবিধা, অসুবিধা সমাজ সংসারের পরিমণ্ডলে আপন নিয়মে আবর্তিত। সেই আবর্তনের স্বাক্ষী হয়ে, চড়াই, উৎরাই টপকাতে টপকাতে না পাওয়ার তালিকায় আজ আর চোখ রাখতে চাই না। বরং নিজের অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে করতে আমি সমাজেই মিশে যেতে চাই। আমাদের সমাজে বন্ধন আছে, শাসন আছে, দমন আছে, আছে সহমর্মিতাহীন স্বার্থপরতা। যেগুলি প্রতিকূল সেগুলিই প্রচারের আলোয় জ্বলজ্বল করে। আমরা ভয় পেতে পেতে অনুকূলতার স্বাদ নিতে দ্বিধা করি। তাই দয়া, মায়া,প্রেম,ভক্তি,উদারতার লুকানো ভাণ্ডার সহজে চোখে পড়ে না।
বয়স বাড়ছে। ক্রমশ লজ্জা,শংশয় কমেছে। কিন্তু মানান বেমানানের প্রশ্ন এসেছে। তবে আত্মবিশ্লেষনের নিরিখ প্রত্যাশার বয়স বাড়ে না। জানি একদিন পূর্ণচ্ছেদও আসবে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত জীবন থাকবে। না না আলোকিত হবার কোন ইচ্ছাই আমার নেই। স্রোতের বিরুদ্ধেও লড়তে চাই না। পরিবারের অতিহ্য আর আত্মসম্মান বহাল রেখেই আজ পরিবার পরিস্থিতির বাইরে সমাজ সভ্যতার অনুকূল অনুভূতিগুলি আবিস্কার করতে চাই।
আমি সেই মেয়ে। জানি না নিজের অনুভূতির সাথে হাজার হাজার মেয়ের অনুভূতি মেলাতে পারলাম কি না! ( কল্পিত )