23/05/2026
ইমামি ইস্টবেঙ্গল ক্লাব সদ্য সমাপ্ত আইএসএল টুর্নামেন্টে গোলের গড়ে চির প্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের থেকে সামান্য এগিয়ে থেকে শিরোপা লাভ করেছে। দীর্ঘ ২২ বছর পর কোন সর্বভারতীয় লিগ ট্রফি তাদের ঘরে ঢুকলো। এবার নিন্দুকেরা লিগের দৈর্ঘ্য, হোম এর ম্যাচের বিন্যাস, প্রায় প্রতি খেলায় ইস্টবেঙ্গলের পেনাল্টি লাভ এবং সর্বোপরি খেতাব নির্ধারক ম্যাচে প্রতিপক্ষ গোলকিপারের সন্দেহজনক আচরণ নিয়ে কথা তুলছেন। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না বাকি দলগুলিও এই লীগের প্লেইং কন্ডিশন অবগত হয়েই ময়দানে নেমেছিল। তাই সেসব কথা থাক। এবার দেখে নেওয়া যাক প্রথম যেবার কোনো দুই ভারতীয় দলের মধ্যে লীগের ফয়সালা এইরকম সমান পয়েন্টে শেষ হয়েছিল।
সালটা ১৯৬২, ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সোনায় লেখা বছর। জাকার্তায় বসেছে এশিয়ান গেমসের আসর। সেখানে যোগ দিতে গিয়েছেন মোহনবাগান অধিনায়ক চুনী গোস্বামী, জার্নেল সিং, অরুময়নৈগম, প্রদ্যুৎ বর্মণদের মত অপরিহার্য ফুটবলাররা। এদিকে লীগের খেলা গড়িয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে । প্রথম লেগের বড় ম্যাচে মোহনবাগান হেরে গেল ম্যাচ শেষের ছয় মিনিট আগে সুনীল নন্দীর করা একমাত্র গোলে। যদিও এই ম্যাচে দু দলই পূর্ণশক্তির দল নামিয়ে ছিল।
যাই হোক দ্বিতীয় পর্বে কিন্তু মোহনবাগান বদলা নিতে পারল না, খেলা শেষ হল গোলশূন্যভাবে। তারপর নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর শেষ দুই ম্যাচের আগে দু দলের অবস্থান হল, মোহনবাগান ২৬ ম্যাচে ৩৯ পয়েন্ট আর ইস্টবেঙ্গল ২৬ ম্যাচে ৩৭ পয়েন্ট। পরের ম্যাচ একই দিনে, ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ মহমেডানের সাথে আর মোহনবাগান খেলবে জর্জ টেলিগ্রাফের সাথে, যারা প্রথম লেগে মোহনবাগানকে হারিয়েছিল।
সেদিন কিন্তু ইস্টবেঙ্গল মহামেডানকে হারিয়ে দিল ১-০ গোলে আর মোহনবাগান আবারও হেরে গেল জর্জ টেলিগ্রাফের সাথে। জর্জের সাথে প্রথম গোল খাওয়ার পর মোহনবাগান যখন গোল শোধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে তখন প্রতি আক্রমণে হঠাৎ চলে এলো জর্জ টেলিগ্রাফ, নিশ্চিত গোল বাঁচানোর জন্য পেনাল্টি বক্সের মধ্যে ফাউল করলেন মোহনবাগান ডিফেন্ডার প্রশান্ত সরখেল । পেনাল্টি থেকে ২-০ করে দিল জর্জ। এরপর মোহনবাগান গোল পরিশোধ করার অনেক চেষ্টা করল। ম্যাচের শেষ দিকে মঙ্গল পুরকায়স্থ পেনাল্টি থেকে একটা গোল শোধ করলেও তখন আর সময় ছিল না। লিগ জয় অনিশ্চিত হয়ে গেল মোহনবাগানের। শেষ ম্যাচের আগে দুই দলই দাঁড়িয়ে গেল একই বিন্দুতে। অর্থাৎ দু দল ই ২৭ ম্যাচ খেলে ৩৯ পয়েন্ট।
৩১শে জুলাই ১৯৬২ কলকাতা ময়দানে জনসমুদ্র ভেঙে পড়ল পাশাপাশি দুটো ঘেরা মাঠে। ক্যালকাটা মাঠ অর্থাৎ বর্তমান মোহনবাগান মাঠে মোহনবাগান মুখোমুখি হল এরিয়ান্সের, আর তৎকালীন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের এজমালি মাঠ, অর্থাৎ বর্তমান এরিয়ান-ইস্টবেঙ্গল মাঠে ইস্টবেঙ্গলের খেলা পড়ল লিগ টেবিলের সর্বশেষ স্থানাধিকারী দল বালী প্রতিভার সাথে। দু দলের সমর্থকরাই সম্ভাব্য লীগ বিজয়ের প্রস্তুতি সেরে সেদিন মাঠে গিয়েছিল। বাজি-পটকা কাঁসর-ঘন্টা আবির-মিষ্টি ইলিশ-চিংড়ি কোন কিছুরই কমতি ছিল না। প্রত্যাশা মতোই ইস্টবেঙ্গল প্রথমেই গোল করে এগিয়ে গেল। চির প্রতিদ্বন্দ্বীর হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে সেই প্রবল হর্ষধ্বনি চুপ করিয়ে দিল ক্যালকাটা মাঠের গ্যালারীকে। ওই মাঠে তখন চলছিল সুযোগ নষ্টের প্রদর্শনী। প্রথম লেগে যে এরিয়ান্সকে ৫-০ গোলে হারানো গিয়েছিল তারাই তখন মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোহনবাগান আর খেতাব জয়ের মাঝখানে। এদিকে ক্যালকাটা মাঠে মঙ্গল পুরকায়স্থ, দীপু দাস, অমল চক্রবর্তী, অজয় দাস, বিনু চ্যাটার্জি যখন একের পর এক গোলের সুযোগ নষ্ট করেই চলেছেন তখন প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে ইস্টবেঙ্গল মাঠে একটা অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। বালি প্রতিভার রাইট ইন এস ব্যানার্জি মাঝমাঠ থেকে একটা লুজ বল ধরে সোজাসুজি ইস্টবেঙ্গল গোলের দিকে দৌড় লাগালেন। এক ঝটকায় কেটে গেলেন বাধা দিতে আসা ইস্টবেঙ্গলের দুই ব্যাক সুশান্ত সিনহা আর চিত্ত চন্দ। তারপর প্রায় মাঝ মাঠ থেকে তাঁর ৩০ গজের একটা গোলা আছড়ে পড়ল ইস্টবেঙ্গলের জালে। হতভম্ব ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার, নিশ্চুপ উৎসবমুখর গ্যালারি। খবর পৌঁছে গেল ক্যালকাটা মাঠে। বিরতির পর দু দল ই মরিয়া হয়ে উঠলো গোল করার জন্য । কিন্তু এরিয়ান্স ডিফেন্সের দৃঢ়তায় আর বালি প্রতিভার গোলকিপার হরিদাস দাস নিজেকে পাহাড় সমান উচ্চতায় তুলে ধরায় কোন মাঠেই আর গোল হলো না। দু'দলই শেষ করল ২৮ ম্যাচে ৪০ পয়েন্টে। মোহনবাগানের গোল পার্থক্য ৪৭-১৮ অর্থাৎ +২৯ আর ইস্টবেঙ্গলের ২৬-৭ মানে +১৯।
তারপর? লিগ কে পেল?
না, তখন গোলের গড়ে লীগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া যেত না। তাই আবার সম্মুখ সমরে নামতে হলো দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে। ২৩শে আগস্ট, ১৯৬২ প্লে-অফ ফাইনালে মঙ্গল পুরকায়স্থের করা পরিষ্কার দুই গোলে ডার্বি জিতে মোহনবাগান দশম বারের মতো লীগ চ্যাম্পিয়ন হলো।
আর তার ১১ দিন পরেই ভারত জিতল জাকার্তা এশিয়ান গেমসের ফুটবলের স্বর্ণপদক। 🥇🇮🇳
জয় মোহনবাগান 💚❤️💚❤️
চিত্রসৌজন্য: যুগান্তর