18/05/2025
#ক্রিকেটের_ইতিহাসে_আজকের_দিনে 🏏
১৮ ই মে, ১৯০৫।
ইটালির সিসিলির প্রাচীন বন্দর-শহর ক্যাটানিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানেই শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল তাঁকে, শস্যক্ষেত্রের আগুনের লেলিহান শিখার পাশে পড়ে ছিল তাঁর নিথর দেহ। তিনি— ব্রিটিশ আর্মির পদাতিক রেজিমেন্ট ‘দ্য গ্রিন হাওয়ার্ড-’ এর ক্যাপ্টেন। রাতের অন্ধকারে শত্রুপক্ষের উপর আক্রমণ শানানোর আগে বরাবরের মতোই ফুরফুরে ছিলেন তিনি। শস্যখেতের মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের বাহিনী নিয়ে। ঝাঁক ঝাঁক গুলির মাঝে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া বাহিনীর সবাইকে একত্র করে বলতে থাকেন 'কিপ গোয়িং, কিপ গোয়িং।' নিজেই সামনে থেকে তাঁর বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন অকুতোভয় এই ক্যাপ্টেন, হঠাৎ একটি গোলা এসে বিঁধল বুকে। বুক থেকে রক্ত ঝরছে গলগল করে, কিন্তু তখনও তিনি বলে চলেছেন, 'কিপ গোয়িং মাই ফ্রেন্ডস...কিপ গোয়িং'!
শেষমেশ পিছু হটতে বাধ্য হল ক্যাপ্টেনের বাহিনী আর আহত অবস্থাতেই ক্যাপ্টেন ধরা পড়লেন জার্মান বাহিনীর হাতে। শেষবার তাঁকে দেখা গেল সহযোদ্ধার বাহুডোরে। ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছেন মৃত্যুশয্যায়। পরে জানা যায়, ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ইতালির কাসের্তার একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। বয়স তখন মাত্র ৩৮!
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে বীর ক্যাপ্টেনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, যদি বলি কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ছিল তাঁর প্রিয় 'খাদ্য'! মানে টেস্টে তিনি ডন ব্র্যাডম্যানকে সবথেকে বেশী — আট বার আউট করেছিলেন, বিশ্বাস হচ্ছে না নিশ্চয়ই? ভাবছেন মজা করছি! কিন্তু না। এই ঘটনা আসলে সত্যি!
তিনি দ্য গ্রেট হেডলি ভেরিটি, ইয়র্কশায়ার এবং ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা বাঁ-হাতি স্পিনার, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসে 'পারফেক্ট-টেন' (সবথেকে কম রানে দশ-উইকেট) -এর মালিক, যিনি জন্মগ্রহণ করেন আজকের দিনে। যুদ্ধ প্রাণ নিয়েছিল, কিন্তু টেস্টে সবচেয়ে বেশি বার ব্র্যাডম্যানকে আউট করার তাঁর সেই কৃতিত্ব আজও অমলিন। যেমন অমলিন ১৯৩১ সালে হেডিংলির মাঠে নটিংহ্যামশায়ারের বিপক্ষে এক ইনিংসে তাঁর ১০ রানে ১০ উইকেট, যা সর্বকালের একমাত্র হ্যাটট্রিক সহকারে দশ-উইকেট। অবশ্য এটি প্রথম নয়, সেই মরশুমে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় দশ-উইকেট, এর আগে ওয়ারউইকশায়ারের বিপক্ষে ঐ মাঠেই ৩৬ রানে দশ-উইকেট নিয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হতেই ভেরিটির বয়স ২৫ বছর পেরিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মাত্র বছর দশেকের মতো প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলতে পেরেছিলেন। আর তাতেই ১৪.৯০ গড়ে ৭৮ ম্যাচে ১৯৫৬ টি উইকেট ছিল তাঁর ঝুলিতে। প্রতি ৪২ বলে একটি উইকেট নিয়েছেন। কাউন্টিতে ভেরিটির মরশুম প্রতি গড় উইকেট ছিল ১৮৫, টানা তিন মরশুমে দু'শোরও বেশি উইকেট নিয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ব্যাট হাতেও যথেষ্ট সাবলীল ছিলেন তিনি, ১ টি সেঞ্চুরি ও ১৩ টি হাফ-সেঞ্চুরি সহ ৫৬০৩ রানের মালিক তিনি।
যুদ্ধের কারণে টেস্ট ক্রিকেট অবশ্য ভেরিটির সেরাটা পায়নি, ৪০ টি টেস্টে নিয়েছেন ১৪৪ উইকেট। যার মধ্যে ছিল কেরিয়ার বেস্ট, ১৯৩৪ সালে, বিশ শতকে লর্ডসে ইংল্যান্ডের একমাত্র অ্যাশেজ জয়ে ১০৪ রানের বিনিময়ে ১৫ উইকেটের মতো চমকপ্রদ পারফরম্যান্স (প্রথম ইনিংসে ৭/৬১ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮/৪৩, সেরা বোলিং)। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের মতো টেস্টে ব্যাট হাতে ততটা সফল না হলেও ৩ টি হাফ-সেঞ্চুরি সহ ৬৬৯ রান ছিল তাঁর। সর্বোচ্চ ৬৬ নট আউট।
ভেরিটি মাঠের ভেতরে ও বাইরে পরিচিত ছিলেন আপাদমস্তক ভদ্রলোক হিসেবে। ক্রিকেটে যেমন নায়ক ছিলেন, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রেও বীর ছিলেন । ১৯৩৭ সালে, বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন বাজতে শুরু করেছে, তখন থেকেই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করেন ভেরিটি। মিলিটারি, অস্ত্র-শস্ত্র, যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং বিশ্বযুদ্ধের কারণে ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ আর্মির পদাতিক রেজিমেন্ট 'দ্য গ্রিন হাওয়ার্ড' - এ যোগ দেন ক্যাপ্টেন হিসেবে। চার বছর যুদ্ধ করেছেন অসম সাহসিকতায়। ১০ ই জুলাই ১৯৪৩ সালে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক হামলার অংশ হিসেবে পা রাখেন ইতালিতে। জার্মান ক্যাম্পে হামলা চালানোর সময় আহত হন এবং টানা ১২ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মারা যান ৩১ শে জুলাই।
আজও ইংলিশ টিম যখন মাঠে নামে, ইংরেজ অধিনায়ক জো রুট কি তাঁর টিমকে বলেন ভেরিটির শেষ কথাটি, 'কিপ গোয়িং...কিপ গোয়িং'? কারণ হেডলি ভেরিটি যে শুধুমাত্র কোনও নাম নয়, হেডলি ভেরিটি — ইংরেজদের অনুপ্রেরণা!
[ভালো লাগলেও সঙ্গে থাকুন 🌟]