20/07/2023
ফুটবল ইতিহাসের আইকনিক ছবিগুলোর তালিকা করলে এই ছবিকে উপরের দিকে স্থান দিতে হবে।
অনেকের সামনেই এই ছবি প্রতিনিয়ত ভেসে ওঠে। অনেকে এর পেছনের ইতিহাস জানেন, অনেকেই জানেন না।
ফিরে যেতে হবে ২০০৫ সালে, তখন মিলানের দুই ক্লাব এসি মিলান এবং ইন্টার মিলান দুই দলই ইউরোপিয়ান জায়ান্ট। লীগে এই নগর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা তো চলতোই, এমনকি একে অপরের সাথে দেখা হতো ইউরোপিয়ান ফুটবলেও।
২০০৪-০৫ সিজনের চ্যাম্পিয়নস লীগের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় এই দুই দল। আমরা অনেকেই জানি, সান সিরো এসি মিলান এবং ইন্টার মিলান দুই দলেরই হোম গ্রাউন্ড। লীগে ২ বার এই দুই দল মুখোমুখি হলে এক ম্যাচে এসি মিলান হোম এডভান্টেজ পায়, অর্থাৎ বেশি সংখ্যক এসি মিলান সমর্থক ম্যাচের টিকিট কিনতে পারে। আরেক ম্যাচে ইন্টার মিলান হোম এডভান্টেজ পায়।
যাই হোক, এই দুই দলের সেই সেমিফাইনালের প্রথম ম্যাচে এসি মিলান হোম এডভান্টেজ পেয়েছিলো। সেই ম্যাচ তারা ২-০ গোলে জিতে ফাইনালে এক পা দিয়ে রেখেছিলো। তবে যেহেতু পরের লেগে ইন্টার মিলানের কাছে হোম এডভান্টেজ ছিল, তাই কামব্যাকের সম্ভাবনাটাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছিলো না।
১২ এপ্রিল, ২০০৫। দ্বিতীয় লেগের খেলা শুরু হলো। যেহেতু এই লেগে স্টেডিয়ামে ইন্টার মিলানের সমর্থক বেশি, সেহেতু তারা শুরু থেকেই হোম এডভান্টেজ নিয়ে এসি মিলান প্লেয়ারদের জন্য কঠিন পরিবেশ তৈরি করার চেস্টায় ছিল বিভিন্নভাবে।
ম্যাচের ৩ মিনিটে এসি মিলান স্ট্রাইকার আন্দ্রে শেভচেনকো ইন্টার মিলানের সেন্টারব্যাক মাতেও মাতেরাজ্জিকে ঢুস মারে। বিষয়টা রেফারির চোখ এড়িয়ে যায়, তিনি কোনো ব্যবস্থা নেন না। কিন্তু সেই ঘটনা ইন্টার মিলান ফ্যানদের চোখ এড়ায়নি, ফলে তখন থেকেই ক্ষিপ্ত হতে শুরু করেন তারা।
২৯ তম মিনিটে সেই শেভচেনকোই মিলানকে ম্যাচে এগিয়ে দেন। ফলে এগ্রিগেটে ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় মিলান। ম্যাচের বাকি টাইমে ৪ গোল দিয়ে কামব্যাক করাটা ইন্টারের জন্য আরো বেশি অসম্ভব লাগছিলো।
যে প্লেয়ার সম্ভবত ঢুস মারার জন্য লাল কার্ড খেয়ে মাঠ ছাড়তো সেই প্লেয়ারের গোলে ইন্টারের পিছিয়ে পড়াটা কোনোভাবেই মানতে পারেনি ইন্টার ফ্যানরা। ম্যাচের সময় যতো গড়াতে থাকলো, তাদের ক্ষোভ ততো বেশি প্রকাশ পেতে থাকলো।
তবে, ম্যাচের ৭১ মিনিট পর্যন্ত পরিস্থিতি হাতের নাগালেই ছিল। ৭১ তম মিনিটে ইন্টার মিলানের মিডফিল্ডার ক্যাম্বিয়াসোর শান্ত্বনাসূচক গোল হয়তো স্রেফ লজ্জার মাত্রাটা কমাতো, তবে বিল্ড আপে ইন্টার মিলান স্ট্রাইকার জুলিয়ান ক্রুজের দ্বারা এসি মিলান গোলকিপার দিদার উপর ফাউল ঘোষণা করা হয়, এবং ইন্টার মিলানের গোলটি বাতিল করা হয়।
গোল বাতিল হওয়ার পর আর নিজেদেরকে সামলাতে পারেননি ইন্টার সমর্থকেরা। মাঠে তারা আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করে। ফলে পুরো স্টেডিয়াম ধোয়াটে হয়ে যায়, এরকম লাল ধোয়ায় ছেঁয়ে যায়।
এরকম পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর তাড়াতাড়ি প্লেয়ার এবং ম্যাচ অফিশিয়ালস অর্থাৎ রেফারিরা মাঠ ত্যাগ করতে থাকে। একটি আগুনের গোলা একটুর জন্য মিলান গোলকিপার দিদার মাথায় লাগেনি, ঐ গোলা গিয়ে লাগে তার ঘাড়ে। ফলে তৎক্ষণাৎ তাকে বার্ন ট্রিটমেন্ট নিতে হয়। এবং এই একটা আঘাত আল্টিমেটলি তার ডিক্লাইনের কারণ হয়।
পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে এসি মিলানের রুই কস্তা এবং ইন্টার মিলানের সেন্টারব্যাক মাতেও মাতেরাজ্জি এভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, একজন আরেকজনের ঘাড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের সামনের পরিবেশ ছেঁয়ে আছে ধোঁয়ায়, হয়ে আছে লালচে। আর এর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এই দুইজন।
এমন মুহূর্তের ছবি তোলার সুযোগ মিস করেননি ইতালিয়ান ফটোগ্রাফার স্টেফানো রেলানদিনি। নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেও এরকম মুহুর্তকে ক্যামেরাবন্দী করতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি তিনি।
পরে অবশ্য এই ম্যাচ আরে মাঠে গড়াতে পারেনি। এই ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ইন্টার মিলান ফ্যানরা বিশৃঙ্খলা তৈরি করায় এসি মিলানকে এই ম্যাচে ৩-০ গোলে জয়ী ঘোষণা করা হয়। ফলে এসি মিলান ফাইনালে চলে যায়।
"মিরাকল অফ ইস্তানবুল" অর্থাৎ মিলানকে ইউসিএল ফাইনালে হারিয়ে লিভারপুলের সেই ঐতিহাসিক কামব্যাকের ঘটনা তো কারোই অজানা নয়। ঐ ঘটনাও কিন্তু ঘটেছিল এই একই সিজনে।
ইন্টার মিলানকে এরকম বিশৃঙ্খলার কেমন শাস্তি দেয়া হয়েছিল? ফ্যানদের এমন আচরণের ফলে ইন্টার মিলানকে তাদের পরবর্তী ইউরোপিয়ান ম্যাচ ফাঁকা মাঠে খেলতে হয়েছিলো।
উক্ত ছবির ফটোগ্রাফার মিস্টার স্টেফানোকে এই ছবির ব্যাপারে পরবর্তীতে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, "সে সময়ে মাতেরাজ্জি এবং রুই কস্তা পুরো বিপরীত ধরণের খেলোয়াড় ছিলেন। রুই কস্তার খেলার মধ্যে সবাই খুঁজে পেতো সৌন্দর্য, ভদ্রতা অপরদিকে মাতেরাজ্জি এমন একজন খেলোয়াড় ছিলেন যে ডার্টি ওয়েতেও ম্যাচ জিতেই ছাড়বেন। এরকম মুহূর্তে এই দুইজনের এক সাথে দাঁড়িয়ে থাকা, তখন আমার মাথায় একটা বাক্যই এসেছিলো, 'Football is about friendship' অর্থাৎ বন্ধুত্বের উপরে ফুটবলে কিছু নেই।"
আসলেই এই ছবিটা "Football is about friendship" বাক্যটা ধারণ করে। ফুটবলকে ক্রিকেটের মতো সার্টিফাইড ভদ্র লোকের খেলা বলা হয় না, এর কারণ ফ্যানদের উগ্রতা, মাঠে খেলোয়াড়দের উগ্রতা, যা সামলানোর জন্যই হলুদ এবং লাল কার্ডের ব্যবস্থা আছে। তবে মাঠের বাইরে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ঘটনা বাদ দিলে প্রতি ফুটবলারের মধ্যেই আছে সম্মানবোধ, পরস্পরের প্রতি সম্মান। এজন্যই আমরা দেখি প্রিমিয়ার লীগে পুরো সিজন পরস্পরের রাইভাল রাশফোর্ড, ডি ব্রুইনা, ভ্যান ডাইকদের অফ সিজনে একসাথে ভ্যাকেশন কাটাতে।
যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে এই ছবি। আরো এক দশক পরও এই ছবি আপনার নিউজফিডে, চোখের সামনে ভেসে উঠবে। বার্তা হবে একটাই, "Football is about friendship"
©️Noman Saeed