28/07/2025
"কুরুক্ষেত্র সমরে পাঞ্চজন্য, দেবদত্ত, পৌণ্ড ইত্যাদি মহাশঙ্খের ধ্বনিতে নাকি '...ধার্তরাষ্ট্রনাং হৃদয়ানি রদারয়ৎ'।নভশ্চ পৃথিবীঞ্চৈব তুমুলো বন্যুনাদয়ং।' সেই শঙ্খধ্বনি আকাশে বাতাসে প্রতিদ্ধনিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদীর্ণ করেছিল।উপস্থিত জনতার এ হর্ষধ্বনিও আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছিল। ...সৈনিক পুঙ্গবেরা তখন কাগুজে শিল্ড লুকিয়ে ফেলেছে। বিষাদের প্রতামূর্তির মত বসে আছে নিজ আসনে।"—শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানের সমতা ফেরানোর গোলের পরবর্তী দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন পরেশ নন্দী।
আর ম্যাচের পর? এই দৃশ্যের বর্ণনা সম্ভব নয়। অনুভব করা সম্ভব। এই দৃশ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া সম্ভব। এত মানুষের একসঙ্গে এই গগনভেদী চিৎকার আর কবে শুনেছে তিলোত্তমা জানা নেই। আকাশ ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছে এ চিৎকার, বাজছে ঢাক,কাঁসর-ঘন্টা- ঐ যেন এক রাজকীয় যজ্ঞের আয়োজন।সবুজ মেরুন ঘুড়িতে ঢেকে গেল নীল আকাশ। ইংলিশম্যান লিখেছিল, "দ্বিতীয়বার মোহনবাগানের ঘুড়ি আকাশে উড়লে জনতা মাতাল হয়ে গেল।"
"বিজয়ী বীরেরা চলেছে এগিয়ে। সমস্ত পথ জয়ধ্বনিতে মুখরিত। গৃহে গৃহে শঙ্খধ্বনি।কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে অবর্ণনীয় আনন্দ প্লাবন।এমনি করেই তাঁরা এসে পৌঁছুল শ্যামবাজারে শ্রীযুক্ত শৈলেন বসুর বাড়িতে।"-লিখেছিলেন গণেন মল্লিক। আর যেটা কেউ লেখেননি, সেটা হল শিবদাসরা সেদিন নিজেদের রক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে তৈরী করে দিয়েছিল স্বাধীন ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর। সেদিনের দুটো গোল ছিলনা শুধু ইয়র্কশায়ারের বিরুদ্ধেই, ছিল দুশো বছর ধরে যাদের পদতলে পিষ্ট হয়েছে ভারতবাসী, তাদের পতন ঘোষণা। সেদিনের সবুজ মেরুন রঙ হয়ে উঠেছিল গেরুয়া সাদা সবুজ। আর মাঠে উপস্থিত প্রতিটি ভারতীয় দর্শক হয়ে উঠেছিলেন একটা বিপ্লবের অংশীদার, যেই বিপ্লবের একদিকে ছিল খাঁচায় আটকে পড়ে পরাধীনতার যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা পায়রার দল- অপরপ্রান্তে খাঁচা ছেড়ে নীলাকাশে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে উড়ে যাওয়া একঝাঁক সাদা পায়রা। যাদের মন খুলে বাধাহীনভাবে উড়ে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিল মোহনবাগান।
আসলে আমরা শুধু ঊনত্রিশে জুলাই উদযাপন করি। কিন্ত এই দিনটি একদিনে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে যত্ন নিয়ে গড়ে তোলা একটা দল, শৈলেন বাবুর নেতৃত্ব, শিবদাস ভাদুড়ি নামক এক অভাবনীয় ফুটবল মস্তিষ্ক, সরকার, সমাজ সবার সঙ্গে লড়াই— অনেক হার্ডল অতিক্রম করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শিবদাসদের বিক্রমে উড়েছিল হাজার হাজার সবুজ মেরুন ঘুরি— যেগুলো ছিল আসলে স্বাধীনতার বার্তাবাহক।
—সাগ্নিক চক্রবর্ত্তী (পুরোনো লেখার অংশ)
#আমরাসবুজমেরুন