25/11/2025
ভরা থাক স্মৃতিসুধায়
আজ ২৫ নভেম্বর, আমাদের ক্লাব বিওয়াইএসি-র ১০৩ বছরের ইতিহাসে এক রেড-লেটার ডে। কারণ ঠিক ৭ বছর আগে ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর, বিকেল সাড়ে চারটেয় শুরু হয়েছিল আমাদের ক্লাবের ফুটবল কোচিং সেন্টারের পথচলা।
সাত বছরে অনেক ক্লাবের অনেক ফুটবল কোচিং ক্লাবের পথচলা শুরু হয়েও তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চোখের সামনে উদাহরণ—মোহনবাগান সুপারজায়ান্টের কলকাতার ফুটবল শিবির উঠে গিয়েছে। ইস্টবেঙ্গল সন্তোষপুরে ধূমধাম করে ফুটবল শিবির চালু করেছিল। তা এখন বন্ধ। মহামেডান ক্লাব মাকড়দহের মাঠে শুরু করেছিল একটা শিবির। তার কোনও অস্তিত্ব নেই। মাকড়দহের পিএজে মাঠে পিয়ারলেস ক্লাব চালু করেছিল ফুটবল ক্যাম্প। সুরজিৎ সেনগুপ্ত মারা যাওয়ার পরে তার অবস্থাও না চলার মতোই।
ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের ক্লাবের ফুটবল কোচিং সেন্টার ৭ বছর ধরে ৩৬৫ দিন চালু থাকা একটা দুর্দান্ত প্রোজেক্ট। ছোটদের ফুটবল শিক্ষা দিয়ে মাঠের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার পাশাপাশি বছরে ক্লাব তহবিলে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ এনে দিচ্ছে এই কোচিং সেন্টার।
আর এই কোচিং সেন্টার চালানোর জন্য যদি মাথা নুইয়ে কাউকে কুর্ণিশ জানাতে হয়, সেটা প্রবীর রায় আর তাঁর অধীনে কাজ করা দুই কোচ মিলন আর শুভকেই। ক্লাবের প্রাক্তন সহসভাপতি প্রবীরদা টিডি হিসেবে ৭ বছর ধরে অবিরাম মাঠ নেমে বাচ্চাদের এখনও শুধু খেলা শেখানো নয়, অত্যন্ত শৃঙ্খলার মধ্যে বেঁধে রেখেছেন। মিলন ও শুভ নিজেদের সেরাটা দিয়ে বাচ্চাদের যে খেলা শেখাচ্ছে, তাতে অনেক বাচ্চাই আজ নিজেদের ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এগিয়েছে।
ধন্যবাদ জানাতেই হয়, দেবব্রত গুছাইত আর সৌরীশ সিংহকে। ফুটবল সেন্টার যখন শুরু হয়েছিল, তখন সৌরীশই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিয়েছিল। বাচ্চাদের ভর্তি করা, তাদের জার্সিপ্যান্ট বিলি করা, বেতন সংগ্রহ করা, প্রতিদিন অ্যাটেনডেন্স রাখা, মাসে মাসে অভিভাবকদের সঙ্গে মিটিং করার এক সুষ্ঠ সিস্টেম চালু করেছিল সৌরীশ। পরবর্তীকালে গুছাইতদা এই কাজটা করছে আরও গুছিয়ে। শুধু দায়িত্ববোধ নয়, গুছাইতদা এই কাজটা করছে অসম্ভব ভালোবাসা থেকে।
এই ভালোবাসাটা রয়েছে ক্লাবের আরও অনেকের মধ্যে। যেমন খোকন (সৌরভ কোলে)। আজ সকালে ওই আমাকে জানাল, কোচিং সেন্টারের সপ্তম জন্মদিনের কথা। কাল রাত থেকেই জন্মদিন নিয়ে একটা লেখার চেষ্টা করছিলাম। সময়ের অভাবে বসতে পারছিলাম না। খোকনের উৎসাহ দেখেই মনে হলো, ব্যাপারটা সকলের কাছে একবার তুলে ধরা দরকার।
তুলে ধরা দরকার, আরও কয়েক জনের কথাও। যাঁর মধ্যে প্রথমজন অবশ্যই বাচ্চাদা অর্থাৎ অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়। কোচিং সেন্টার চালু করতেই হবে যে কোনওভাবে। এটা নিয়ে নিয়মিত প্রায় জোরাজুরি চালিয়েছিল বাচ্চাদা। তাঁর সেই জোরাজুরিতেই আমি আর বাবু (পার্থ পাল) সচেষ্ট হই। কিন্তু আমাদের এই কাজটা বাস্তবায়িত হত না যদি প্রবীরদার সঙ্গে আবীর, সৌরীশ, ভজা (রীতেশ), খোকন এগিয়ে না আসত। আমাদের উৎসাহ দেখে গৌরাঙ্গ, মুনু, ডিকান, শঙ্কর বাবান, পাপানরা কাজটা সম্পূর্ণ করার জন্য দারুণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। প্রেসিডেন্ট বাপনদা, সিনিয়র সদস্য সোনাদা, গৌরীদা, সেক্রেটারি পিন্টুদা উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি সারাক্ষণই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছিল। সেন্টারের শিক্ষার্থী খোঁজার কাজে তো একটা টোটোয় মাইক লাগিয়ে সারা হাওড়ায় প্রচারেও বেরিয়েছিল আমাদের ট্রেজারার গোরাদা। খোকন আর চাঁদুকে সঙ্গ নিয়ে।
কয়েক বছরের মধ্যেই এই সেন্টারকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছে কৌশিক। শুরু থেকে একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এখন কৌশিক এই সেন্টারের অন্যতম শুভানুধ্যায়ী। কী করলে এর উন্নতি হয়, তা নিয়ে ও সারাক্ষণই ভাবে এবং তা বাস্তবায়িত করার চেষ্টাও করে। একইভাবে পরবর্তীকালে সেন্টারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জগাদা, পিঙ্কুদা, শ্রীমন্তদারাও।
বাচ্চাদা যেমন কোচিং সেন্টারের অভিভাবক হিসেবে রয়েছে, তেমনই সামনে থেকে না হলেও এর পিছনে আরও দু’জনের প্রত্যক্ষ অভিভাবকত্ব রয়েছে। তাঁরা হলেন হাওড়ার সাংসদ প্রসূন ব্যানার্জী আর ডাঃ নিশীথরঞ্জন চৌধুরী। প্রসূনদা শুধু মাঠে দু’বার আলো লাগানোর ব্যবস্থা করে দেননি, সারাক্ষণই খোঁজ রাখেন কেমন চলছে এই সেন্টার তা নিয়ে। আর নিশীথদা আমাদের নিয়মিত পরামর্শ দেন শিক্ষার্থীদের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে। এর সঙ্গে আর এক জনের নাম না করা অপরাধ হবে। সে হল আমাদের সেন্টারের ছাত্রী প্রেয়সীর বাবা গৌর অর্থাৎ প্রসেনজিৎ। সে ক্লাবের সদস্য না হয়েও কোচিং সেন্টারের জন্য যে শ্রম দেয়, তা অভাবনীয়। কোচিং সেন্টারের সপ্তম জন্মদিনে এঁদের সবাইকে আমার ভালোবাসা ও প্রণাম।
সাত বছরের পথচলায় একটাই আক্ষেপ। আমরা যারা এই সেন্টার ঘিরে স্বপ্ন দেখি, তারা ভেবেছিলাম, এই সেন্টার শুধু হাওড়ার নয়, সারা বাংলায় হয়ে উঠবে প্রথম লিঙ্গবৈষম্যহীন ফুটবল কোচিং সেন্টার। এখানে ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলবে মেয়েরাও। শুরু থেকে প্রচুর মেয়ে আমাদের সেন্টারে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তা কমে এখন প্রায় শূন্য হতে চলেছে। কারণ আমরা মেয়েদের জন্য ন্যুনতম পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটা আক্ষেপের সঙ্গে বড় যন্ত্রণারও।
এরই মধ্য স্বপ্ন দেখি, আবারও সেন্টারে মেয়েরা ফুটবল খেলবে। তারা বাংলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে বিওয়াইএসি-র ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
~পার্থ দত্ত