18/01/2017
ওপেন ডায়েরি (৬)
#বেরো
By Shalini Ghosh. Basic trainee of Rock Climbing Course.
১১/০১/২০১৭
বরাবর উটকে আমার ভারি স্নব মনে হয়। উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে আপ হাসনাবাদ লোকাল থেকে খানিক আওয়াজ উড়ে এলে মুখটাকে তাই যদ্দুর সম্ভব উটসুলভ করার চেষ্টা করি। এসব সময় আজন্ম আমার ভ্রূ কঠিন হয় আর রিফ্লেক্সে দেড়শবার হাত ঝাঁকিয়ে ঘড়ি। ট্রেন রাত্তির ১১:০৫। তার ঢের দেরী। মধ্যিখানে নানান ফ্যাঁকড়া - সময়মতো প্রুফ পৌঁছাও রে, নতুন জুতো পেয়ে রাতারাতি মিস্টার ইন্ডিয়া বনে যাওয়া মুচির সন্ধান করো রে, প্রেসে ঝটপট প্রিন্ট সারার জন্যে পটাও রে, তার উপরে ডিনার জোগাড়ের গুরুদায়িত্ব। মাইকেলদা খলিফাটাইপ লোক, ফলে 'গুঞ্জন' চাইলেই সন্ধে ৭টাতেও ঝাঁপ ফেলতে পারে। অগত্যা, দৌড় দৌড়। ইস! এসব সিনে পিছনে কেনোও স্কুটি নিয়ে আমির খান থাকে না! বাপস!
১২/০১/২০১৭
# এই মুহূর্তে আদ্রা স্টেশনে বসে। গন্তব্য বেরো। লোকাল ট্রেনে মাঝে মাত্র একখানা স্টেশন। আহা! ভূগোল বইতে পশ্চিমবঙ্গওয়ালা চ্যাপ্টারে নাম থাকত, সেই জয়চন্ডী। খানিক ছড়িয়েছিটিয়ে সক্কলে। আমার গিনির গয়না বড় ভাল্লাগে। আবার এই সদ্য জোটা ফেবু থেকে ডিপি তুলে নিয়ে লাল রিবন লাগানো ব্যাপারটাও বেশ মনকাড়া। বেশ বেশ ঠান্ডা। ব্যাজার মুখ করে লেখা গোছাচ্ছি এখনো প্রাণপণ। সুমিত বাইনোকুলার নিয়ে কিছু একটা কারসাজি করছে। বাড়ি ফিরে বলব নিশ্চয়ই, "আমার বড় Poet, Lover and Birdwatcher" মনে পড়ছিল,হ্যাঁ রে তুই পড়েছিস?" শুভঙ্কর বিস্কুট ধরিয়ে গেল একটা আর ঝমঝমিয়ে এই ট্রেন এল...
# আমাদের ঘরের নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছোট্ট, লালরঙা। চেন টেনে মাথা বের করলেই সামনে সিরিয়াস দেখতে আখাম্বা পাথর একের পর এক সাজানো। পিছনে ক্ষেতটেত হবে। গাছ কাটা, রুখাশুখা। থেকেও অবিশ্যি কী লাভ হত জানিনা, আমি ধানও চিনিনা। আর পাহাড় নিয়ে কোনোদিন আমার আদিখ্যেতা নেই। পাহাড় খুব ঠাণ্ডা, তাতে চাপতে গেলেই গাড়ি বাঁক নেয় আর খুব খুব বমি হয় ইত্যাদি।
# কিছুর মধ্যে কিছু না, খামোখা হুইসেল বাজিয়ে ডাক পড়ল আর একখানা "রোপ নম্বর টু" দাগিয়ে দিয়ে একটা বিদঘুটে টিলার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল চড়ো। ক্ষীইইই আজব ব্যাপার! কোনোদিনও পাথরের গায়ে হাতই বোলাইনি, তার উপরে মুখে হেব্বি সাহস ফোটালেও ঠ্যাঙ তুললেই জঘন্যভাবে, অসভ্যের মতো হাঁটু কাঁপছে, এ কী!!! নাহ, ছড়াচ্ছি। প্রবল ছড়াচ্ছি।
# আমার জ্বর এসেছে। মাঝে খানিক ছলছল চোখে ক্লাস করেছি আর এখন শুয়ে। চুপচাপ। আর আর সবাই খেতে গেছে। গুনগুন আওয়াজ আসছে কানে। শীতে চোখ টেনে রাখা যায়না, আঙুল নড়েচড়ে না। আসার পথে দেখেছি খানিক নামলেই মেলা বসেছে। আমার একটুও সেখানে যেতে ইচ্ছে করছে না আর প্যাঁচা ডাকছে আর আমি ঠাকুরমার ঝুলির কথা ভাবছি।
১৩/০১/২০১৭
#আজকের ডিউটি রোপ আমরা। সক্কলকে কেত মেরে গুডমর্নিং বলতে বলতে বেড টি গছাচ্ছিলাম। ঠিক যেমন লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়নে রাত আটটায় হুড়মুড়িয়ে ঢুকলেও গান গেয়ে বলতে ইচ্ছে করে, "গুডমন্নিইইইং কোলকাতা" তেমন।
# একএকটা দিন ম্যাজিক হয় আর দূর থেকে সেই স্পাইডারম্যান ইন্সট্রাকটরদের পাহাড়ে আজব চিপকে থাকা দেখতে মনে ঝিকিমিকি। এসব দিনে খানিক সাহস বাড়ে আর একটুনও হাঁটু কাঁপে না। পা বেকায়দা জ্যান্ত থাকে আর খানিক ভেলকি দেখাতে গিয়ে টুপুস করে ইন্সট্রাকটরের কোলে খসে পড়ি। গোটা দিন জুড়ে ওমনিই পাথর ছুঁয়ে থাকি আর সিরিয়াস মুখ করে ক্লাস করতে করতে রঙচঙে স্ক্র্যাপবুকের পাতা ভরিয়ে ফেলি।
# জম্মে কখনো এক অ্যালার্মে উঠিনা। নিজের ত্যাঁদড়ামিগুলো নিজেরই জানা থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট কুড়ি আগে টাইম সেট করি। যতবার বাজে, পাঁচ মিনিট করে করে পিছিয়ে, ফের। কখনো ঘটনাটা মিনিট তিনেকেরও হয়। আর এই কদিন কানে হুইসেল গেলেই ছুট। সার বেঁধে যে যার লাইনে। ব্রাশ মুহূর্তে, লুকিয়ে সিগারেট মুহূর্তে, এমন কি পটি মুহূর্তেও। আর কেমন মজা লেগে থাকে গায়ে। এই অফুরান ছুট দেওয়ার মজা। স্যাক গোছাতে গোছাতে আমরা ক্রিম ঘষি, খেতে খেতে জুতোর ফিতে বাঁধি, আড্ডার সময়টুকুও মাপা। ওই স্লিপিং ব্যাগটুকু গোছ করতে করতেই ওদিকে সৌমিতা যখন সোমদত্তাকে টেনে বিনুনি বেঁধে দেয়, সেই তখন। প্রবল অ্যালার্জিতে ফ্যাচফ্যাচাতে ফ্যাচফ্যাচাতে ভয়াবহ হাহাহিহি চলে, "এই, এই, ওই রোপের ছেলেটা, কী জানি নাম..." রাত বাড়লে আমি মাটির আওয়াজ পাওয়ার চেষ্টা করি। ভেতরের, আরো ভেতরের ফিসফিসানি। টুপি পেরিয়ে সেসব কানে আসেনা বুঝি।
১৪/০১/২০১৭
জ্বর আর হাঁচির বালাই মোটামুটি পেরিয়ে আজ আস্ত দিন খালি ঝাঁপাঝাঁপি। এ যেন এক ভীষণ মহাজাগতিক রিয়েলাইজেশন ঘটেছে, এক এক ধাপ পেরিয়ে গেলেই মনের সুখে পরের লক্ষ্য খুঁজে নেওয়া আসলে সোজা, এসব আসলে স্পার্কলিং ওয়াটারের গ্লাসে চোখ রাখার মতো তিরতিরে স্বচ্ছ সুখ, যা খালি মরণদশা মনটাকে খানিক রসদ দিচ্ছে, আরো খানিক যুঝে নেওয়ার। ফলে ফাঁকফোকরে আজ মোবাইল বেরোচ্ছে টুপটাপ, সেল্ফি চলছে, দু'পা উঠেই কেঁদে ফেলা মেয়েটা চিমনি সেরে, জুমারিং সেরে ভাসিয়ে এসেই গল্পে মশগুল হচ্ছে জলদি।
# ক্যাম্পফায়ারের রাতে এক মনকেমনের আদিখ্যেতা থাকে। সেই ফিরতি পথেই তো দুনিয়ার শুকনো ডাল-পাতা জুটিয়ে নামা। এক্ষুনি, যখন হুহু শীত, গোল হওয়া আগুন ঘিরে একঝাঁক মানুষ গাইছে, "আগুনের পরশমণি..." আমার গলা ফুটছে না। এত আগুনে চোখ রাখা যায় বুঝি! ঝপ করে চোখ বুজে ফেলি। ঠোঁট নড়ছে বুঝি বা...
# খানিক আগেই প্রায় আবদারে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। চাঁদনি রাতে পাহাড় চাপব। আপাতত সেসব বানচাল হওয়ায় হুমড়ি শুয়ে। খানিক পর্দা সরিয়ে, অন্ধকারে মিশে গিয়ে। কনকনে হাওয়া আসছে আর সাথে আমাদের ক্যাম্পসাইটের মাথায় জমাট বেঁধে উঠছে সুর। আগুনের আঁচ এখন নিভু নিভু। চুপচাপ সরে আসি। শুয়ে একটা খুব খুব লড়াই চালানো যায়। মাটির আওয়াজ যে শোনেনি কোনোদিন, শুনতে পায়না, সেই কান শ্বাস আটকে পায়ের শব্দ চিনে নেওয়ার ফিকির খোঁজে।
১৫/০১/২০১৭
# ভয়ানক তেড়েফুঁড়ে পাহাড়ের মাথায়, এক্কেবারে উপরে এখন। ভেতরে সবটুকু এখন গাছের মতো স্থির। যতটা পারি চোখ চালাচ্ছি। পাথরে গাল চেপে ধরলে আমার আখরের কথা মনে হয়, ছাপাই মেশিন চলার প্রিয় সরগম। আর এই টের পাচ্ছি, আমি আগে কখনো 'ভার্টিগো' শব্দটা শুনিইনি।
# ক্লোজিং সেরিমনি চলছে। হুডি জিনিসটা বেশ কার্যকর সন্দেহ নেই। মুখ অনেকখানি ঢাকা থাকে। আমার দ্বারা কিস্যু বলা কস্মিনকালেও সম্ভব না, ভীষণ কেঁদে ফেলব। ভয়ানক। হুট করে কেউ যেন ঘুম থেকে তুলে বলছে, কাল থেকে আর হুইসেল বাজবে না, ছুটে আসতে হবে না। ধুস! কে বলে ইন্সট্রাক্টররা সব পারে! এসব সময় ছুট্টে চুড়োটায় পালিয়ে গেলে, ছুট্টে জঙ্গল টঙ্গল খুঁজে নিলে, নিদেনপক্ষে নিজের জন্যেই বা বানিয়ে নিলে, ফিরিয়ে আনে কার সাধ্যি!
# ক্যাম্পসাইট থেকে বেরো স্টেশন বেশ খানিক হাঁটা পথ। আসার সময় ভেবলে ছিলাম খানিক। নাকমুখ পেঁচিয়ে নাগাড়ে বকা খেতে খেতে আসা। এখন এই অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। টর্চের আলো থেকে বেশ কিছু তফাত রেখে হাঁটছি। ছবির মতো আঁধার, ন্যাড়া গায়েদের ছায়া। মেলার গান আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেছে। চারদিক ঝিম হলে নিজের বুকের ধুকপুকানি শোনা যায়। খুব ইচ্ছে করছে আলগোছে একটা হাত ধরা থাক। এক পৃথিবী পাওয়া মাঝেমাঝে খানিক ফিকে হয়ে আসছে শুধু ভাগ করে নিতে না পারার শোকে। এই জীবনে যেন আর কোনো তাড়া নেই, শুধু মুখোমুখি বসে থাকা আর জমাট স্তব্ধতায় চাট্টি ইথার মনে মনে পাঠিয়ে দেওয়ার সুখ, প্রিয়, বড় প্রিয় মনে হচ্ছে। হুঁ, ঠিক এটাই তো মুখটাকে কঠিন করার সময়। অন্ধকারেও অভ্যেস মেনে ঘড়িটুকু বারবার দেখতে যাওয়ার।
১৬/০১/২০১৭
শহরের সকালে এই প্রথম হাওড়া ব্রিজ পেরোচ্ছি আর হামলে পড়ে দুপাশ ঝুঁকে গঙ্গা দেখছি না, পিছন ফিরে স্টেশনের ঘড়ি। শুধু রাস্তায় উনুনের ধোঁয়া ঘন হলে এলে চমকে উঠে হাইরাইজ দেখছি। মোহম্মদ আলি পার্ক দেখছি আর গেল বার পুজো ভেবে উপচে উঠছি না। ভোরের কলিং বেলে বাবা দরজা খুলছে। আজ চাইলে ঘুমোনো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রাচুর্যের স্নান, আলিস্যি। লাইন করার ছুট আজ ভ্যানিশ। শুধু বেজায় এক চাওয়া, একটা পাথরে শুয়ে "ইয়ে রাতে ইয়ে মওসম নদীকা কিনারা...", চেনা জামা আঁকড়ে কালপুরুষ চেনা...