02/10/2025
“বান্ধবীর চাচার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেল—মানুষ শুনলে কী বলবে?”
সবকিছু এক মুহূর্তে ওলট-পালট হয়ে গেল। নিজের বান্ধবীর চাচার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে—কলেজে আমি মুখ দেখাবো কীভাবে! এগুলো ভাবতে ভাবতেই চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল তরীর। এই তো কবুল বলার সঙ্গে সঙ্গেই বর কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেল—তার খবর নেই। এক ঘণ্টা ধরে বসে আছি।
তাকে কখনো দেখিনি, সে ইতালিতে থাকে। যখন আমি গেট দিয়ে প্রবেশ করি, দেখি বর স্টেজে বসে আছে। দেখে পুরোই শক খেয়েছিলাম—জান্নাতের চাচা! এটা ভাবতে অবাক লেগেছিল।
তারা এখন বসে আছে শহরের সুনামধন্য এক কমিউনিটি সেন্টারে। এসেছিল বিয়ে খেতে, কিন্তু নিজেই এখন বউ। মাথা নিচু করে বসে আছে তরী, পরনে সিম্পল একটা শাড়ি—যেমন দাওয়াত খেতে গিয়ে মানুষ যেরকম পড়ে। মাথায় হিজাব। তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ নেই। তবে ভুল হবে যদি বলি কেউ নেই—বান্ধবীটা আছে। জান্নাতই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে, সবকিছু মেনে নিতে বলছে।
সে সৎ মায়ের সংসারে থাকে। সেখানে যে কী জ্বালা—! বাবা থেকেও নেই, সৎ মা যা বলে তাই হয়।
একটা খারাপ কিছু হলে মানুষ বলে—আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। কিন্তু আমার মতো অভাগীর সঙ্গে কি কখনো ভালো হয়? ব্যাকুবের মতো চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল, অথচ এই চোখের পানি তো কত বছর আগেই শুকিয়েছিল। আজ আবার কেন জেগে উঠলো—ভাবতেই ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠলো তাচ্ছিল্যের হাসি।
দাওয়াতি অতিথিরাও অবাক। বিয়ে খেতে এসে এমন বদল—যার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সে পালিয়েছে। ছেলেটা আজকেই বিয়ে করবে, জেদের কাছে হার মেনে পরিবারের সবাই তরীকে রাজি করালো। সৎ মা তো বরাবরই লো-ভী—বড়লোক বাড়িতে মেয়ে বিয়ে দিলে অনেক লাভ। এক কথায় রাজি। কেমন করে মেয়েকে রাজি করালো—কেউ বুঝলো না।
“এই তরী, ওঠ। এখন আমাদের যেতে হবে। এখান থেকে যেতে আধা ঘণ্টা লাগবে। দাদীমা অনেক ঝামেলা করছে, এখনই বের হতে হবে।”
মাথা তুলে তরী তাকালো বান্ধবী জান্নাতের দিকে। জান্নাত আতঙ্কিত চোখে তাকালো—তরীর চোখ যেন লাল টুকটুকে, মনে হয় টোকা দিলে র-ক্ত ঝরবে। আচ্ছা, মেয়েটা কি কাঁদছে? কেন জানি একবার কান্না করলো, চোখের পানি গড়ালো, কিন্তু আর নয়।
“জানিস জান্নাত, আমি অভাগী সবখানে ঝামেলা।” —ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।
“শোন তরী, জীবনে ওঠা-নামা থাকবেই। আর আমার চাচ্চু অনেক ভালো মানুষ। তুই খুব ভালো থাকবি। দাদীমা একটু ঝামেলা করবে, কিন্তু তার কারণ আছে। পরে সব শুনবি।”
পেছন থেকে জান্নাতের বাবার গলার স্বর ভেসে এলো—
“জান্নাত, তাড়াতাড়ি আয়। অনেক রাত হলো, দেরি হচ্ছে। তরীকে সঙ্গে নিয়ে আয়।”
বলে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন।
জান্নাত তরীর হাত ধরে হাঁটতে লাগলো। পেছন থেকে শোনা গেল কয়েকজন মহিলার ফিসফিসানি
“জামাই ছাড়া বউ কীভাবে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে, দেখো!”
“আমার তো মনে হয় ছেলে মেয়েটাকে পছন্দ করেনি। ছেলে এত সুন্দর—আকাশের চাঁদ, আর কোথায় কী! মেয়ের হয়তো অনেক লো-ভী আছে, না হলে স্বামী ছাড়া শ্বশুরবাড়ি যায় কেমন করে?”
সব কথা কানে এলো। জান্নাত ফিরে এসে মহিলাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল—
“তোমাদের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছি, খেয়েছেন, এখন গিফট দিয়ে চলে যাও। তোমাদের আর দরকার নেই। গ্রামের সিসি ক্যামেরা , এখন শহরে আছে।”
মহিলারা থমকে গেল। তারা কি গিফট দিবে না। এ মেয়েটা কেমন কথা বলল!
জান্নাত তরীর হাত ধরে গেটের সামনে এলো। ওখানে বাবা-মা টেবিলে বসে হাসাহাসি করছে। অথচ মেয়ের বিদায়ের সময় বাবা-মা অনেক কাঁদেন—এখানে কিছুই হলো না। তরী অবাক চোখে তাকালো বাবার দিকে। মনে হলো—সে ম-রে গেলেও বাপের চোখে পানি আসবে না।কত বিয়ে সে দেখেছে মেয়ে বিদায়ের সময় বাবা কান্না করে মেয়ে কান্না করে। আর আমার বাবা আসর জমাইছে।
চোখাচোখি হলো। বাবা উঠে এসে শুধু বলল—
“কিছু লাগবে?”
তরী অবাক হলো। এ কেমন কথা? ইচ্ছে করছিল বলতে—“আব্বু, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে রেখে যাচ্ছি, অথচ তুমি আমায় ভালোবাসো না।” কিন্তু বলা হলো না।
পেছন থেকে সৎ মা এসে বলল—
“কিরে, তাড়াতাড়ি যা। দেরি হচ্ছে। সবাই বসে আছে তোমাদের জন্য।”
জান্নাত হাত ধরে গাড়িতে বসালো।
“তুই যাদের জন্য কষ্ট পাস, তারা তোর জন্য কষ্ট পায় না—এটা তোকে কতবার বলেছি।”
তরী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
“জান্নাত, তুই ভিতরে আয়।সে ওখানেই থাকুক দরজার বাইরে…”
চলবে…
এক সন্ধ্যাময় প্রেম
কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন, ভালো হলে লিখব না হলে লেখব না। ভুল হলে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন।
# #
গল্পটির পরবর্তী পর্ব পড়তে গল্প টা ভালোবাসার পেজটি ফ-লো দিয়ে রাখুন