17/02/2018
শুভ জন্মদিন এবি ডি ভিলিয়ার্স
প্রিটোরিয়া, দক্ষিন আফ্রিকা। সময়কাল নব্বুই দশকের শুরু। পেশায় চিকিৎসক আব্রাহাম বেঞ্জামিন মাত্রই রোগী দেখে ফিরেছেন। বাড়ীর সামনে উঠোনমতো জায়গাটায় ক্রিকেট খেলছে তাঁর তিন ছেলে। বড়ো দুজন কৈশোরে পা দিয়েছে; আর একদম ছোটজন, বাবার সবচাইতে আদরের আব্রাহামের বয়স তখন মাত্র আট কি নয়। লনে একটা চেয়ার পেতে খেলা দেখতে বসলেন বেঞ্জামিন। নিজেও একসময় প্রচুর রাগবি খেলেছেন, খেলাধুলা ব্যাপারটা রক্তেই মিশে আছে। বর্ণবাদের ছোবল থেকে মুক্ত হবার পর মাত্র বছরখানেক আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরেছে দক্ষিন আফ্রিকায়; ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে সবাইকে দারুণ মাতিয়েও নিয়েছে। বেশ অনেকক্ষণ ফিল্ডিং করার পর ব্যাট হাতে নেয়ার সুযোগ পেল আব্রাহাম। এরমধ্যেই দু-তিনবার বড় ভাইদের পানি এনে খাইয়েছে সে।
পরের আধঘন্টার মতো সময় বেঞ্জামিন মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে রইলেন। শরীরের সমান সাইজের একটা ব্যাট আঁকড়ে ধরে তাঁর ছোট ছেলেটা স্রেফ নাচিয়ে গেলেন দুই বড়োভাইকে। শর্টবল, বাউন্সার, কোমরের ওপর ছুঁড়ে মারা বিমার- কোনটাই কাজে এলো না। সবুজ ঘাসের লনে সাদা শার্ট পরিহিত আব্রাহামকে তখন ক্রিকেটের স্বর্গদূত মনে হচ্ছিলো বাবার কাছে। সেই আব্রাহাম যখন বছর দশেক বয়সে প্রিটোরিয়ার স্কুলের ক্রিকেট টিমে সুযোগ পেল, তখন তাতে আপত্তির কিছু দেখলেন না বেঞ্জামিন। স্কুল দলে তাঁর সতীর্থরা সবাই ছিল তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সের। আব্রাহামই ছিলেন সবার মধ্যে কনিষ্ঠতম। এরপরের গল্পটা এগিয়ে যাওয়ার। খেলাধুলায় বেঁধেছিলেন প্রাণ, সেই খেলাকেই সঙ্গী করে সামনে এগিয়ে চলা; ধরা দিলো সফলতাও।
শুধু ক্রিকেটেই বেঁধে রাখেননি নিজেকে, জুনিয়র লেভেলে ডাক পেয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় হকি দলের ক্যাম্পে, বাবার পছন্দের খেলা রাগবিতেও আগ্রহ ছিল তার, জুনিয়র সাঁতার প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন পুরষ্কার। বয়সভিত্তিক ব্যাডমিন্টনে স্কুল পর্যায়ে হয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন, বাড়ী থেকে দূরের একাডেমীতে যোগ দিতে হবে- এই কারনে পেশাদার টেনিসে উজ্জ্বল ভবিষ্যত থাকার পরও ছেড়ে দিয়েছিলেন খেলাটা, ঘরোয়া পর্যায়ে খেলেছিলেন গলফও, যা কিনা এখনও অবসরের সঙ্গী। থেমে ছিলো না পড়ালেখাও। স্কুলে সবচেয়ে পরিচিত মুখ ছিলেন আব্রাহাম; রেকর্ড মার্কস নিয়ে স্কুল ছেড়েছিলেন, জাতীয় বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্যে জিতেছিলেন ম্যান্ডেলা অ্যাওয়ার্ড; দারুণ গিটার বাজাতে পারেন- এতোক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা কাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স, এবি ডি ভিলিয়ার্স নামে যাকে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব চেনেন; যে নামে আতঙ্ক ছড়ায় বোলারদের মনে, প্রতিপক্ষ অধিনায়কের রাতের দুঃস্বপ্নে হানা দেন যিনি প্রতিনিয়ত।
বর্ণবাদের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর ১৯৯২ বিশ্বকাপই ছিলো দক্ষিন আফ্রিকার প্রথম আইসিসি ইভেন্ট। এবি তখন আট বছরের বালক; টিভিই একমাত্র সম্বল খেলা দেখার। সেখানেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জন্টি রোডসের অসাধারন ফিল্ডিং মুগ্ধ করলো তাঁকে; সিডনীতেক্রেইগ ম্যাকডারমটকে দারুণ ক্ষিপ্রতায় রানআউট করা রোডসের বুনো উল্লাস শিহরণ জাগালো হাজার মাইল দূরের প্রিটোরিয়ার এক শিশুর মনে; ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসাটা হলো শুরু। গলফ-টেনিস-হকি-রাগবি-সাঁতার ছেড়ে ক্রিকেটে গড়লেন বসতি।
স্কুল ক্রিকেট খেলতে খেলতেই চোখে পড়লেন টাইটানস(দক্ষিন আফ্রিকার ঘরোয়া দল) কোচ ডেভ এর নজরে। পাকা জহুরী ডেভ, খাঁটি মুক্তো চিনতে ভুল করলেন না। ২০০৩ বিশ্বকপের আসর বসেছে দক্ষিন আফ্রিকায়, দলগুলো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছে নিজেদের মধ্যে, কেউবা আফ্রিকান ঘরোয়া দলগুলোর বিপক্ষে খেলেই নিজেদের ঝালিয়ে নিচ্ছে। তেমনই একটি ম্যাচে টাইটানের হয়ে কানাডার বিপক্ষে অভিষেক হয়ে গেলো উনিশ বছরের ভিলিয়ার্সের। এবি’র ভাষায়- “আমি নার্ভাস ছিলাম সেই মূহুর্তে; কিন্ত চাপের মধ্যেই আমি আমার সহজাত খেলাটা খেলতে পারি, যেখানে লোকে আমাকে দেখছে। সুযোগের সঠিক ব্যাবহার করাটাই আমার কাছে সফলতা; আর আমি সেটা দুহাতে কুড়িয়ে নিয়েছি”…
অনূর্ধ-১৯ দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন আগে থেকেই, কিন্ত ২০০৩ সালের ইংল্যান্ড সফর তাঁকে বয়সভিত্তিক দলের তারকা বানিয়ে দিলো। ক্রিকফাঙ্গাস ক্লাব আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের হয়ে ইউরোপ মাতালেন। সেটাই ভিলিয়ার্সের প্রথম বিদেশ সফর; ঘরকুনো ছেলেটা হঠাৎ করেই পুরুষ হয়ে উঠলেন এরপরেই। টাইটানসের হয়ে ঘরোয়া লীগেও ব্যাটে বইলো রানের ফল্গুধারা; যার ফলাফলে পরের বছরই খুলে গেলো জাতীয় দলের দরজা। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ইংল্যান্ড এলো দক্ষিন আফ্রিকা সফরে, ১৬ ডিসেম্বর পোর্ট এলিজাবেথে সিরিজের প্রথম টেস্টে গ্রায়েম স্মিথের সাথে ইনিংসের উদ্বোধন করতে নামলেন বিশ বছরের ভিলিয়ার্স। স্মিথ শূন্য রানে ফিরে গেলেও দ্বিতীয় উইকেটে জ্যাক রুডলফকে সাথে নিয়ে ৬৩ রানের জুটি গড়লেন অভিষিক্ত এই ব্যাটসম্যান। এন্ড্রু ফ্লিনটফের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ার আগে নিজের খাতায় যোগ করলেন ২৮ রান, পরের ইনিংসে করতে পারলেন ১৪। পরের টেস্টেই নিয়মিত উইকেটরক্ষক বাউচারের অনুপস্থিতিতে গ্লাভস হাতে উইকেটের পেছনে দাঁড়ালেন, দ্বিতীয় ইনিংসে করলেন অপরাজিত অর্ধশতক। সিরিজের শেষ টেস্ট সেঞ্চুরিয়নে, আবার ওপেনিং পজিশনে ফিরে গেলেন, প্রথম ইনিংসে করলেন ৯২, পরের ইনিংসে পেয়ে গেলেন আরাধ্য শতকের দেখা। ফ্লিনটফ-হগার্ড-জোন্সদের গতি সামলে খেললেন ১০৯ রানের ইনিংস, হলেন ম্যাচসেরা। সেই সিরিজে এবি’র রান চল্লিশের বেশী গড়ে ৩৬২, সেঞ্চুরীর পাশে দু’টো হাফ সেঞ্চুরী।
পরের বছর ফেব্রুয়ারীতে ইংল্যান্ড সিরিজেই ওয়ানডে অভিষেক; দ্বিতীয় ম্যাচে সুযোগ পেলেন দলে; অভিষেকে সংগ্রহ বিশ রান। সিরিজে চার ম্যাচে সুযোগ পেয়েও করতে পারলেন না তেমন কিছু, জায়গা হারালেন দলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্টে খেললেন ১৭৮ রানের ইনিংস, জেতালেন দলকে। অস্ট্রেলিয়া সফরে আবার রানের জন্যে হাপিত্যেশ, ওয়ার্নের ঘূর্ণিতে পরাস্ত হলেন বেশ ক’বার। ছয় ইনিংসে করলেন ১৫২ রান। ওয়ানডেতেই বরং কেমন যেন বিবর্ণ দেখাচ্ছিলো এবি’র ব্যাট। সেঞ্চুরি পাচ্ছিলেন না অভিষেকের দুই বছর পরেও। মাইলফলকের জন্যে বিশ্বকাপকেই মঞ্চ বানিয়ে নিলেন; সুপার এইটের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তুলে নিলেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরী, ১৩০ বলে খেললেন ১৪৬ রানের ইনিংস।
পরের বছরটা ভিলিয়ার্স শুরু করলেন নতুনভাবে। আহমেদাবাদে ভারতের বিপক্ষে টেস্টে প্রথম প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান হিসেবে পেলেন ডাবল সেঞ্চুরীর দেখা। হেডিংলিতে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চাপকে জয় করে খেললেন ১৭৪ রানের ইনিংস; যেটিকে জ্যাক ক্যালিস বলে থাকেন এবির ক্যারিয়ারের পূর্ণতাপ্রাপ্তির সূচনা হিসেবে। ক্যালিসের ভাষায়- “২১ বছর বয়সেই ও যা পারত, আর কেউ তা পারত না। একটিই মাত্র সমস্যা ছিল। এটা শেখা যে ‘কখন ও কোথায়’। সবকিছুই করতে পারত সে, সবকিছু। শুধু জানতো না কখন, কোন পরিস্থিতিতে করতে হবে। সেটা বুঝতে পারল ২০০৮ সালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে মিডঅনে আলতো এক ক্যাচ দিয়ে আউট হলো বাজেভাবে। এরপর অধিনায়ক স্মিথ ও কোচ মিকি আর্থার ওর সঙ্গে কথা বলল। একদম খোলামেলা কথা, কোনো রকম শিথিলতা ও সহানুভূতি না দেখিয়ে। ওরা বলেছিল যে, ‘তোমার এখন সময় হয়েছে প্রতিভার প্রমাণ পারফরম্যান্সে দেখানোর। করে দেখাও।’ হেডিংলিতে পরের ম্যাচেই এবি ১৭৪ করল। আমাদের জয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল ওই ইনিংস। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, ও বুঝতে শিখেছিল যে প্রতিভার পরিচর্যা কীভাবে করতে হয়।” ২০১০ সালের নভেম্বরে আবুধাবীতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬০১ মিনিট বাইশ গজে কাটিয়ে খেললেন ক্যারিয়ারসেরা ২৭৮ রানের ইনিংস; যেটি এশিয়ার মাটিতে কোন দক্ষিণ আফ্রিকানের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত সংগ্রহ। ২০১২-তে হাশিম আমলার ট্রিপল সেঞ্চুরীর আগে এটি ছিলো টেস্টে যেকোন প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত ইনিংস।
সাল ২০১৫, জানুয়ারীর আঠারো তারিখ; জোহানেসবার্গ সাক্ষী হলো ভিলিয়ার্স তাণ্ডবের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের ছাতু বানিয়ে মাত্র ৩১ বলে তুলে নিলেন সেঞ্চুরী- যেটি কিনা ওয়ানডে ক্রিকেটের পঁয়তাল্লিশ বছরের ইতিহাসে দ্রুততম। নয়টি চারের পাশে ষোলটি ছক্কা; এবি থামলেন ৪৪ বলে ১৪৯ করে। দুই মাস পরে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে আবার তাঁর ব্যাটের পাশবিকতার শিকার হলেন ক্যারিবীয় বোলারেরা, এবার সতেরো চার আর আট ছয়ে ৬৬ বলে ভিলিয়ার্সের সংগ্রহ অপরাজিত ১৬২ রান। সে বছরই ভারত সফরের পাঁচ ম্যাচ সিরিজে তিনবার শতক করে উঁচিয়ে ধরলেন ব্যাট; অধিনায়ক হিসেবে ভারতের মাটিতে একই সিরিজে তিনটি ওয়ানডে সেঞ্চুরীর একমাত্র রেকর্ড যেটি।
এবি ডি ভিলিয়ার্সকে রেকর্ডের বরপুত্র বললে বোধহয় খুব একটা ভুল হবে না। ওয়ানডেতে বলের হিসেবে দ্রুততম ৫০, ১০০ এবং ১৫০ রানের রেকর্ড তাঁর দখলে। এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার(১৬টি) রেকর্ডেও রোহিত শর্মা আর ক্রিস গেইলের পাশে ভাগ বসিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের গেইলের সাথে সর্বোচ্চ ৩৭টি ছক্কার মালিক এই ডানহাতি প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান। ক্যারিয়ারে চব্বিশটি ওয়ানডে সেঞ্চুরীর সবক’টিতেই স্ট্রাইকরেট ছিলো একশো’র বেশী। অভিষেকের পর টানা ৭৮ টেস্ট ইনিংস ছিলেন ডাক(শূন্য) না মেরে, এটাও একটা রেকর্ড; তাঁকে প্রথম বিনা রানে প্যাভিলিয়নে ফিরিয়েছিলেন আমাদের সাকিব আল হাসান। ওয়ানডেতে দ্রুততম সময়ে আট হাজার রান সংগ্রহের কৃতিত্বও তাঁর। আইপিএলে বেঙ্গালোরের হয়ে বিরাট কোহলীর সাথে ৯২ বলে ২২৯ রানের জুটি গড়েছিলেন, যেটি স্বীকৃত টি-২০ ম্যাচে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রানের জুটি; সেদিন ভিলিয়ার্স অপরাজিত ছিলেন ৫২ বলে ১২৯ রানে, গুজরাট লায়ন্সের বোলারেরা পিষ্ট হয়েছিলেন তাঁর ব্যাটের নীচে। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি, টি-২০ তে নিজের দেশের হয়ে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড তাঁর, টেস্টে আফ্রিকার দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ানও তিনিই।
সদ্য শেষ হওয়া ভারত সিরিজ পর্যন্ত ভিলিয়ার্স টেস্ট খেলেছেন ১১০টি, ১৮৩ ইনিংসে প্রায় পঞ্চাশ গড়ে তাঁর রান ৮৩৩৮। ২১টি সেঞ্চুরীর পাশাপাশি আছে ৪২টি হাফ সেঞ্চুরী। ওয়ানডেতে ভিলিয়ার্স তো বোলারদের জন্যে ত্রাসের অপর নাম; তাঁর স্ট্রাইকরেট আর ডন ব্র্যাডম্যানের গড় দুটোই সমান। ২২৮ ওয়ানডেতে ২১৮ বার উইলো হাতে নেমেছেন, নামের পাশে প্রায় সাড়ে নয় হাজার রান। ৫৪ ছুঁইছুঁই গড়ের সাথে সেঞ্চুরীপঁচিশটি, পঞ্চাশ করে ব্যাট উঁচিয়ে ধরেছেন ঠিক ৫৩ বার! আন্তর্জাতিক টি-২০তে সেঞ্চুরী না পেলেও অর্ধশতক আছে দশটি। টেস্টে পাঁচবার হয়েছেন ম্যাচসেরা, চারবার সিরিজসেরা। ওয়ানডেতে পঁচিশবার ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছেন, সিরিজ সেরার পুরস্কার ঘরে তুলেছেন ছয়বার।
ব্যাটকে শাণিত তলোয়ার বানিয়ে প্রতিপক্ষ বোলারদের কচুকাটা করাই যার কাজ, সেই ডি ভিলিয়ার্সের আশ্চর্য বিপরীত রূপও দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ২০১২ সালে পার্থের সবুজের বুকে ফাফ ডু’প্লেসিসকে সাথে নিয়ে ধৈর্য্যের প্রতিমূর্তিতে পরিণত করেছিলেন নিজেকে। ম্যাচের চাহিদা অনুযায়ী ২৪৬ মিনিট মাঠে টিকে ছিলেন শুধু দলকে হারের মুখ থেকে বাঁচাতে, ২২০বলের মোকাবেলায় করেছিলেন মাত্র তেত্রিশ রান! ২০১৫, দিল্লি টেস্ট- সিরিজ হার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে এরমধ্যে, সেই ম্যাচেও পরাজয় এড়াতে নিজের স্বাভাবিক খেলাকে বিসর্জন দিয়ে রক্ষণঢাল বানিয়েছিলেন ব্যাটকে। ৩৫৪ মিনিট বাইশ গজে কাটিয়ে রান করেছিলেন ৪৩টি, বল খেলেছিলেন ২৯৭টি, স্ট্রাইক রেটা তাঁর নামের বিবেচনায় শিউরে ওঠার মতো- ১৪,৪৭! অশ্বিন-জাদেজা-মিশ্রদের একের পর এক টোপ ছেড়ে দিয়েছেন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায়, ম্যাচ হারলেও ক্রিকেট বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের কাতারে নিজের নামটা পাকাপোক্তভাবেই লিখিয়ে ফেলেছিলেন এবি।
১৯৯২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা দল যখন অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বকাপ মিশনে, তখন টিভি পর্দায় উৎসুক চোখ মেলে থাকা ছেলেটা এখন দক্ষিন আফ্রিকানদের সেরা ক্রিকেটার, সেরা ব্যাটসম্যান, তর্কযোগ্যভাবে বিশ্বেরই সেরা ব্যাটসম্যান। ২০১০, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে জিতেছেন আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। ট্রান্সভাল প্রোভিন্সের আব্রাহাম বেঞ্জামিনের ছোট্ট ছেলেটার ব্যাটে শাসিত হয় দুনিয়ার তাবৎ বোলার, বলকে উড়িয়ে কিংবা গড়িয়ে সীমানাছাড়া করাই যার বড়ো কাজ এখন। ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন অনেকদিন, ফিরেও স্বরূপে দেখা দিতে পারেননি। বছরখানেক আগেই কনুইয়ের ইনিজুরীর কারনে ছেড়েছেন জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব। ব্যাক্তিগত জীবনে এই মানুষটাই আবার ভীষণ রোমান্টিক। স্ত্রী ড্যানিয়েলা এবং ছেলে আব্রাহামকে নিয়ে তিনজনের সংসার…এক মিনিট, ছেলের নাম? আব্রাহাম ডি ভিলিয়ার্স; হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। দাদা-বাবা-ছেলে সবাই এক নাম! বেশ মজার ব্যাপার কিন্ত! খেলা না থাকলে স্ত্রীকেই সময় দেয়া হয় বেশী, রাতে গিটার বাজিয়ে শোনাতে হয় প্রায়ই। ইউটিউবের কল্যানে ডি ভিলিয়ার্সের গিটারে পারদর্শীতার কথা প্রায় সবারই জানা; সেই সাথে দারুণ গানও করেন এবি।
বাইশ গজে তাণ্ডব চালালেও মাঠে আপাদমস্তক ভদ্রলোকের প্রতিমূর্তি এবি ডি ভিলিয়ার্স। অপ্রয়োজনে তর্কে জড়িয়েছেন কারো সাথে- এমনটা শোনা যায়নি কখনও; এক যুগের বেশী বয়স হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, কেউ আঙুল তুলতে পারেননি এবি’র দিকে কোনদিন, নিজের সেই ইমেজটা ধরে রেখেছেন বরাবর। তাঁর যতো পাশবিকতা সব ব্যাট হাতে নিংড়ে দেন বাইশ গজের পীচে, বোলারদের ওপর। এর বাইরে ভিলিয়ার্সের মতো ভদ্রলোক ক্রিকেটে দু-তিনজনের বেশী পাওয়া যাবে না এখন। পঁয়ত্রিশ ছাড়িয়ে ছত্রিশে পা দিলেন আজ, ১৯৮৪ সালের এইদিনে, প্রিটোরিয়ার আব্রাহাম বেঞ্জামিন-মিলি দম্পতির তৃতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছিলো ঠিক এই দিনে। মেঘে বেলা হয়েছে অনেক, হয়তো ২০১৯ বিশ্বকাপেই শেষ করবেন বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের। ক্রিকেট থাকবে তার সৌন্দর্য্যের অফুরান ভাণ্ডার নিয়ে, সেই ভাণ্ডারের সবচেয়ে সুন্দর গোলাপগুলোর একটি, এবি থাকবেন না। তবে রেকর্ডের পাতায় আরো অনেক বছর জ্বলজ্বল করবে তাঁর নাম, যেমনটা জ্বলজ্বল করবে তাঁর দানবীয় শটগুলো, আমাদের মনে।
শুভ জন্মদিন সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান…