10/12/2011
মনের মধ্যে ঘুণপোকার বাসা। আত্মবিশ্বাসকে কুরে কুরে খাচ্ছে সেই ঘুণপোকা। কারও মনেই বেজে উঠছে না ‘আমরা করব জয়ে’র সুর। বরং এক পা পিছিয়ে নিজেকেই নিজের প্রশ্ন, ‘আমি কি পারব...মিলবে কি রানের দেখা?’ ভেতর থেকে ‘না’টাই বোধ হয় জোরে শোনা যায় বেশি।
বড় দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাটিং। এমন সময় আসতেই পারে, এক-দুজনের রানের ওপর ভর করে চলছে দল। বাকিদের ব্যাটিং ধর্তব্য নয়। কিন্তু এবার থমকে গেছে সবারই চাকা। রান নেই কারও হাতে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ।
কী থেকে এমন হচ্ছে—সেই গবেষণা চলছে, আরও কত দিন যে চলবে! তবে কোচ স্টুয়ার্ট ল-র ময়নাতদন্ত খুঁজে পেয়েছে ‘ক্লু’। ব্যাটসম্যানদের মন ঘুণপোকায় আক্রান্ত। আত্মবিশ্বাস গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে উইকেটে। মনস্তাত্ত্বিক জালে আটকে গেছে সব সামর্থ্য। চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে ল-র কাছ থেকেই শোনা গেল, ‘এমন নয় যে, এটা অনুশীলনের অভাবে হচ্ছে বা খেলোয়াড়দের বোঝানো হচ্ছে না। মনস্তাত্ত্বিক বাধার কারণেই এটা হচ্ছে। আসলে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না ব্যাপারটা কী...।’
কীভাবেই বা বোঝাবেন? কাল সকালের দিকে বল একটু ধীরে এলেও প্রথম টেস্টের উইকেট এখনো পর্যন্ত ব্যাটসম্যানদের বন্ধু। লম্বা সময় ব্যাটিং করার প্রতিজ্ঞা থাকলে এখানে ব্যাটসম্যানদের আউট করা কঠিন। অথচ প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ১৩৫ রানেই অলআউট! পাকিস্তানের বোলাররা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আউট করেছেন, সেটা বলতে আপত্তি স্টুয়ার্ট ল-র। তাঁর কথা, ‘আমরা খুব সহজেই উইকেট দিয়ে আসছি। বারবার এটা হচ্ছে। খুবই হতাশাজনক।’
ল-র পর্যবেক্ষণ, উইকেটে গিয়ে ব্যাটিংয়ের অ-আ, ক-খ’ও ভুলে যাচ্ছেন ব্যাটসম্যানরা। পরিস্থিতি বিশেষে আক্রমণই সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেটাও পারছেন না। তার পরও অন্ধকার ব্যাটিংয়ের দিনে ল-র চোখে মৃদু আলো ছড়িয়েছে অভিষেক টেস্ট খেলতে নামা নাজিমউদ্দিন ও নাসির হোসেনের ব্যাটিং, ‘অভিষেকেই নাজিমউদ্দিন খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। খুব স্বচ্ছন্দ ছিল। এ ছাড়া নাসিরও রানের ধারা ধরে রেখেছে।’
নাসির, নাজিমউদ্দিন ব্যতিক্রম। নইলে আর সবার মতো কোচও মনে করছেন, বাংলাদেশের ব্যাটিং এখন আসলে কিছুই হচ্ছে না। কারণটা মানসিক। কোনো না কোনোভাবে এই বাধা ছোটাতে হবে। সেটা পারলে আরেকটি মুলতান টেস্ট বা তার চেয়েও ভালো কিছু অসম্ভব নয়, ‘মুলতান টেস্টের মতো আরেকটা টেস্ট হতেই পারে। ড্রেসিংরুমে প্রতিভার অভাব নেই। ব্যাটিংটা ভাবলে তো খুবই ভালো সবাই। সমস্যা হলো, এই মুহূর্তে কেউই রান করছে না।’ সংবাদ সম্মেলন থেকে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে হতাশাই ঝরল ল-র কণ্ঠে। তবে কোচের তো আর
বিশ্বাস হারালে চলছে না। আশায় আছেন, হঠাৎই কালো মেঘটা সরে যাবে। দেখা মিলবে উজ্জ্বল সূর্যের, ‘অনুশীলনে সবই খুব ভালো হচ্ছে। উইকেটে গিয়েও ও রকম খেলতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে, যা করছি ঠিক করছি এবং আমি নিশ্চিত, যেকোনো সময় আমরা পরিস্থিতি পাল্টে দেব।’
গত এক-দেড় বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘পোস্টার বয়’ হয়ে ওঠা সাকিব-তামিমও এই সিরিজে ভিড়েছেন রান না পাওয়াদের দলে। তবে ল-কে মনে হলো এই দুজনের ব্যাপারেই কিছুটা নিশ্চিন্ত, ‘দুজনই খুব ভালো ব্যাটসম্যান। সব সময় দলের জন্য কিছু না কিছু করছে। তবে এমন নয় যে প্রতি ম্যাচেই তাদের রান করতে হবে। খারাপ সময় সবারই যায়, তাদেরও যাচ্ছে। সাকিব-তামিমের রানে ফেরা একটা মাত্র ভালো বাউন্ডারির ব্যাপার।’
ব্যাটসম্যানদের মতো প্রথম দিন হতাশায় কেটেছে বোলারদেরও। ল অবশ্য বোলারদের ব্যর্থ বলছেন না, ‘শুরুর দিকে উইকেটে কিছুটা শিশির ছিল। তখন বোলাররা সাহায্য পেলেও পেতে পারে। তবে এই উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্যই আদর্শ।’ তার পরও তৌফিক উমরকে চাপে ফেলতে পারায় কোচের প্রশংসা পেয়েছেন বোলাররা।
টেস্টটা শেষ দিন পর্যন্ত নিয়ে যেতে এই চাপ ধরে রাখা জরুরি। নিশ্চিত করতে হবে হঠাৎ আসা সুযোগের সদ্ব্যবহার। কিন্তু এই টেস্ট পঞ্চম দিনের সূর্য দেখবে, এমন বিশ্বাস খুব বেশি মানুষের কি আছে? যে দু-চারজনের আছে, স্টুয়ার্ট ল তাদের একজন, ‘আমাকে ইতিবাচক থাকতে হচ্ছে। এখনই ঢাকা যাওয়ার কথা ভাবতে পারছি না। এ রকম পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েই ক্রিকেটের সেরা জয়গুলো এসেছে। ওভাবে চিন্তা করাই ভালো।’
ঘুণপোকার বাসা ভেঙে খেলোয়াড়েরাও কি পারবেন এই বিশ্বাসটা বুকে রাখতে?