05/12/2023
২০০১ সালে মেয়ে বিসমাহ আনোয়ারের মৃত্যুতে সাঈদ আনোয়ার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন খুব। এই ঘটনা তাঁর খেলোয়াড় জীবনেও বিরাট প্রভাব ফেলেছিলো, কিন্তু তিনি তখনই খেলা ছেড়ে দেননি। খেলেছিলেন ২০০৩ -এর বিশ্বকাপ পর্যন্ত।
২০০১ সালের ২৯ আগস্ট মুলতানে শুরু হওয়া পাকিস্তান-বাংলাদেশ টেস্ট চলাকালীন সময়ে মেয়ে বিসমাহ আনোয়ারের মৃত্যুর সংবাদ পান পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ওপেনার সাঈদ আনোয়ার। বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা সেই টেস্টই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ টেস্ট এবং সেই টেস্টে তিনি ১০৪ বলে ১০১ রান করেছিলেন।
কিন্তু এরপরও ওয়ানডে খেলে গেছেন ২০০৩ -এর বিশ্বকাপ পর্যন্ত। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে ৫ ইনিংস ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে ৫৪ এভারেজে ২১৮ রান করেছিলেন যা ছিলো পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু তারকায় ঠাসা পাকিস্তানের বিশ্বকাপে ভরাডুবির বলির পাঠা হন সাঈদ আনোয়ার। ভালো ফর্মে থাকা সত্বেও বিশ্বকাপের পর আর দলে ডাক পাননি। বয়সটা সেই সময় ৩৪ হলেও ফর্মের সাথে ফিটনেসটাও ছিল দুর্দান্ত। সবচেয়ে বড় কথা তখনকার দলে তিনি ছাড়া আর কোন নিয়মিত পারফর্ম করা ওপেনারও ছিল না। এত কিছুর পরও নির্বাচকরা বিশ্বসেরা ওপেনার সাঈদ আনোয়ারকে আর দলে ডাকেননি। সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়ে তাঁর আর ফেরাও হয়নি পাকিস্তান দলে। তাই ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে অনেকটা বাধ্য হয়েই জাতীয় দল থেকে দেন অবসরের ঘোষণা।
ওয়ানডে অভিষেকটা হয়েছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৯৮৯ সালে। শুরুটা অবশ্য করেছিলেন বাজেভাবেই। প্রথম ১১ ওয়ানডেতে করেছিলেন মাত্র ১৮৪ রান; ছিলো না কোনো পঞ্চাশ রানের ইনিংসও। তবে ১২ তম ম্যাচে গিয়েই পেয়েছিলেন প্রথম সেঞ্চুরির দেখা। এডিলেড ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯৯ বলে ১২৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন নিজের আগমনী বার্তা। এর ৯ ম্যাচ পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও করেছিলেন দারুণ এক সেঞ্চুরি তবুও জায়গা হয়নি ১৯৯২ সালে পাকিস্তান প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ী দলে। এইদিক বিবেচনায় সাঈদ আনোয়ার নিজেকে কিছুটা অভাগা ভাবতেই পারেন।
সাঈদ আনোয়ার বরাবরই ছিলেন ম্যাচ উইনার। তিনি যখন খেলতেন, পাকিস্তান দলের একের পর এক উইকেটের পতন হচ্ছে আর অপর প্রান্তে তিনি একা দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, এমন দৃশ্য দেখা যেতো হরহামেশাই।। ওয়ানডেতে মোট ১২ বার 'ক্যারি দ্যা ব্যাট' এর ছোট তালিকায়ও আছে তাঁর নাম। শুধু ওয়ানডেতে নয় প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আছে দুই ফর্মটেই ব্যাট ক্যারী করার রেকর্ড। মোট ২৪৭ ওয়ানডেতে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হন ২৮ বার। পাকিস্তান দলে এর চেয়ে বেশী বার ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হয়েছিলেন শহীদ আফ্রিদি, ৩২ বার। তাও তাঁর চেয়ে ১৫১ টি ম্যাচ বেশি খেলে। আর তাঁর খেলা তিন বিশ্বকাপে তিনিই ছিলেন পাকিস্তান দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী। বিশ্বকাপে ২১ ম্যাচে ৫৩.৮২ গড়ে তিনি করেন ৯১৫ রান। পাকিস্তানের হয়ে বিশ্বকাপে এর চেয়ে বেশী রান করেন জাভেদ মিয়াঁদাদ। যার জন্য মিয়াঁদাদকে খেলতে হয়েছে ৬ টি বিশ্বকাপ।
১৯৯৭ সালে তিনি ভারতের বিপক্ষে খেলেছিলেন ১৯৪ রানের ইনিংস। ২৩ বছর আগে ওয়ানডেতে ১৯৪ রানের ইনিংস খেলা মোটেও সহজ ছিল না। সাঈদ আনোয়ারের করা ১৯৪ রানের ইনিংসটি এক যুগেরও বেশী সময় ধরে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ছিলো। পরে ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের চার্লস কভেন্ট্রী বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৯৪ রানে অপরাজিত থেকে সেই রেকর্ডে ভাগ বসান। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে সাইদ আনোয়ার তাঁর টেস্টের সর্বোচ্চ ১৮৮ রান ও ওয়ানডের সর্বোচ্চ ১৯৪ রানের দুইটা ইনিংসই খেলেছিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইন্ডিয়ার বিপক্ষে। টেস্টে যেদিন ১৮৮ করেন সেদিন পুরো দল ৩১৬ রানে অলআউট হয়েছিলো আর পুরো ৯৯ ওভার ব্যাট করে তিনি ছিলেন ১৮৮ রানে অপরাজিত! ভাবতে পারেন?
ক্যারিয়ারের শুরুতে যাঁকে গ্রেট শচীনের সমমানের মনে করা হতো সেই সাঈদ আনোয়ার ওয়ানডেতে মাত্র শচীনের অর্ধেক ম্যাচ খেলে ৮৮২৪ রান করে ওয়ানডে থেকে অবসরে গিয়েছেন, এরচেয়ে আফসোসের আর কিছু নেই। অথচ, তাঁর সাথে যাকে সবচেয়ে বেশী তুলনা করা হতো সেই শচীন সাঈদ আনোয়ারের অবসরের পর থেকেই ছাড়িয়ে যেতে থাকেন সবাইকে, হয়ে যান সর্বকালের সেরা। আর সাঈদ আনোয়ার হয়ে থাকলেন, তাঁর সময়ের সেরা।
তবে পরিসংখ্যান যেমনই হোক, নিজের দিনে সাঈদ আনোয়ার যে বিশ্বসেরা বোলারদের যমদূত হয়ে উঠতেন সেটা ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যায়। হয়তো শচীনের মতো খুব বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি, আঠারো হাজার রান করতে পারেননি ওয়ানডেতে, হয়তো বিশ্বকাপটাও জিতেননি; কিন্তু সাঈদ আনোয়ার নব্বইয়ের দশকের ক্রিকেট পাগল পুরো একটা জেনারেশনের মন জিতেছিলেন যাদের চোখে তিনি শুধুমাত্র সেই সময়ই নয় বরং সর্বকালের সেরা। ❤️
© ইমরান নাজির