21/06/2021
এই প্রশ্ন এই গ্রুপে অনেকেরই।
ভাই ভুঁড়ি বেড়ে গেছে, কমাবো কেমনে?
তাদের জন্য এই পোষ্টটা লেখা।
প্রথমেই বলে রাখি, পেটের মেদ কমানো নিয়ে কিছু খুব বড় ধরণের কিছু ভুল ধারণা এখনো প্রচলিত আছে। সেই ধারণাগুলো দূর করার চেষ্টা করবো এই পোষ্টে।
অনেকেই আন্দাজ করে ফেলেছেন কোন কোন ভুল ধারণার কথা আমি বলছি।
কিন্তু যারা এখনো জানেন না তাদের জন্য বলছি।
ভুল ধারণা ০১ঃ
পেটের ব্যায়াম করলে মানে সিট আপ, ক্রাঞ্চিং, লেগ রেইস দিলে ভুঁড়ি কমে।
না না না।
এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
আবারও বলছি এসব ব্যায়াম করলে পেটের মাসেল শক্তিশালী হয়, কিন্তু ভুঁড়ি কমে না।
তা হলে যে পাশের বাসার আন্টির ছেলের ফুপাতো ভাই এব এক্সারসাইজ করে করে ভুঁড়ি কমিয়ে ফেলেছে?
সে কি করেছে আমি বলছি, তার আগে ২ নং ভুল ধারণাটা বলে নেই।
ভুল ধারণা ০২ঃ
চাইলে লোয়ার এব (তলপেট), চেস্ট, কোমড় কিংবা অন্য কোন যে কোন জায়গার ফ্যাট ব্যায়াম করে কমিয়ে ফেলা যায়।
আসলে তাও সম্ভব না।
কোন এক জায়গা থেকে ফ্যাট কখনোই আপনি কমাতে পারবেন না। কমাতে চাইলে পুরো শরীর থেকেই কমাতে হবে।
পুরো শরীরের ফ্যাট কমলেই পেট, কোমড়, চেস্ট কিংবা যে কোন জায়গার ফ্যাট কমবে।
ঘটনা হল, একেক মানুষের শারীরিক গঠন একেক রকম।
কারো পেট একটু বেশি মোটা, কারও কোমড় কারও বা চেস্টে ফ্যাট এমনিতেই একটু বেশি।
সেই মানুষটা যখন পুরো শরীর থেকে সামগ্রিকভাবে ফ্যাট কমায়, তার মোটা জায়গাও শুকিয়ে যায়।
দেখলে হঠাৎ মনে হবে সে বুঝি নির্দিষ্ট কোন অংশ থেকে ফ্যাট কমিয়েছে।
আসলে কিন্তু ব্যাপারটা তা না। যিনি কোমড় থেকে ফ্যাট কমিয়েছেন, অবশ্যই তিনি পেট থেকেও কমিয়েছেন।
যিনি চেস্ট ফ্যাট কমিয়েছেন অবশ্যই তিনি কোমড় আর পেট থেকেও কমিয়েছেন।
কিন্তু ওটা আমরা অতো খেয়াল করি না।
শরীরের যে অংশটা বেশি মোটা ছিল সেটাই কমে গেছে বলে চোখে পড়ে।
সুতরাং ভুঁড়ি কমাতে হলে সারা শরীর থেকেই ফ্যাট কমাতে হবে।
আবারও বলছি যেন মাথায় ঢুকে যায়,
শুধু ভুঁড়ি কমানোর জন্য আলাদা কিছু নেই, সারা শরীরের ফ্যাট কমলেই ভুঁড়ি কমবে।
ভুল ধারণা ০৩ঃ
শুধু ব্যায়াম করেই ভুঁড়ি কমানো যায়। আর কিছু লাগে না।
এটা অলমোস্ট অসম্ভব একটা ব্যাপার, ভুঁড়ি কমাতে হলে আগে ডায়েট, আগে খাওয়া-দাওয়া ঠিক করবেন, তারপর ব্যায়াম।
ডায়েট ঠিক না করলে যতই ব্যায়াম করেন না কেন আপনার বন্ধু ভুঁড়ি আপনাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না।
এই ভাবে চিন্তা করেন, আপনার আর আপনার বন্ধুকে ভালো লাগছে না, কিন্তু আপনার বন্ধু আপনাকে বড়ই ভালোবাসে। আপনার সাথেই সে থাকবে, খাবে। কিছুতেই আপনাকে ছেড়ে যাবে না।
যদি বন্ধুর খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন, তা হলেই শুধুমাত্র আপনাকে ছেড়ে যাবে।
বলাই বাহুল্য আপনার এই বন্ধু হল আপনার ভুঁড়ি। খাওয়া কমাতে পারলে সে যাবে, নয়তো যাবে না।
আর হ্যাঁ, ডায়েটের পাশাপাশি ব্যায়ামও করতে হবে।
সবই তো বুঝলাম ভাই, কিন্তু এতো কথা বললেন, আসল কথাই তো বললেন না। সেই সারা শরীর থেকে ফ্যাটই বা কমাবো কি করে??
আমি বেসিক ডায়েট নিয়ে একটা পোষ্ট লিখেছিলাম, সেখানে এ নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই আলচনার কিছু অংশ এখানে আবারো বলছি।
যারা ফ্যাট কমাতে চান তারা কম ক্যালরি খাবেন,আর বেশি ক্যালরি বার্ন (খরচ)করবেন,এটা হল সোজা কথা।
ক্যালরি জিনিসটা কি?
সোজাসাপ্টা ভাবে বললে আমরা যা খাবার খাই তাতে ক্যালরি থাকে, কোন খাবারে কম, কোন খাবারে বেশি।
আমি নিচে শুরুতে কিছু ডায়েট টিপস দিচ্ছি, যে গুলো মেনে চললে ভালো ফল পাবেন ইনশাআল্লাহ্ঃ
# ভাত, আলু, রুটি এসব যত পারেন কম খাবেন। এসবে ক্যালরি বেশি। অনেকে বলেন ভাত খাওয়া পুরোপুরি ছাড়তে হবে, সেটা করতে পারলে করেন, কিন্তু করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। তবে অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে।
# প্রোটিন বেশি খাবেন, দৈনিক ৬০ গ্রাম থেকে ৯০ গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার চেষ্টা করবেন। প্রোটিনে ক্যালরি তুলনামূলকভাবে কম।
(কোন খাবারে কতটুক প্রোটিন পোস্টের শেষে লিখে দিবো। নিজেরা হিসাব করে নিয়েন কতটুক কি কি খাবেন)
# চিনি জাতীয় খাবার একেবারে বন্ধ, কোক/স্প্রাইট/ফান্টা ভুলে যান। পুডিং, কেক, চকলেটকে টাটা।
# তেলে ভাজা খাবার যত পারেন কম খাবেন, চানাচুর, চিপ্স, পরোটা, চপ ভুলে যান। এই সব খুব বাজে তেলের জিনিস, শরীরের ১২টা বাজাবে। এই সব তেল আমাদের শরীর হজম করতে পারে না। ফ্যাট হিসেবে শরীরে জমা হবে, কিংবা আরো খারাপ শরীরের ভিতরে জমা হবে অরগ্যানের চারপাশে আর আপনার ধমনীতে, যার ফলে হার্ট এটাক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
(আমি কিন্তু শুধু সে সব তেলের কথা বলছি যে গুলো বেশি তাপে আমরা ভাজি, সব তেলের কথা বলছি না।)
# শাক সবজি বেশি খান, ভাত না খেয়ে বা কম খেয়ে থাকতে কষ্ট হলে শাক সবজি খেয়ে পেট ভরাবেন।
বিঃ দ্রঃ আমি কোন নির্দিষ্ট ডায়েট চার্ট দিলাম না। কোন বেলা কি খাবেন না খাবেন। সেটা এ ভাবে দেয়া সম্ভবও না। কেননা সেটা একেকজনে জন্য একেক রকম হবে। বয়স, উচ্চতা, কি এক্সারসাইজ করছেন আরো অনেক কিছুর উপর সেটা নির্ভর করে, চাইলেও দেয়া সম্ভব না। সুতরাং দয়া করে কেউ কমেন্টে ডায়েট চার্ট চাইবেন না। যা বলেছি তা যদি মেনে চলতে পারেন তা হলেই ভালো ফল পাবেন ইনশাআল্লাহ। আর যদি তার পরও মনে করেন যে আপনার ডায়েট চার্ট লাগবে, প্রোফেশনাল কারো হেল্প নিন। তিনি আপনার প্রয়োজনমতো আপনাকে বানিয়ে দিবে।
এই তো গেল ডায়েটের কথা, এবার আসি কি কি ব্যায়াম করবেন সেই কথায়।
আগেই বলেছি পেটের ব্যায়াম করে ভুঁড়ি কমাতে পারবেন না।
তাহলে কি করতে হবে? করতে হবে Cardio (Cardiovascular exercises).
এই এক্সারসাইজ কোনগুলি?
এগুলো হচ্ছে হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা এই সব। এই সব ব্যায়াম প্রচুর ক্যালরি বার্ন করে।
আপনি চাইলে বাইরে হাঁটতে পারেন কিংবা ট্রেডমিলে পারেন, চাইলে এমনি সাইকেল চালাতে পারেন কিংবা ষ্টেশনারী বাইক চালাতে পারেন।
যে কোন একটা বেছে নিন আর প্রতিদিন ৪০ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট সেটা করুন।
যদি ভাবেন যে প্রতিদিন পারবেন না, সপ্তাহে অন্তত ৪-৫ দিন করার চেষ্টা করুন।
নিচে ব্র্যাকেটের অংশটুকু সবার না পড়লেও চলবে, যারা অন্য এক্সারসাইজ সাজেস্ট করেন তাদের জন্য এই পার্ট টুকু ।
(অনেকে এইখানে আরো অনেক ব্যায়ামের কথা বলবে, দৌড়ানো, জাম্পিং জ্যাক, বারপি, কিন্তু সে গুলো সবার পক্ষে করা সম্ভব না।
আর এগুলো সব হাই ইম্প্যাক্ট এক্সারসাইজ। মানে এগুলো জয়েন্টের উপর বেশি স্ট্রেস দেয়। তাই আমি এই সব লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছি।
একই কারণে HIIT (High Intensity Interval Training) বাদ দিয়েছি। ও গুলো কাজ করে, কিন্তু একটু এক্সট্রা রিস্ক থেকেই যায়।
তা ছাড়া খেয়ায়াল করবেন বেশির ভাগ বডিবিল্ডারই LISS [Low Intensity Steady State] Cardio করেন। মানে হাঁটা কিংবা সাইক্লিং, কারণ it works and it works very well.)
যাই হোক যারা বাসায় করতে চান, বের হতে চান না তাদের জন্য খুব ভালো একটা অপশন হলো দড়িলাফ। দড়িলাফ ঠিকভাবে দিলে খুবই জয়েন্ট-ফ্রেন্ডলি একটা ব্যায়াম। কিন্তু দেয়ার আগে ইউটিউব থেকে দেখে নিয়েন কি ভাবে ঠিকভাবে দিতে হয়।
(বিঃ দ্রঃ যদি কোন এক্সারসাইজ না করে শুধু ডায়েট করেন, তবুও ওজন কমবে। কিন্তু আস্তে আস্তে আর অবশ্যই রেসাল্ট অতো ভালো পাবেন না)
এবার বলি পাশের বাসার আন্টির ছেলের ফুপাতো ভাই কি ভাবে আব মেরে মেরে পেট কমালো?
এর উত্তর হচ্ছে অনেক অনেক এব এক্সারসাইজ করলে কিছু ক্যালরি বার্ন হয়, আর আগেই বলেছি ক্যালরি বার্ন করলে ভুঁড়ি কমবে।
কিন্তু ক্যালরি বার্ন করার জন্য এব মারার চেয়ে Cardio অনেক ভালো কাজ করে।
তবে একটা এব এক্সারসাইজ করতে পারেন ভুঁড়ি কমাতে তা হল প্ল্যাংক। প্ল্যাংক দিলে আসলে,,,,, কমে না, কিন্তু পেট একটু টাইট হয়।
মানে পেটের ভিতরের মাসেল (Transverse abdominis) একটু টাইট করে পেট ভিতরের দিকে টেনে রাখে।
আরেকটা কাজ বাকি থাকে,তা হল প্রোটিনের হিসাবঃ
১ টা ডিম = ৬ গ্রাম
১ পিস মাছ/মুরগি = ৮ গ্রাম (এটা আমাদের দেশে সাধারণত যেই সাইজে খাওয়া হয় সেই সাইজ আন্দাজ করে বলছি।)
১ গ্লাস দুধ = ৮ গ্রাম (যারা ভুঁড়ি কমাতে চাচ্ছেন তাদের দুধটা বেশি না খাওয়াই ভালো।)
(গরূ,খাসি অনেক দামের ব্যাপার আর রেগুলার খাওয়া উচিতও নয়, তাই দিলাম না। ডালেও প্রোটিন থাকে, কিন্তু ওটা কমপ্লিট প্রোটিন না, আর কতটুক ঘন কিংবা পাতলা তার উপর অনেক কিছু ডিপেন্ড করে, তাই বলা যায় না। আর ডালে ক্যালরিও বেশ থাকে।)
আর সবাই চেষ্টা করবেন কুসুমসহ ডিম খেতে। তাতে ভালো ফ্যাট পাবেন। বাদামেও ভালো ফ্যাট আছে, কিন্তু তাতে অনেক ক্যালরি আর হিসাব করা একটু ঝামেলা।
সবশেষে একটা কথাই বাকি থাকে তা হল সাপ্লিমেন্টের। বেশির ভাগ ফ্যাটলস সাপ্লিমেন্ট আপনার শরীরের সর্বনাশ করবে, সুতরাং ঐসব থেকে দূরে থাকবেন। শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে নিজের ক্ষতি নিজে করবেন না।
তো এই ছিল ভুঁড়ি কমানোর যত কাহিনি। উপরে বলা গাইডলাইনগুলো ফলো করুন আর নিজের বন্ধু ভুঁড়িকে বলুন টা টা।
সকলের জন্য শুভকামনা রইলো।
Post written by,
Tehjib Rahman