02/10/2026
বহু শতাব্দী আগের কথা। ইথিওপিয়ার পাহাড়ি ঢালে ছাগল চরাচ্ছিল কালদি নামের এক তরুণ রাখাল।
হঠাৎ সে খেয়াল করল, তার ছাগলগুলো এক অদ্ভুত ধরনের লাল ফল খাওয়ার পর আনন্দে লাফালাফি করছে, তাদের ভেতর যেন অন্য রকম এক প্রাণশক্তি ভর করেছে!
কৌতূহলী কালদি নিজেও সেই ফল খেয়ে দেখল। নাহ, এটা তো কোনো সাধারণ ফল না! কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীরেও দেখা দিলো এক অদ্ভুত উদ্যম।
এভাবেই প্রকৃতিতে প্রথম কফি ফলের খোঁজ মেলে। কিন্তু এই বুনো ফলটি আজকের দিনের সুস্বাদু পানীয়তে রূপ নেওয়ার গল্পটা শুরু হয় লোহিত সাগর পেরিয়ে ইয়েমেনে।
পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইয়েমেনের সুফি সাধকরা এই ফলের বীজ নিয়ে এক যুগান্তকারী কাজ করে বসলেন। তারা এই বীজগুলোকে আগুনের তাপে ভাজলেন, তারপর গুঁড়ো করে গরম পানিতে জ্বাল দিলেন। তৈরি হলো গাঢ় রঙের সুবাসিত এক জাদুকরী পানীয়।
তারা এর নাম দিলেন ‘কাহওয়া’ (قهوة)। সুফি দরবেশরা সারা রাত জেগে জিকির ও গভীর রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে মনোনিবেশ করার জন্য ঘুম ও ক্লান্তি দূর করতে এই ‘কাহওয়া’ পান করতেন।
দেখতে দেখতে এই পানীয়ের সুবাস ইয়েমেন থেকে ছড়িয়ে পড়ল মক্কা, মদিনা ও কায়রো হয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে। ষোড়শ শতকে ইস্তাম্বুলেই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় প্রথম আনুষ্ঠানিক ‘কাহভে খানেস’, আমরা যাকে বলি ‘কফি হাউস’।
এই কফি হাউসগুলো দ্রুতই জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবী আর সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চা ও আড্ডার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সপ্তদশ শতকে অটোমানদের হাত ধরে এই পানীয় যখন ইউরোপে প্রবেশ করে, তখন সেখানকার অনেক খ্রিস্টান পাদ্রি একে "মুসলিমদের শয়তানি পানীয়" আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার জোর দাবি তোলেন।
কিন্তু এর দারুণ ঘ্রাণ ও স্বাদ উপেক্ষা করা ছিল অসম্ভব। পরবর্তীতে পোপ এই পানীয় চেখে দেখেন এবং মুগ্ধ হয়ে এর অনুমোদন দেন। ধীরে ধীরে এটি পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাসের সেই পাতা উল্টে আজ বর্তমান সময়ের দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে এখন কোটি কোটি কাপ কফি পান করা হয়। দিনের শুরু হোক কিংবা বন্ধুদের আড্ডা ও আলোচনা—কফি এখন আমাদের জীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্বে পানীয় হিসেবে এর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করেই আন্তর্জাতিক কফি সংস্থা (আইসিও) ২০১৪ সালে ১ অক্টোবরকে 'আন্তর্জাতিক কফি দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। আজ সেই পহেলা অক্টোবর। কিন্তু কফির এই ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি না।
মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কফি উৎপাদিত হয় ব্রাজিলে, অথচ কফি পানে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ফিনল্যান্ডের মানুষ!
তবে কফির এই জনপ্রিয়তা শুধু স্বাদ আর আড্ডার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, কফিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ আরও বেশ কিছু উপকারী উপাদান।
পরিমিত কফি পান অনেক রোগের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। এর বাইরেও কফি পানের রয়েছে আরও নানা শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা।
বর্তমানে এসপ্রেসো, ক্যাপুচিনো, লাতে ও মোকাসহ নানা ধরনের কফি মানুষ খাচ্ছে। আপনার পছন্দের কফি কোনটা?