16/12/2025
"ডাক্তার সাহেব হাতের পঁচা আঙুল ৩টা কাটবেন না,যদি দেশ স্বাধীন হয় তাইলে দেশের হইয়া ১বার ওপেনিং করমু"
------ক্রিকেটার শহীদ জুয়েল
আমরা অনেকেই জানি, মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে শহীদ জুয়েল ও শহীদ মুস্তাকের নামে দুটি গ্যালারি আছে। আসুন জানি কে ছিলেন শহীদ জুয়েল ও শহীদ মুশতাক ।
শহীদ জুয়েল ছিলেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ছোট বেলা থেকেই ছিলেন ক্রিকেটের প্রচন্ড ভক্ত। ছিলেন তৎকালীন পূর্ব বাংলার সেরা ওপেনার। খেলতেন সেই সময়ের বিখ্যাত ক্লাব আজাদ বয়েসের হয়ে।
আর সেই আজাদ বয়েজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জুয়েলের আরেক বন্ধু শহীদ মুশতাক। মুশতাক এত ভালো মানুষ ছিলো যে তার শত্রুরাও তাকে ভাল বাসতো। কথা বলার সময় হাসি লেগেই থাকতো তার মুখে। জুয়েল ছাড়াও অনেক ক্রিকেটার তৈরির কারখানা ছিলো মুশতাকের আজাদ বয়েস।
সেই আজাদ বয়েসের হয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন জুয়েল। জুয়েল ব্যাট হাতে ক্রিজে নামলে বোলারদের মুখের উপর পড়ত কালো ছায়া। পড়বেই বা না কেন? জুয়েল ব্যাট হাতে এমন নির্দয়ভাবে বোলারদের বল মাঠের বাইরে আচড়ে ফেলতেন তা দেখে অনেকের মায়া লাগত। কে জানে সেই সময় যদি টি২০ ক্রিকেট চালু থাকতো জুয়েলই হতে পারতো সেরা ব্যাটসম্যান।
একদিন ঘরোয়া একটি টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিল জুয়েল। তার ব্যাটিং দেখে, তার বিখ্যাত সেই স্লগ সুইপগুলো দেখে পাকিস্তানের বিখ্যাত এক ক্রিকেটার বলেই ফেলেছিলেন-
"এই ছেলে এখানে কেন, এর তো পাকিস্তানের হয়ে ওপেনিং করার কথা"।
হ্যা, জুয়েলই ছিলো সেই সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান। তারপরও তাকে জাতীয় দলে নেয়া হয়নি, দেওয়া হয়নি প্রাপ্ত মর্যাদা। জুয়েল মনে মনে স্বপ্ন দেখত, একদিন দেশ স্বাধীন হবে, আর বাংলাদেশের হয়ে ওপেনিং করবে জুয়েল।
১৯৬৯ সাল। দেশজুড়ে চলছে আইয়ুব বিরোধী তীব্র আন্দোলন। আর সেই সময়েই পাকিস্তান দলের ওপেনিং ব্যাটসম্যানদের ছিলো চরম ফর্মহীনতা। বাধ্য হয়েই প্রাথমিক দলে রাখা হলো বাঙ্গালি জুয়েলকে। কিন্তু জুয়েল ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন পাকিদের সেই ডাক। যোগ দিলেন বাঙ্গালীর গনঅভ্যুত্থানে।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ। আজাদ বয়েসের প্রতিষ্ঠাতা, প্রাণ প্রিয় বন্ধু মুশতাকের নিথর দেহ গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। আর পাশে বসে আছেন, জুয়েলের আরেক বন্ধু সৈয়দ আশরাফুল হক
প্রিয়বন্ধু মুশতাককে ছুয়ে জুয়েল শপথ করলেন জীবন দিয়ে হলেও দেশ স্বাধীন করবেন। বন্ধুর রক্তকে বৃথা যেতে দিবেন না।
প্রতিশোধস্পৃহা পেয়ে বসে তাঁকে। স্বামীহারা মায়ের কোনো নিষেধই তিনি মানেননি। মাতৃভূমিকে হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচাতে চলে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেলাঘরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে হয়ে ওঠেন দুর্ধর্ষ এক গেরিলা।
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়েছিল ক্র্যাকপ্লাটুন। সে অপারেশনে জুয়েল রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। উড়ে গিয়েছিল তাঁর হাতের আঙুল। রক্তাক্ত, আহত জুয়েল ব্যথায় কুঁকড়ে প্রথম যে কথাটা বলেছিলেন, সেটি ক্রিকেট নিয়ে
—‘ভাই রে, আঙুল না থাকলে বাংলাদেশের হয়ে খেলব কী করে? কীভাবে ব্যাট ধরব?’
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ক্র্যাকপ্লাটুনের অনেক সদস্যকে। এ দলে অনেকেই ছিলেন, ছিলেন রুমী, জুয়েল। এই অপারেশনেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সুরকার আলতাফ মাহমুদকে। নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরিতে রেখে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়েছিল সবার ওপর। জুয়েলের হাতের বাকি আঙুলও কেটে ফেলা হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করেছিল ।
এ দেশের জার্সিতে কখনো খেলেননি। কিন্তু তাতে কী হয়েছে। তাঁর আত্মত্যাগই পথ করে দিয়েছে খেলাধুলায় এ দেশের সকল অর্জনের। তাঁর গ্রেনেড–বিস্ফোরিত রক্তাক্ত হাত কিংবা হায়েনাদের কেটে ফেলা আঙুলের বিনিময়েই যে লাল-সবুজ জার্সি।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের লোগোয় যে বাঘের মুখটা আঁকা, সেটিই যে আমাদের "আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল।