07/11/2018
কর্নেল জামিল আহমেদ যেভাবে নিহত হন
গণভবনের মধ্যেই একটি বাড়ি। সেই বাড়িতে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে থাকতেন কর্নেল জামিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাত তিনটা কিংবা সাড়ে তিনটার দিকে বেজে উঠে লাল ফোন। লাল ফোন মানে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলা যায় যে ফোনের মাধ্যমে। ফোন ধরলেন কর্নেল জামিলের স্ত্রী আনজুমান আরা।
‘হ্যালো!’
‘তুই জামিলকে দে।’ বঙ্গবন্ধুর গম্ভীর কণ্ঠ।
আনজুমান আরা একটু ভয় পান। কর্নেল জামিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন, আনজুমান আরা টেলিফোনের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকেন। জামিল বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘স্যার, আপনি ভয় পাবেন না। আমি এখনই আসছি। ঘর বন্ধ রাখুন। কেউ খুলতে বললেও খুলবেন না।’
কর্নেল জামিল এরপর ফোন করলেন সেনাবাহিনীর প্রধান সফিউল্লাহকে। ইংরেজিতে কথা হলো। কথার সারসংক্ষেপ হলো, বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ফেলেছে মিসক্রিয়েন্টরা। ফোর্স পাঠান। সফিউল্লাহ ফোর্স পাঠাবেন বলে জানালেন। এরপর জামিল ফোন করলেন পুলিশ সুপার ও রক্ষীবাহিনীর প্রধানকে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর শার্ট-প্যান্ট পরে নিলেন।
গণভবনে ছিল ৩০০ গার্ড রেজিমেন্ট। জামিল তাদের বললেন, ‘প্রস্তুত হও। যেতে হবে।’
তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ির দিকে। জামিলের হাত টেনে ধরলেন আনজুমান আরা বললেন, ‘কোথায় যাও?’
জামিল বললেন, ‘ভয় পেয়ো না। বঙ্গবন্ধু বিপদে।’ হাতের তাবিজ দেখিয়ে বললেন, ‘বিপদ হবে না।’ দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন কর্নেল জামিল। বাড়িতে অরক্ষিত স্ত্রী ও তিন কন্যাকে রেখে। জামিল ওঁর ছোট্ট লাল রঙের প্রাইভেট কারে উঠে বসলেন। সঙ্গে ড্রাইভার।
২.
কর্নেল জামিলের গাড়িচালক আইনউদ্দিন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ২০ নম্বর সাক্ষী। তাঁর চোখের সামনেই নিহত হন কর্নেল জামিল। আইনউদ্দিনের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ভোর ৫টার দিকে তাঁর রুমের কলিং বেল বেজে ওঠে। তখন তিনি অজু করছিলেন। তাড়াতাড়ি বাসার সামনে গেলে কর্নেল জামিল ওপর থেকে দ্রুত গাড়ি তৈরি করতে এবং গণভবনে গিয়ে সব ফোর্সকে হাতিয়ার-গুলিসহ পাঁচ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার নির্দেশ জানাতে বলেন।
গণভবনে সৈনিকদের নির্দেশ জানিয়ে তিনি ফিরে এলে কর্নেল জামিল তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িতে রওনা হন। ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর রোডের মাথায় তাঁরা গণভবন থেকে আসা ফোর্সদের দেখেন। সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌঁছলে দক্ষিণ দিক থেকে শোঁ শোঁ করে গুলি আসতে থাকে।
তখন ফোর্স অ্যাটাক করানোর কথা বললে কর্নেল জামিল বলেন, এটা ওয়ার-ফিল্ড নয়, ফোর্স অ্যাটাক করালে সিভিলিয়ানদের ক্ষতি হতে পারে। তখন আইনউদ্দিনকে প্রতিপক্ষের অবস্থান জেনে আসতে নির্দেশ দিয়ে কর্নেল জামিল গাড়িতেই বসে থাকেন। আইনউদ্দিন যখন দেয়াল ঘেঁষে ৩২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পাঁচ-ছয়জন সেনা সদস্য দৌড়ে জামিলের গাড়ির দিকে যায়। তিনি (আইনউদ্দিন) হাতে ইশারা করে কর্নেল জামিলকে সরে যেতে বলেন। স্যার, স্যার বলে আওয়াজও করেন কয়েকবার। কিন্তু কর্নেল জামিল তাঁর দিকে তাকাননি। কর্নেল জামিলকে হত্যার মুহূর্তের কথা জানিয়ে আইনউদ্দিন বলেন, ‘ওই সময় আর্মির অস্ত্রধারী লোকগুলো গাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। কর্নেল জামিল দুই হাত উঠিয়ে তাদের কিছু বলার বা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা দুই-তিনটি গুলি করলে কর্নেল জামিল মাটিতে পড়ে যান।’
৩.
১৯৭১ সালে পাকিস্তানে আটকা পড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও বঙ্গবন্ধুর প্রিয়পাত্র ছিলেন কর্নেল জামিল। তিনি‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময়ে আইএসআইয়ে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার সুযোগ পান। দেশে আসার পর বঙ্গবন্ধুর সিকিউরিটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব ছিলেন ।
[ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ (কর্ণেল জামিল নামেই পরিচিত) তিনি ১৯৩৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালিন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের দেহরক্ষী হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন। জামিলের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০০৯ সালে তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। সেনাবাহিনীও তাদের এই বীর সেনাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছে।]
সূত্র : প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ ডেইলি স্টার/ গ্রন্থনা : স্বপ্ন ‘৭১ August 14th, 2016