18/08/2019
ওর ঈগলের ঠোঁটের মতো বাঁকানো বড়বড় নখ আঁচড়ে দিচ্ছে স্নিগ্ধার অর্ধনগ্ন শরীর। বারবার চিৎকার করছে স্নিগ্ধা। "ভাইয়া, বাঁচাও আমাকে। আমাকে বাঁচাও।"
কিন্তু আমি কিছু করতে পারছি না। চোখের সামনে একমাত্র আদরের বোনকে এভাবে কষ্ট পেতে মরে যেতে দেখেও আমি কিছু করতে পারছি না। কিছু করার শক্তি নেই আমার শরীরে। হাত পা নড়াতে পারছি না আমি। অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন আমার হাত পা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে।
এদিকে মরণ চিৎকার করেই যাচ্ছে স্নিগ্ধা। সেটা দেখে যেন এক পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে লামিয়া। হাসছে সে। পৈশাচিক হাসি। বারবার আঁচড়ে দিচ্ছে স্নিগ্ধার কোমল শরীর। ওর তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। মাঝেমাঝেই ওর ক্ষত থেকে কুকুরের মতো জিহ্বা বের করে চেটে চেটে রক্ত খাচ্ছে লামিয়া। এ এক নারকীয় দৃশ্য। দেখতে ইচ্ছে করছে না আমার। কিন্তু দেখতে যে হবে আমাকে। কারণ চোখের পাতা বন্ধ করার ক্ষমতাও যে নেই আমার। কানে বাজছে স্নিগ্ধার মরণ চিৎকার আর লামিয়ার পৈশাচিক হাসি। চোখের সামনে ভেসে আসছে একমাস আগের এক বৃষ্টিস্নাত রাত। আজকে রাতের এই নারকীয় বীজ লুকিয়ে ছিলো সেখানে। আমি বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারেনি আমার মা কিংবা পনেরো বছর বয়েসী বোন স্নিগ্ধা। তার খেসারত দিতে হচ্ছে আজ। সবকিছু প্রথম থেকে ভেসে উঠলো আমার চোখের সামনে।
পেশায় আমি একজন ডাক্তার। চাকরিসূত্রে ঢাকার বাইরে থাকতে হয় আমাকে। বাবা নেই। মরেছে বেশ কয়েকবছর আগে। মা আর ছোটবোন ঢাকাতেই থাকে। ছুটি পেলেই চলে যাই ঢাকাতে। কিন্তু সেই ছুটিটা সহজে মেলে না। যখন মেলে তখন সেটার সদ্ব্যবহার করতে ভুল করি না। তেমনি সেদিন কাজ শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমি চাইলেই সকালে রওয়ানা দিতে পারতাম। কিন্তু ছুটি মাত্র তিন দিনের। সকালে রওয়ানা দিলে ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে দিনের অর্ধেকটাই শেষ হয়ে যাবে। তারউপর যদি জ্যামে পড়ি, তাহলে তো কথাই নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম রাতেই রওয়ানা দিব। কিন্তু বাধ সাধলো বৃষ্টি। সন্ধ্যা থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তোয়াক্কা করলাম না। নিজের গাড়ি আছে। তাছাড়া এমন আবহাওয়ায় রাতের দিকে রাস্তা ফাঁকাই থাকবে। সেক্ষেত্রে আমার আরও সুবিধেই হবে। যেই ভাবে সেই কাজ। সন্ধ্যা সাতটার দিকেই মার্সিডিজটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। খুলনা-ঢাকা হাইওয়ে ধরে ছুটতে লাগলাম।
যা ভেবেছিলাম। হাইওয়েটা বলতে গেলে একেবারেই ফাঁকা। মাঝেমাঝে দুয়েকটা দূরপাল্লার বাস আর ট্রাক তীব্র গতিতে চলে যাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে আমিও গাড়ির গতি বাড়ালাম। মাঝেমধ্যে তো স্পিড একশো ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে এই নির্জন রাস্তার পাশে হেডলাইটের আলোয় কিছু একটা দেখতে পেলাম। গাড়ির গতি কমিয়ে দিলাম। উইন্ডস্ক্রীনের মধ্যে দিয়ে ভালো করে সেদিকে তাকালাম। একটা মেয়ে। একা দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাডিশনাল ভূতের গল্পের মতো মেয়েটার পরনে সাদা ধবধবে কিংবা লাল টুকটুকে বিয়ের শাড়ি নেই। তার বদলে রয়েছে কটকটে হলুদ রঙের একটা কামিজ। ওড়না আর স্যালোয়ারের রঙ সাদাটে। ভিজে গেছে সেগুলো। হেডলাইটের লালছে আলোয় কামিজটাজে কমলা দেখাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, মেয়েটা কারোর জন্য যেন অপেক্ষা করছে।
মেয়েটা ভূত হোক আর যাই হোক তাকে ঘাটানোর ইচ্ছে আমার হলো না। গাড়ির গতি কিছুটা বাড়িয়ে মেয়েটাকে পাশ কাটাতে গিয়ে মনের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠলো। মনে হলো, এরকম পরিস্থিতিতে মেয়েটাকে ফেলে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। মেয়েটা নিশ্চয়ই বিপদে পড়েছে। তাছাড়া আমি তো ডাক্তার। আর ডাক্তারের কাজই হলো মানুষের সেবা করা। সুতরাং মেয়েটাকে এভাবে এখানে ফেলে রাখা যাবে না। তার কি হয়েছে সেটা দেখতে হবে।
হঠাৎ ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দিলাম। ততক্ষণে মেয়েটাকে ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে চলে গিয়েছিলাম। ব্যাক গিয়ারে দিয়ে আবার মেয়েটার কাছে ফিরে এলাম। মেয়েটা তখনও ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। পাশের জানালার কাচ নামিয়ে আমি তার দিকে তাকালাম। হেডলাইটের কিছুটা আলো তার মুখের উপর গিয়ে পড়েছে। তাতেই দেখতে পেলাম মেয়েটার মুখ। সুন্দরীই বলা চলে। বয়স আন্দাজ করতে পারলাম না। তবে বাইশের বেশি না। আবার আঠারোর কমও না। বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডাতে হালকা কাপছে। আমি মুখ বের করে দিয়ে বললাম, "কি ব্যাপার? এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে ভিজছেন কেন? বাড়িতে থেকেও তো ভিজতে পারতেন।"
মেয়েটা কোনো জবাব দিলো না।
আমি আবার বললাম, "কথা বলছেন না কেন? বোবা নাকি?"
আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা হঠাৎ বলে উঠলো, "আমাকে সাহায্য করুন প্লিজ। ওরা আমাকে বেঁচে দিবে।"
ভ্রু কুঁচকে গেল আমার। কি বলে মেয়েটা? কে ওকে বেঁচে দিবে? প্রশ্নটা করলাম তাকে, "কে আপনাকে বেঁচে দিবে?"
মেয়েটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, "আ-আমার মামি।"
আমি আর কিছু বললাম না। এক মুহুর্ত চুপ করে থেকে বললাম, "গাড়িতে উঠুন।"
মেয়েটা কিন্তু উঠলো না। আগের মতই ঠাই দাঁড়িয়ে থাকলো।
মেয়েটা উঠছেনা দেখে আমি বললাম, "আরে কি আশ্চর্য! এইমাত্র না আপনাকে সাহায্য করতে বললেন, কিন্তু এখন গাড়িতে উঠছেন না কেন? না মানে...গাড়িতে না উঠিয়ে তো আপনাকে আমি কোন প্রকার সাহায্য করতে পারবো না।"
মেয়েটা একমুহূর্ত চুপ থেকে আমার পাশে উঠে বসলো। আমি ডানপাশ থেকে তোয়ালেটা দিয়ে বললাম, "নিন, মুছে ফেলুন। নাহলে জ্বর হবে।"
কোনো কথা না বলে মেয়েটা আমার হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে হাত মুখ মুছতে লাগল। এদিকে আমি গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিলাম। আবার ছুটতে শুরু করল গাড়ি৷ প্রায় মিনিট দশেক পরে আমি বললাম, "ঠিক কী হয়েছে....খুলে বলুন তো সব। একেবারে গোড়া থেকে বলবেন।"
একমুহূর্ত চুপ করে থেকে হালকা গলা খাকারি দিয়ে মেয়েটা বলতে শুরু করল, "দশ বছর বয়সে আমার বাবা মারা যায়। আমার মা আমাকে নিয়ে মামার বাড়িতে চলে আসে। তার কয়েক বছর পর মা'ও মারা যায়৷ আমি মামার বাড়িতেই মানুষ হতে থাকি। মামার সংসারেই। আমার মামার অবস্থাও ভালো না। পান্তা আনতে লবণ ফুরোই অবস্থা৷ তবে মামা আমাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু মামিটা কেমন যেন করতো। কিন্তু সেই মামাটাও এই ছয়মাস আগে বিছানায় পড়েছে। এদিকে আমার কপালে নেমে এসেছে সীমাহীন কষ্ট। মামির হাজারো অত্যাচার সহ্য করে এতদিন সেখানেই ছিলাম। কিন্তু আমার মামি আমাকে বেঁচে দেওয়া ষড়যন্ত্র করে। কোনো ভাবে মামা সেটা জেনে ফেলে। আজ রাতেই মামা আমাকে বলে সেটা। রাতেই আমাকে পালাতে বলে। তাই এই রাতেই আমি....."
মেয়েটা আর কিছু বলল না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে আমি বললাম, "তা কোথায় যাবেন? কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে?"
"নাহ।"
"তাহলে?"
"ঢাকা।"
"ঢাকায়? ওখানে কেউ আছে নাকি?"
"নাহ।"
"তাহলে ঢাকায় কার কাছে যাবেন?"
"কারোর কাছে না।"
আমি আর কিছু বললাম না। বুঝলাম মেয়েটা ভালোই বিপদে পড়েছে। তবে মেয়েটাকে নিয়ে আমিও বেশ ভালো বিপদেই জড়ালাম। একে বাড়িতে নিয়ে গেলে মা নিশ্চয় আমার দিকে অন্য চোখে তাকাবে। তাছাড়া এরকম একটা যুবতী মেয়েকে ঢাকার শহরে ছেড়ে দিতেও মন সাই দিবে না। পরের কথা পরে হবে ভেবে এখনকার কথাই নজর দিলাম। প্রসঙ্গ পালটে আমি বললাম, "আমিও ঢাকায় যাচ্ছি। ও হ্যাঁ, আমার নাম আফিফ। ছোটখাটো ডাক্তার। খুলনাতেই থাকি। ঢাকায় মা আর ছোট একটা বোন আছে। ওরা ঢাকাতেই থাকে। বাবা নেই। মরেছে বেশ কয়েক বছর আগে। যাহোক, আপনার নামটা তো জানা হলো না।"
"লামিয়া।"
"বাহ, বেশ ভালো নাম।"
মেয়েটা কিছু বলল না। আমিও আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। চুপ করে গেলাম। ভোররাতের দিকে ঢাকায় পৌঁছালাম। পরে একটা ব্যবস্থা করা যাবে ভেবে মেয়েটাকে সঙ্গেই রাখলাম। যদিও বেশ অপ্রস্তুতই ছিলাম।
আমার সঙ্গে একটা মেয়েকে দেখে মা'র চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আমি তোতলাতে তোতলাতে বলতে গেলাম, "ইয়ে..না..মানে...মা.."
"তুই চুপ থাক।" মা আমাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। "কি আর বলবি। বলবি যে, একটা পরিস্থিতিতে পড়ে তোমাদের জানাতে পারিনি৷" রাগী কন্ঠে কথাগুলো বলল মা। আমি তাকে আসল ব্যাপারটা বুঝাতে গেলাম কিন্তু সে আমার কোন কথাই শুনলো না। হেসে বলল, "সে যাইহোক, তুই কিন্তু একটা মায়াবতীকে এনেছিস। তা তোমার নাম কী মা?"
"লামিয়া।" মাথা নিচু করে বলল লামিয়া। যেন নতুন বউ। "সে-ও কোনো প্রতিবাদ করছে না দেখে আমি বেশ অবাক হলাম।
এর মাঝে এসে উপস্থিত হলো স্নিগ্ধা। লামিয়াকে দেখে চমকে গেল। সামলে নিয়ে বলল, " ভাইয়া, ওটা কে রে? ভাবী নিশ্চয়? কবে বিয়ে করলি? আমাকেও জানালি না?" কথাগুলো বলেই সে লামিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। লামিয়া কিছু বলছে না দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। এদিকে আমি সুযোগ পেয়ে বলতে শুরু করলাম, "তোমরা যা ভাবছো আসলে তা না। আমি ওকে বিয়ে করা তো দূরের কথা, চিনিই না পর্যন্ত।" তারপর পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম। সব শুনে আমার কোমলমতি মায়ের চোখে পানি চলে এলো। মা জানালো, আজ থেকে লামিয়া এখানেই থাকবে। স্নিগ্ধাও বলল সে-কথা। লামিয়াও অমত করল না। বরঞ্চ বেশ খুশিই হলো। আমিও আর কিছু বললাম না।
মাত্র দু'দিনেই পরিবারের সবার সাথে মিশে গেল লামিয়া। মেয়েটা যেমন রূপবতী তেমনি গুণবতী। মা আর স্নিগ্ধা তো ওর রান্নার ভক্ত হয়ে গেল। এমনকি আমিও। তবে লামিয়া সবাইকে মানাতে পারলেও টমিকে কিছুতেই মানাতে পারলো না। লামিয়াকে দেখলেই টমি পাগল হয়ে যায়। ঘাউ ঘাউ করে ছুটে যায় লামিয়াকে কামড়াতে। টমির এমন আচরণে আমি বেশ অবাকই হলাম। টমি সাধারণত কারোর সঙ্গেই এমনটা করে না। সে যতই অপরিচিত হোক। তাহলে লামিয়ার সঙ্গে এমনটা করছে কেন?
ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবলাম না। দেখতে দেখতেই আমার ছুটি শেষ হয়ে গেল। সবাইকে বিদায় দিয়ে খুলনার পথে রওয়ানা দিলাম। আশার সময় এবারও মা'র চোখে পানি দেখলাম। লামিয়াকে দেখে মনে হলো সে-ও কাঁদছে।
এক সপ্তাহ পর অযাচিত ভাবে একটা সুখবর পেয়ে গেলাম। আমার ঢাকাতে পোস্টিং হয়েছে। এবং আমার ফ্লাটের পাশের হাসপাতালে। চলে এলাম বাড়িতে। আমাকে পেয়ে তো ওরা বেশ খুশি। তবে লামিয়াকে একটু বেশিই খুশি মনে হলো।
বাড়িতে ফিরেই দেখলাম কাজের মেয়ে মর্জিনার বদলে অন্য একজনকে রাখা হয়েছে। মাকে জিজ্ঞেস করাতে বলল, মর্জিনা নাকি চুরি করা শুরু করেছিলো। তাই তাকে ভাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আমি বুঝলাম না মর্জিনা হঠাৎ করেই চুরি করা শুরু করল কেন। সে আমাদের বাড়িতে আছে প্রায় তিনবছর হলো। পরিবারের সদস্যই হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু হঠাৎ কি এমন হলো যে তাকে চুরি করতে হবে? আমি কৌতুহল বশত মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "কী চুরি করেছিলো?"
মা যেটা বলল সেটা শুনে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। মর্জিনা নাকি ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাছ মাংস চুরি করতো।
"আর তাতেই তুমি ওকে ভাগিয়ে দিলে?" আমি অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম।
"চুরি করেছে বলে ভাগাই নি। ভাগিয়েছি মিথ্যে বলেছে বলে। চুরি করে আবার মিথ্যে বলে।"
বুঝলাম চুরি করা বড় ব্যাপার না। আসল ব্যাপার হলো মিথ্যে বলা। আমার মা এই মিথ্যে বলা একদম সহ্য করতে পারে না। এইজন্যই ভাগিয়েছে মর্জিনাকে। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমার খটকা লাগল। টাকা পয়সা কিচ্ছু না, হঠাৎ মাছ মাংস চুরি করতে যাবে কেন?
চুরি হওয়া কিন্তু বন্ধ হলো না। প্রায় প্রতিদিনই ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাছ মাংস চুরি যেতে লাগল। স্বভাবতই সন্দেহ গিয়ে পড়ল নতুন কাজের মেয়ে রমিজার উপর। কিন্তু তাকে ধরতেই সে অস্বীকার করল। কান্নাকাটি করে এমনভাবে বলল, শুনে তার কথা অবিশ্বাস করতে মন চাইলো না। কিন্তু এসব মেয়েরা বেশ ধড়িবাজ হয়৷ এরকম কান্নার অভিনয় বেশ ভালোই পারে এরা। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার হলো, রমিজাকে চোর বলাতে সে খেপে গিয়ে কাজে আসাই বন্ধ করে দিলো। বুঝলাম মেয়েটা চুরি করেনি। আর চুরি করলেও কাঁচা মাছ মাংস কেন চুরি করবে? তাছাড়া চুরি করে করবেই বা কী? রমিজা তো আমাদের বাড়িতেই থাকে।
তাহলে কে করছে কাজটা?
২.
কে করছে এই কাজ?
উত্তর নেই।
তারপর হঠাৎ চুরি হওয়া বন্ধ হলো। বুঝলাম রমিজা'ই চুরি করতো। তাই যদি না হবে তাহলে সে চলে যাওয়া মাত্র চুরি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল কেন? ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবলাম না।
কেটে গেল আরও কয়েকদিন।
সেদিন সকালে একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো স্নিগ্ধার। নিচে যেতেই দেখলাম টমি পড়ে আছে। বিভৎস অবস্থায়। দেখে মনে হচ্ছে কিছুতে যেন ছিড়ে খেয়েছে তাকে। তার সাদা লোমগুলো এখন আর সাদা নেই। তাজা রক্তে খয়েরী হয়ে গেছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে চেনার উপায় নেই। শুধুমাত্র গলার কলারটা দেখেই চিনতে পারলাম। বুঝলাম না এমনটা কিসে করল। আশেপাশে তো এমন কোনো জানোয়ার নেই যে সে এমনটা করবে। কিছুই মাথাই ঢুকলো না। আরেকটু খুটিয়ে দেখলে হয়তো ওর হৃৎপিণ্ডটাকে দেখতে পেতাম না।
এর দু'দিন পর গ্রাম থেকে আমার এক কাজিন আরিফা এল। সঙ্গে তার দু'বছরের ছোট একটা মেয়ে। এর মধ্যে আবার নতুন কাজের মেয়ে রাখা হয়েছে। আর সেদিন রাতেই আবার ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাছ মাংস চুরি গেল। আমার মনের ভেতরে থাকা সন্দেহটা দানা বাধতে শুরু করল। বুঝলাম কেউ একজন কাজটা করছে। কাজের মেয়ে নয় সে। আমাদের ভেতরেই কেউ একজন।
প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে গেল এক ভয়ংকর ঘটনা।
সেদিন মাঝরাতে ছোট বাচ্চার কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। পাত্তা দিলাম না। ভাবলাম আরিফার মেয়েটাই হয়তো কাঁদছে। সঙ্গে ওর মা আছে। সমস্যা হবে না। কিন্তু কান্নাটা বেশ খানিকক্ষণ চলতে থাকলো। বেশ বিরক্ত হলাম। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম দেখতে যাব কি হয়েছে। বাইরে বেরোতেই হঠাৎ একটা আর্তচিৎকার দিয়ে থেমে গেল কান্না। সব চুপচাপ। কান্নার আওয়াজ শুনে মা আর স্নিগ্ধা উঠে এসেছিলো। তাদের রুমে পাঠিয়ে দিয়ে আমিও রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন ছিলো ছুটির দিন। আমি বাড়িতেই ছিলাম।
সকাল এগারোটার পরেও যখন আরিফা ঘর থেকে বেরোলো না তখন মনের ভেতরে একটা ক্ষীণ সন্দেহ দেখা দিলো। গিয়ে দেখলাম দরজা খোলা। ভেজানো ছিলো। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই হতভম্ব হয়ে গেলাম।
যদিও আমি ডাক্তার। রক্তারক্তি দেখার অভ্যাস আমার আছে। তবুও সামনে থাকা দৃশ্যটা দেখে নিজেকে সামলাতে পারলাম না। নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল। আমার চিৎকার শুনে ওরা সবাই দৌড়ে এল। এমনকি লামিয়াও। মা আর স্নিগ্ধা তো অজ্ঞান হয়ে গেল। কিন্তু লামিয়ার কোনো ভাবান্তর হলো না। এদিকে আমার অবস্থাও খারাপ।
খাটের উপরে পড়ে আছে একটা আধখাওয়া দেহ আর একটা ছিন্নমস্তক। রক্তে ভেসে গেছে পুরো মেঝে। দেখে মনে হচ্ছে ভয়ানক কোনো হিংস্র জানোয়ার খুবলে খেয়েছে দু'টো মানুষকে।
পুলিশকে খবর দেওয়া হলো। তারা এসে কিছুই বুঝতে পারলো না। সন্দেহ করতে পারলো না কাউকে। কাকেই বা করবে? ওটা তো কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব না। লাশ নিয়ে চলে গেল তারা।
এর পরেরদিন কাউকে না জানিয়ে রান্নাঘরে ক্যামেরা লাগিয়ে দিলাম। যে-ই ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাছ মাংস চুরি করুক ধরা সে পড়বেই। অবশ্য আমি জানতাম কাজটা কে করছে। তারপরেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য এটা করা।
ক্যামেরা লাগিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুম দিলাম। সকালে উঠেই চোরকে ধরব। হ্যাঁ, বাইরে থেকে যে চোর আসেনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। বাইরে থেকে নিশ্চয় কোনো চোর কাঁচা মাছ মাংস চুরি করতে আসবে না।
পরদিন সকালে কাউকে না জানিয়ে ক্যামেরায় তোলা ভিডিওটা দেখলাম। দেখে আমি অবাক হলাম না। জানতাম এমনটাই হবে। তবে ভয় পেলাম। একটা মানুষ এমন করে কাঁচা মাছ মাংস খেতে পারে? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। তবে করতে হবে। আমার চোখ খারাপ হলেও ক্যামেরার চোখ নিশ্চয়ই খারাপ না।
হ্যাঁ, লামিয়া'ই করেছে কাজটা। আমি ওকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি।
যা বুঝার বুঝে ফেললাম। এটাও বুঝলাম আমরা এখন একটা ভয়ংকর পিশাচের সঙ্গে আছি। যে মারাত্মক বিপদজনক। টমিকে সে-ই খেয়েছে। আরিফা আর তার মেয়েকেও সে খেয়েছে। সুযোগ পেলে আমাদেরও খেয়ে ফেলবে।
ব্যাপারটা আমি চেপে গেলাম। কাউকে কিচ্ছু জানালাম না। কায়দা করে মাকে খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। এদিকে কাজের মেয়েটাও চলে গেছে। বাড়িতে এখন আমরা দুই ভাইবোন। স্নিগ্ধা আর আমি। আর আমাদের সঙ্গে রয়েছে ভয়ংকর এক পিশাচ।
আমি সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। কোনোপ্রকার ঝুঁকি নেওয়া চলবে না। আজ সন্ধ্যায় বাইরে গিয়েছিলো লামিয়া। আমি সেই সুযোগে স্নিগ্ধাকে সব খুলে বলি।
এখন বুঝছি, তখন লামিয়া বাইরে যায় নি। বাড়িতেই ছিলো। আর আমাদের সব কথা শুনে ফেলেছিলো। এমনকি আমাদের পরিকল্পনার কথাও৷ মোটেও ঝুঁকি নেয় নি সে। রাতেই কব্জা করে আমাদের। অদৃশ্য কোনো শক্তিতে আমাকে প্যারালাইজড করে রেখে স্নিগ্ধাকে......
আর ভাবতে চাইলাম না আমি। আমার চোখের সামনেই ঘটছে সবকিছু। আমাকে দেখানোর জন্যই এরকমকটা করছে লামিয়া।
হঠাৎ একটা শব্দ হলো। অদ্ভুত একটা শব্দ। শব্দটা ঘরের বাইরে থেকেই এসেছে। সেই সঙ্গে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। হাত পা নড়াতে পারছি আমি। আর কিছু ভাবলাম না। ঝাপিয়ে পড়লাম লামিয়ার উপরে। ওকে নিয়ে গড়িয়ে পড়লাম একপাশে। এদিকে দরজার ওপাশ থেকে একটা পরিচিত কন্ঠ ভেসে আসছে। মর্জিনা। বলছে, "দরজা খোলো। দরজা খোলো দ্রুত।" সেইসঙ্গে দরজার উপর ধাক্কাধাক্কি তো হচ্ছেই। আমি লামিয়াকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে দরজার কাছে গেলাম। হিংস্র জানোয়ারের মতো আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ল লামিয়া। বাধা দেওয়ার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই ও আমাকে মেঝেতে ফেলে দিলো। অমানুষিক শক্তি ওর গায়ে। কিছুতেই পেরে উঠলাম না আমি। এদিকে লামিয়া আমাকে এলোপাতাড়ি ভাবে আঘাত করতে লাগল। ততক্ষণে আমার নাক মুখ ফেটে রক্ত বেরোনো শুরু করেছে। জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়েছে।
ওদিকে দরজার উপর দাপাদাপি চরমে পৌঁছেছে। এখন দু'টো মানুষের গলা শোনা যাচ্ছে। একটা মর্জিনা আরেকটা অচেনা কোনো পুরুষের। দু'জনই চেঁচিয়ে দরজা খুলতে বলছে।
কিন্তু দরজা খুলবো কীভাবে?
হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটে গেল। লামিয়া আমাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলো। সেই সুযোগে দরজা খুলে দিলো স্নিগ্ধা। দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করল তান্ত্রিক টাইপের একটা লোক। সঙ্গে মর্জিনা। তান্ত্রিক লোকটা সিঁদুরের মতো কিছু একটা লামিয়ার শরীরে ছিটিয়ে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে মরণ চিৎকার দিয়ে দূরে ছিটকে পড়ল লামিয়ারুপি পিশাচটা। তারপর মেঝেতে পড়ে কাটা ছাগলের মতো লাফাতে লাগল। এদিকে তান্ত্রিক লোকটা তার থলে থেকে আরও কিছু বের করে পিশাচটার শরীরে ছিটিয়ে দিলো। আমাদের চোখের সামনেই পিশাচটার চেহারা পরিবর্তন হতে লাগল। আস্তে আস্তে সে এক ভয়ালদর্শন বয়স্ক মহিলাতে পরিণত হলো। লাফালাফি একটু থামতেই হাতজোড় করে তান্ত্রিককে বলতে লাগল, "দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আর কখনোই এখানে আসবো না। আজই চলে যাব। আমাকে মেরো না। দয়া করো।"
কিন্তু তান্ত্রিকের মনে কোনো সহানুভূতি হলো না। সে থলে থেকে একটা বড় ছুরি বের করে একটা কোপে পিশাচটা মাথা ধর থেকে আলাদা করে ফেলল।
এদিকে আমাদের দু'জনকেই হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো। পরে মর্জিনার থেকে সব জানতে পারলাম। মর্জিনা বলল, "আমি আগেই ওই পিশাচটাকে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করবেন না বলে কিছু বলিনি। যেদিন আমাকে চোর বলে তাড়িয়ে দিলেন সেদিনও আপনাদের ক্ষতি হবে ভেবে কিছু বলিনি। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তান্ত্রিকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সব খুলে বলি তাকে। সব শুনে সে সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে নিয়ে রওয়ানা দেয়।"
"আমাকে তুই ক্ষমা করে দিস মর্জিনা।" বলেই মর্জিনাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে মা। "তুই না থাকলে আজ আমার দু'টো ছেলেমেয়ে...." আর কথা বাড়াতে পারে না মা। কান্নায় ভেঙে পড়ে।
মর্জিনাও আর কিছু বলে না। মাকে জড়িয়ে ধরে সে।