06/11/2021
-
ডেট মনে নেই.. তবে আমার বয়স তখন ১৭ হবে কেবল। দেশে মুস্তাফিজ তাসকিনদের আগমনে মারাত্মক ক্রিকেটিং ভাইভ। ভারত -পাকিস্তান -South africa দের হারিয়ে দিলো বাংলাদেশ । এর আগে ১৫র বিশ্বকাপও মারাত্মক ফাইট দিল আমাদের দল।
আমি তখনও অতটা ফিট না! হাইট ৫’৫” ওজন ৬৯ । জন্ম থেকেই দুহাতে পারদর্শী তবু বামহাতে একটু বেশি একটিভ ফিল করতাম সেই থেকেই চায়নাম্যান বোলিং আয়ত্ব করা।
কয়েক বছর একটা ছোট ক্লাবেও খেলি তবে ৫ম শ্রেনীতে বোর্ডের ভুলে রেজাল্ট আসে ৩.৯৫(টেস্ট পরীক্ষায় ৪.৯৩ ছিল) স্বভাবতই পরিবার থেকে নিষেধ করা হল ক্রিকেট খেলা ! স্বাভাবিক তখন কোনো মেধাবী ছাত্রের বাবা মাই চেতো না তার ছেলে মেয়ে ডাক্তার ইন্জিনিয়ার না হয়ে ক্রিকেটার হোক! আমি রাতে ছাদে প্রেকটিস করতাম।
যাইহোক ২০১৬ তখন Gazi Tyre Cricketers hunt! লোকাল প্লেয়ার হওয়ায় এটাই ছিল আমার প্রাইম সুযোগ ছিল । আর সালাউদ্দিন স্যার (কোচ) ছিলেন আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষ। কারন তিনিই সাকিব তামিম মুসিদের তৈরি করেছিলেন। যাইহোক আমি মুলূত ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিলাম , পাওয়ার প্লেতে পাওয়ার হিটিং আর বাকিটুকু সময় গ্যাপে খেলতাম । সুইংগিং বল আমার favourite । স্লোয়ার বলও ভালো নেগোশিয়েট করতে পারতাম। আর মেইনলি আমি চায়নাম্যান(left arm leg spinner) !
১ম ট্রায়ালের দিন গেলাম , গিয়ে হতবাক হাজার হাজার মানুষ অথচ এর মধ্যে কোনো রিজার্ভ ডে নাই! যাইহোক লাইনে জায়গা পেলাম । সারাদিন লাইনে দারিয়ে থেকে অবশেষে আমার নম্বর এলো। সামনে গিয়ে দেখি সালাউদ্দিন স্যার নেই একজন এসিস্টেন্ট হাতে স্পিডোমিটার নিয়ে দারিয়ে আছেন আমাকে দেখে প্রথমেই কেমন যেনো নাক ছিটকায়ে বল দিলেন।
সবাই ৩ টি করে বল করতেছে । আমি ঠিক করলাম প্রথম বল লেগস্পিন করব তারপরের গুলো যথাক্রমে গুগলি আর বাউন্সি । প্রথম বল করার পরই বললো “হইছে হইছে নেক্সট “ আমি হতবম্ভ হয়ে গেলাম । কি হলো কিছুই বুঝলাম না। উনি আমার বলটার দিকে তাকালো ও না। ৫ মিনিট নেটের কাছে দারায় থেকে গিয়ে বললাম আমাকে আবার বল করতে দিতে কিন্তু উনি দিবেননা।
পরে ১০ মিনিট ধরে বলার পর বললো “তোমার তো বডি খেলোয়ারের না।” । এই কথাটা সালাউদ্দীন স্যার বললেও হজম হতো! আমি ঠান্ডা মাথায় উনাকে বললাম ‘এসব বলবেন না । আপনি আমার বলটা দেখুন আমি চায়নাম্যান বোলার ।” তিনি হয়ত জানেনও না চায়না ম্যান কি! বললেন “ এমন গরপরতা বলিং এইযে সবাইই করতেছে!!”
অথচ এখনও অবধি চায়নাম্যান কোনো regular বোলারই প্রডিউস করতে পারেনি BCB ! আমি এটা বলায় বললো “আচ্ছা okay মাঠের ১২ রাউন্ড দিবা ১৮ মিনিটে তাহলে তোমাকে আরও ৩ বল করতে দিব। সারাদিন একফোটা পানিও খাইনি। আমি দৌরালাম ২৫ মিনিটে ১২ রাউন্ড দিলাম । পুরো চোখে সব ঝাপসা লাগতেছিল। হয়ত তারও মায়া লাগলো । তিনি বল দিলেন কিন্তু বিন্দু মাত্র জোরও পাচ্ছিলামনা।৩ টা বল করলাম , এবার উনি মন দিয়ে দেখলেন কিভাবে ব্যাটসম্যানকে ২ ও ৩ নম্বর বলে বিট করলাম। ২ য় বলটা গুগলি ছিল আরেকটু কম টার্ন নিলেই আউট হয়ে যেত। উনি আমাকে সিলেক্ট করলেন বললেন তোমাকে কার্ড একটু পরে দেই। সালাউদ্দিন স্যারের সাথে দেখা করাব তোমাকে।
কিন্তু তখন বাজে বিকাল ৪:১০ আর স্যার ব্যাটিং আর পেস বলিং সাইডেই ব্যাস্ত। এদিকে চুপিও দিতে আসতেছিলেন না। ৬ টা বাজে দেখলাম তিনি চলে গেলেন কাউকে না বলেই । আসলে এখানে যত মানুষ আসছিলো তার অর্ধেককেই নিরীক্ষা করতে পারা যায়নি । কোনো রিজার্ভ ডেও নেই। তাই সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে ভাঙচুর শুরু করায় হয়ত তিনি সেফটি রিজনে প্রস্থান করেছিলেন। লোকটা আমায় বললো তুমি কাল এসো। স্যার না অর্ডার দিলে আমি কার্ড দিতে পারবে না।
পরের দিন গেলাম আমাকে ঢুকতেই দিচ্ছেনা কার্ডের জন্যে । হঠাৎ গেটের ফাক দিয়ে দেখি ইনচার্জ বদলি হয়েছে। উনি আজ নেই। আমি অনেক হাতে পায়ে ধরায় একজন গার্ড ভিতরে ঢুকতে দিল ।
শর্ত হল কাজ হলে উনাকে বখশিশ দিতে হবে।
আমি ভিতর গিয়েই নতুন ইনচার্জকে বললাম তিনি না শুনেই ঘার ধাক্কা দিতে লাগলেন। পরে বাধ্য হয়ে আমাকে একজন লোকের সাথে পাঠায় দিলেন বললেন ওর বোলিং চেক করোতো। বিশ্বাস করবেননা মাঠের কোনায় একটা জায়গায় নিয়ে গেছে কোনো পিচ নাই বলতেছে ঘাসের উপর বল করতে। ভাই ২/৩ ইন্চি ঘাস। এখানে রাবারের বলও বাউন্স করতে চাবে না , তার উপরে আমাকে বলতেসে লেগ স্পিন বল করতে। আমি করলাম উনি বললো
“আমি তোমার বল ভালো বলবো তবে আমাকে ১০০০ টাকা দেয়া লাগবে”। আমি বললাম,” চান্স পেলে ২০০০ দিব” । তিনি কাজ করে দিলেন । এবার আমাকে Lunch পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেন। Lunch এ তিনি আমাকে ডাকলেন। বললেন কি হইছে আমাকে বল। আমি বললাম আমার স্পেশালিটি আমি চায়নাম্যান + ওপেনার, সুইং বল আমার স্ট্রং জোন , আমি স্পিন বলেও বাউন্স জেনারেট করতে পারি।
তিনি হাসলেন। বললেন “আমি তোমার সুইং খেলা দিয়ে কি করবো? আর লেগস্পিনারদের কোনে ভাত নাই। ন্যাশনাল টিমে একটাও লেগ স্পিনার দেখাইতে পারবা?
” আমি বললাম,” স্যার রাগ করবেন না। আমাদের দলে লেগ স্পিনার নাই কিন্তু বাকি সব দলেই লেগ স্পিনার আছে যারা তাদের দলকে ম্যাচ জিতায়।” তিনি বললেন,” তাহলে তো আমার জায়গায় তোমাকে রাখা দরকার ছিল এতো জানো যেহেতু।
তুমি দশ হাজার টাকা দিলে আমি স্যারের সাথে তোমার দেখা করায় দিতে পারি যদি এতোই confident হও। “ বেশি বিচলিত হইয়েন না। আমাদের দেশে সবাই এমন।
আমি সত্যি সেই মুহূর্তে রাগ আটকাতে পারতেছিলাম না। দূরে দেখলাম সালাউদ্দিন স্যার । উনার কাছে যেতে নিলাম সাথে সাথে ধরে আমাকে বের করে দিল।আমি কাদতে কাদতে বাসায় এলাম। সেদিন মিরপুরের জামও ছুটতে ছিল না। বাস ও যায়না। আর আমি ভাবতেছি কখন বাসায় আসবো । নেমে হাটা দিলাম । এতক্ষনে খেয়াল করলাম কাল দৌরায় পায়ে ফসকা পরে গেছে। আর আজ বুটের ঘষায় তা গলে পুজ আর রক্ত পরতেছে। আগেরদিন রাতেও খেয়াল করিনি এটা।
রাস্তায় এক পথচারী পেলাম। আমার সাথেই যাত্রাবারী অবধি এসেছেন তিনি। তাকে এসব বলায় তিনি একটু হেসে বললেন তিনি 3rd division এ খেলতেন আর সেখানে কিভাবে ফিক্সিং করে কত যোগ্য দলকে হারিয়ে দেয়া হয়! কত ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেয়া হয়!
ইন্ডিয়াতে রান্জি ট্রফি থেকেই খেলোয়ার বাছাই শুরু করে দেয়। আর আমাদের সব প্রতিভা ৩য় ডিভিশনেই দম ত্যাগ করে! বাসায় এসে আম্মুকে বলে সত্যি কান্না আটকাতে পারতেছিলাম না। ফুপায় কাদতেছিলাম। এজন্যে না যে সিলেকশন হয়নি। এজন্যে যে আমাকে অপমান করা হয়েছে বাজে ভাবে। মা বাবার নামে গালি দেয়া হয়েছে।
গল্পগুলো এই জন্যে শেয়ার করলাম না যে আমি হয়ত আরেক সাকিব আল হাসান হতাম বা আমার অনেক টেলেন্ট ছিল ।বরং এটা বুঝাতে যে কেন আমাদের দেশ আজ 73 , 84 তে অল আউট হয়ে যায়? কেন আমাদের ওপেনার রা সুইং দেখলেই পা কাপাকাপি শুরু করে? কেন আমাদের পেলেই অফফর্মে থাকা লেগস্পিনার রাও Hattrick , 5 wicket haul এর মতো কীর্তি করে যায়? কেন আমাদের ব্যাটিং এর চেয়ে বার্সেলোনার ডেম্বেলের ফিটন্যাস বেশি স্ট্যাবল !কেন নামিবিয়াও আমাদের চেয়ে ভালো খেলে। যারা ওখানে আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছে তাদের পরিশ্রমকে আমি শ্রদ্ধকরি। তবে আজ আমার মতো ছেলেদের সাথে যা হয়েছে এতদিন তার যোগ্য পরিনাম আজ বাংলাদেশ ভুগতেছে।
আমি আজ আগের মতোও ফিট নেই । বলও ধরি না ২বছর হয়ে যাবে। তবু খোজ রাখি বাংলাদেশ ক্রিকেট কেমন এগোচ্ছে।(গুছিয়ে লিখতে না পারার জন্যে ক্ষমা করবেন। আর সালাউদ্দিন স্যারকে যতটা দূর থেকে চিনি তিনি হয়ত ভালো মানুষই।)
Collected