21/04/2024
২০০১, ক্যাম্প ন্যু। কাতালানে তখন থমথমে পরিবেশ। লিগে বার্সার অবস্থানটা নড়বড়ে, সিজনের শেষ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেয়ার ভাগ্য সুতোয় ঝুলছে তখনো। ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা জিততেই হতো, কিন্তু জয়ের কাটাটা বার্সার বিপক্ষে! ঘড়ির কাঁটা সেদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল সময়ের সঙ্গে। ম্যাচ এগিয়ে চলছে ড্রয়ের দিকে। ভ্যালেন্সিয়া সমর্থকরা উল্লাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো তখনি, কাতালানদের ত্রাতা হয়ে এলেন একজন। নাম তার রিভালদো। ম্যাচের ৮৬ মিনিট চলছে, বক্সের একটু বাইরেই বল পেলেন। গোলবার উল্টো দিকে, অমন পজিশন থেকে তার থেকে যে গোল আশা করা দায়! তবে নামটা যখন রিভালদো, তখন তো আশা করাই যায়। বুক দিয়ে ঠেকিয়ে নিলেন ওভারহেড কিক। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ক্যাম্প ন্যু স্তব্ধ হয়ে গেলো। বার্সাকে যে টেনে তুলেছেন খাদের কিনারা থেকে! ততক্ষণে তিনি জার্সি খুলে ফেলেছেন, সতীর্থরা জড়িয়ে ধরেছে তাকে। রাতটা হয়তো হ্যাট্রিকহিরো রিভালদোময় হয়েই থাকবে কাতালানদের মাঝে।
রিভালদোর গল্পটাও আর দশটা ব্রাজিলিয়ানদের মতই। অযত্ন অবহেলা দারিদ্র্যের মাঝেই শৈশবটা কেটেছে তার। অপুষ্টি, অনাহারে কাটিয়েছেন অনেকদিন, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। তবে ফুটবলের প্রতিটা ভালোবাসাটা ছিল প্রখর। পলিস্টানো ফুটবলের ক্লাব কোচ ছোট্ট রিভালদোর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, দলে টেনে নিলেন তাকে। রিভালদোর উত্থান এখান থেকেই। পেশাদারী হাতেখড়ি টা হয়েছিল সান্তা ক্রুজের হয়ে। তবে তার ইউরোপ ক্যারিয়ারটা বেশ দেরিতেই শুরু হয়। ডিপোর্টিভা লা করুণাতে যোগ দিতে দিতে তার জীবনের দুই যুগ ততদিনে কেটে গেছে।
পরের মৌসুমেই তাকে দলে ভেড়ায় বার্সা, দলবদলের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। বার্সার ডগআউটে তখন ভ্যান গাল। তার অধীনে রিভালদোর শুরুটাও হলো দুর্দান্ত। এসেছিলেন স্বদেশী রোনালদোর রিপ্লেসে, অভাবটাও বুঝতে দেননি দলকে। প্রথম মৌসুমেই তার কাঁধে ভর করে ডোমেস্টিক ডাবল জিতে বার্সা। পরের মৌসুমগুলোতে পারফর্ম করে গেছেন সমান্তর ধারায়। বার্সা তাকে খেলতে দিয়েছিল তার প্রিয় পজিশনে। পাঁচ বছরে ক্লাবকে দুহাত ভরে দিয়েছেন তিনি। রোনালদোর শূন্যতা পূরণ করেছেন, নিজেকে আরও ভয়ংকরভাবে উপস্থাপন করেছেন বারবার।
ক্যারিয়ারে যেমন সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি মুদ্রার উল্টো পিঠ ও দেখতে হয়েছে তাকে। ১৯৯৬ সালের অলিম্পিক, শিরোপা জেতার জন্য মুখিয়ে সেলেসাওরা। কিন্তু ম্যাচে তার ভুল পাস থেকেই প্রথম গোল কনসিড করে ব্রাজিল। ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করেন গোলকিপারকে একা পেয়েও গোল করতে না পেরে। তার কারণেই বিদায় নেয় সেলেসাওরা, তিনি বনে যান ভিলেন। মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে আসা মিডিয়ার জন্য আরো সমালোচিত হতে হয় তাকে।
তবে নিজের সেরাটাও বোধহয় এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দিয়েছিলেন রিভালদো। ফ্রান্সের কাছে বিশ্বকাপ খোয়ালেও দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার ছিলেন তিনি। পরের বছরটা তার কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। ব্রাজিলকে জিতিয়েছিলেন কোপা আমেরিকা, নিজেও জিতেছেন ব্যালন ডি অর। ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়েও রেখেছেন সর্বোচ্চতম অবদান। সতীর্থ রোনালদোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গোল করেছেন। ফাইনালেও দুই গোলেই অবদান ছিল তার। ব্রাজিলিয়ানরা কাউকে আপন করে নিতে সময় নেয় না। রিভালদোকেও তারা ভালোবাসতে শুরু করলো। খলনায়ক থেকে ব্রাজিলের জাতীয় হিরো বনে গেলেন তিনি। স্বপ্নের মতো বিশ্বকাপ কাটিয়েছিলেন, ক'জনই বা পারে!
পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার না হলেও গোলের ব্যাপারে রিভালদোর মোটেই অনীহা ছিলো না। দারুণ গতির সাথে চোখ-ধাঁধানো ড্রিবলিং আর বলের উপর অসামান্য নিয়ন্ত্রণ – লম্বাটে খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এই তিনের সমন্বয়টা সহজে চোখে পড়ে না। তার রোনালদোর মত গোলস্কোরিং কিংবা বেকহ্যাম জিদানের মত প্রতিভা ছিল না। তবে এসবের মিশ্রণ ছিলেন তিনি। ক্যারিয়ারেও কোনো অপূর্ণ ছিল না তার। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ব্যালন ডি অর সবই জিতেছেন ঝলমলে ক্যারিয়ারে। রোনালদো, রোনালদিনহোর সাথে মিলে 'ট্রিপল আর' জুটি গড়েছিলেন। রেসিফের বস্তি থেকে করেছেন বিশ্বজয়। ধৈর্য আর খেলা দিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের বৈমাত্রেয় আচরণকেও পরিণত করেছেন ভালোবাসায়। সর্বজয়ী রিভালদো জয় করেছেন শিরোপা, দারিদ্র্য, প্রতিকূলতাকেও। ভালবাসতে তো সবাই পারে, হিংসাকে জয় করতে পারেই বা কয়জন?
১৯৭২ সালের আজকের এই দিনেই ব্রাজিলের রেসিফে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই কিংবদন্তী। আজ তিনি ৫২ বছরে পা দিলেন।
শুভ জন্মদিন রিভালদো!
Author: সৈয়দ ইসতিয়াক বাশার নাবিল