দূর্গাপুর গাড়াইল ব্রাদারহুড ক্লাব

  • Home
  • Bangladesh
  • Dhamrai
  • দূর্গাপুর গাড়াইল ব্রাদারহুড ক্লাব

দূর্গাপুর গাড়াইল ব্রাদারহুড ক্লাব সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় চিন্তার প্রতিষ্ঠান

08/12/2022

"কোনো সমাজে দীর্ঘদিন ভয়ের পরিবেশ বিরাজমান থাকলে, ওই সমাজের বাসিন্দাদের আচরণ ভালো থেকে মন্দের দিকে বিবর্তিত হতে পারে। ‘ভয়’ তখন বংশ পরম্পরায় স্থানান্তরিত হতে পারে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। ভীতু বাবা-মা’র ঘরে জন্ম নিতে পারে ভীতু সন্তান। ভয়ের পরিবেশে টিকে থাকতে মানুষ যে যে কৌশল অবলম্বন করে, সে সে কৌশল বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদের ভেতর বংশগতির মাধ্যমে রেখে যেতে পারেন, যেন সন্তানগুলো ওই পরিবেশে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়। ‘ভয়’ যে জেনেটিকলি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়, সে বিষয়টি অধ্যাপক ব্রায়ান ডায়াসের একটি গবেষণাপত্রে আমি লক্ষ করেছিলাম। ডায়াসের পরীক্ষাটি ছিলো এরকম:

কিছু ইঁদুরকে তিনি ‘এসিটোফেনোন’ নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ শুঁকতে দেন। এসিটোফেনোন থেকে যে মিষ্টি ঘ্রাণ বের হয়, তা মূলত আলমণ্ড বা কাঠবাদামের ঘ্রাণ। এ ঘ্রাণ শুঁকে কারও ভয় পাওয়ার কথা নয়। ইঁদুরগুলোও ভয় পাচ্ছিলো না। কিন্তু ডায়াস করলেন কী, প্রতিটি ইঁদুরকে এসিটোফেনোনের ঘ্রাণ শুঁকানোর পর হালকা মাত্রায় ইলেকট্রিক শক দিতে লাগলেন। এভাবে এক সময় দেখা গেলো, এসিটোফেনোনের ঘ্রাণ শুঁকা মাত্রই ইঁদুরদের মনে ‘ইলেকট্রিক শক’ খাওয়ার ভয় জন্ম নিলো। কোনো ইঁদুর এসিটোফেনোনের কাছাকাছি গেলেই সে আতংকিত হয়ে উঠতো— এই বুঝি ইলেকট্রিক শক দেওয়া হবে। ধরা যাক, এ ইঁদুরগুলো ছিলো ডায়াসের ইলেকট্রিক শক খাওয়া ‘প্রথম প্রজন্মের ইঁদুর’।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কিছুদিন পর যখন এ ইঁদুরদের ঘরে নতুন প্রজন্মের বাচ্চা জন্ম নিলো, তখন সেই বাচ্চা ইঁদুরগুলোও এসিটোফেনোনের ঘ্রাণ শুঁকা মাত্রই অজানা ভয় ও আতংকে শিউরে উঠতে লাগলো। কিন্তু এই দ্বিতীয় প্রজন্মের ইঁদুরদেরকে কখনো ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় নি। অর্থাৎ প্রথম প্রজন্ম থেকে ‘এসিটোফেনোনের ঘ্রাণ শুঁকে বিপদ টের পাওয়ার সচেতনতা’ বা ‘ভয়’, জেনেটিকলি দ্বিতীয় প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার, এই দ্বিতীয় প্রজন্মের ঘরে যে-ইঁদুরগুলো ‘তৃতীয় প্রজন্ম’ হিশেবে জন্ম নিলো, এবং তৃতীয় প্রজন্মের ঘরে যে-ইঁদুরগুলো ‘চতুর্থ প্রজন্ম’ হিশেবে পৃথিবীতে এলো, সেগুলোর ভেতরও এ ভয় রয়ে গেলো!

ফলে দেখা যাচ্ছে, আমি ও আমার প্রজন্মের মানুষ যদি ভয়ের পরিবেশে বড় হই, এবং এ ভয় শনাক্ত করার উপায় যদি আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে যায়, তাহলে ভয়টি বংশপরম্পরায় আমাদের সন্তানদের মাঝেও সংক্রমিত হতে পারে। হলুকাস্ট সার্ভাইভোরদের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা গেছে। ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানী নাতান কেলারম্যান দেখিয়েছেন যে, হিটলারের হাত থেকে যে-ইহুদীরা রক্ষা পেয়েছিলো, তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদের মাঝে ভয়-ভীতির জেনেটিক ট্রান্সমিশন ঘটেছে। এ সন্তান ও নাতি-নাতনীদের শরীরে ‘স্ট্রেস হরমোন’-এর যে-লেভেল পরিলক্ষিত হয়, তা ভয়শূন্য স্বাভাবিক মানুষের ‘স্ট্রেস হরমোন’ লেভেল থেকে ভিন্ন। কেলারমেনের ধারণা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীরা যে-ট্রমা, দুশ্চিন্তা, ও দুর্যোগের ভেতর দিয়ে গেছে, তা ‘জেনেটিক মেমোরি’ বা ‘জন্মগত স্মৃতি’ আকারে তাদের সন্তানদের ভেতর প্রবেশ করেছে।

ডায়াস ও কেলারম্যানের গবেষণাটি আমার কাছে এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে, এটি কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরাচারী, ও বকধার্মিক সমাজে জন্ম নেয়া শিশুদের মানসিক অবস্থা নিরূপণে সাহায্য করতে পারে। কোনো সমাজে যদি আইনের অপপ্রয়োগ ও ধর্মীয় প্রথার বাড়াবাড়ি বেড়ে যায়, এবং বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে মানুষের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে যে-ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে, সে-পরিবেশে জন্ম নেয়া প্রতিটি শিশুর জিনে বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত ভয়, ট্রমা ও দুশ্চিন্তা লুকিয়ে থাকতে পারে। একটি দেশ ও জাতিকে পঙ্গু করার জন্য ভয়ের চেয়ে কার্যকর অস্ত্র আর কী হতে পারে তা আমার জানা নেই।"


—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
('ভোর হলো দোর খোলো খুকুমণি ওঠো রে' বইয়ের 'ডায়াসের ইঁদুর' অধ্যায় থেকে)

04/11/2022

ভুঁড়ি হলো একজনের শরীরে বেড়ে ওঠা আরেকজনের মাংস। কোথাও কেউ না কেউ না খেয়ে থাকে বলেই জন্ম হয় ভুঁড়ির। তবে পেটের উপরে যা গজায়, তা আমাদের আসল ভুঁড়ি নয়। আসল ভুঁড়ি অন্যখানে।

ধরা যাক, গ্রামে সৈয়দ আব্দুল আলির একটি বাড়ি আছে। টাকা হওয়ার পর তিনি ঢাকায় আরেকটি নতুন বাড়ি করলেন। এই নতুন বাড়িটিই তার আসল ভুঁড়ি। এরকম আসল ভুঁড়ি সৈয়দ আব্দুল আলির আরো অনেক থাকতে পারে। পকেটে যে টাকা-সমৃদ্ধ ভারী ডেবিট কার্ডটি নিয়ে তিনি ঘোরেন, সেটিও তার একটি আসল ভুঁড়ি।

আমাদের সম্মানিত স্যারেরা সম্প্রতি তাদের কিছু ভুঁড়ি কানাডায় পাচার করে দিয়েছেন। এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করেছেন। ভুঁড়ি ফেরত আনার জন্য তিনি ও তার সরকার এখন দেন-দরবার করছেন কানাডা সরকারের সাথে। তবে ভুঁড়ি একবার বেহাত হলে, তা পুনরায় হাত করা খুব মুশকিলের ব্যাপার।

রাজউকের এক চেয়ারম্যান, কিছুদিন আগে অন্যের ভুঁড়ি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছেন। ভুঁড়ি দখলের এরকম ঘটনা বাংলাদেশে প্রায়ই ঘটে থাকে। বাঙালির জন্য এক স্ত্রী আর এক ভুঁড়িতে তৃপ্ত থাকা খুবই কঠিন কাজ।

ভুঁড়ি একা একা ভোগ করা যায় না। ভুঁড়ির একটি ভাগ নিয়মিত রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে হয়। কয়েক বছর আগে অর্থমন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকেও ভুঁড়ির ভাগ আদায় করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু ভুঁড়িহীন পরিবারের ছাত্ররা রুখে দাঁড়ানোয় তা নস্যাৎ হয়ে যায়।

তবে সবার কাছ থেকে রাষ্ট্র ভুঁড়ির ভাগ আদায় করতে পারে না। আমাদের মাননীয় সাংসদেরা প্রতি পাঁচ বছর পরপর উপভোগ করেন শুল্কমুক্ত ভুঁড়ি সুবিধা। যে-ভুঁড়ি জনগণের কিনতে চার কোটি পাঁচ কোটি লাগে, সে-ভুঁড়ি তারা লাখের ঘরেই কিনতে পারেন। মানুষের জন্য যে-হাড়ভাঙা দুশ্চিন্তা তারা করেন, তার বিপরীতে এ সুবিধা তাদের প্রাপ্য বলেই মনে করি।

শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের ভুঁড়ি না থাকলেও, তাদের অনুসারীদের ভুঁড়ি আছে ভূরি ভূরি। শাহেদ নামের ওই ভুঁড়িওয়ালাটিকে না ধরলে, আমরা জানতামই না যে মুজিব কোটের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে এতো বড় ভুঁড়ি।

ইদানীং নারীরাও ভুঁড়ির দিকে ঝুঁকেছে। বিয়ে করার সময় তারা পাত্রের ভুঁড়ির ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে। যার ভুঁড়ি নেই, তাকে তারা বিয়ে করছে না। পড়াশোনা জানা বেকার ছেলেরা একটি ভালো ভুঁড়ির অভাবে বিয়ের স্বাদ নিতে পারছে না। এ জন্য তরুণেরা এখন রাত-দিন প্রার্থনা করছে— হে আল্লাহ, আমাদেরকে একটি বিসিএস ভুঁড়ি দাও।

নতুন চাকুরিতে ঢোকা এক ছেলেকে চিনি, যার বিয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেছে পাত্রীর ভুঁড়ির দাবি মেটাতে গিয়ে। পাত্রীর দাবি, নগদ দশ লাখ টাকা কাবিন না দিলে সে তার স্বজনদের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না। পৃথিবীতে মুখ দেখাতে যে এতো টাকা লাগে, তা বাংলাদেশে না জন্মালে আমার জানা হতো না।

03/11/2022

"কমিটিবাজি বাঙালির খুবই পুরাতন রোগ। বাঙালি যখন দেখে যে কোথাও করার মতো কোনো কাজ নেই, তখন সে ওখানে একটি কমিটি করে। কমিটি করে সে পৃথিবীকে জানাতে চায়— আমি ঘোড়ার আণ্ডায় ‘তা’ দিচ্ছি। আমি ‘তা’ না দিলে পৃথিবী থেকে ঘোড়া বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাঙালি কেন এতো কমিটি করে, তা বুঝতে গিয়ে আমি দেখেছি— তার মনে সবসময়ই রাজা হওয়ার একটি সুপ্ত বাসনা কাজ করে। কারণ সে দীর্ঘকাল রাজা-বাদশা-জমিদার ও ঔপনিবেশিক লাটসাহেবদের অধীনে বাস করেছে। পরাধীন থেকে থেকে মুক্তির যে-তীব্র বাসনা সে লালন করেছে, তা বংশ-পরম্পরায় তার উত্তরসূরীদের মনেও রয়ে গেছে। এখনো এ উত্তরসূরীরা স্থানীয় লাটসাহেবদের দ্বারা পর্যুদস্ত। বছরের পর বছর ধরে আয় ও মর্যাদাবৈষম্যের শিকার হয়ে তারা প্রতিজ্ঞা করেছে, ‘একদিন আমরাও রাজা হবো। রাজা হয়ে অন্যদেরকে দেখিয়ে দেবো— প্রজা হওয়ার কতো যন্ত্রণা।’ এ চিন্তা থেকেই তারা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর উদ্যোগ নেয়। যেহেতু রাজা হওয়ার সুযোগ পৃথিবীতে এখন একেবারেই সীমিত, তাই বাঙালিবৃন্দ বিকল্প উপায়ে রাজা হওয়ার বাসনা পূরণ করে। এ বিকল্প উপায়ের একটি হলো কমিটি। কমিটির সভাপতি কল্পনায় রাজমৈথুন করে চরিতার্থ করতে থাকে তার রাজবাসনা। কমিটির উপদেষ্টা, সহ-সভাপতি, সেক্রেটারি, সদস্য, তারা সবাই মিলে ভান করেন— তারা একটি রাজ্য চালাচ্ছেন। এ রাজ্যের তারা একচ্ছত্র অধিপতি। পদানত মানুষ যখন কাউকে পদাবনত করার সুযোগ পায়, তখন তার খুশির কোনো সীমা থাকে না।"

20/10/2022

[দর্শন, বিজ্ঞান, ও ধর্ম— এ তিনটির পার্থক্য]


দর্শন কী? এ প্রশ্ন বাংলাভাষী কাউকে করা বিপজ্জনক। যারা টকশো ও অধ্যাপনা করেন, তারা এ প্রশ্নের উত্তরে যা বলেন, তার বেশিরভাগই মুখস্ত এনসাইক্লোপিডিক বক্তৃতা। শুনলে মনে হবে, একটি ভাঙা রেলগাড়ি, তার পথ ও বগি হারিয়ে রওয়ানা দিয়েছে কোনো অন্ধকার অরণ্যের দিকে। দর্শন, বিজ্ঞান, ও ধর্ম— এ তিনটি ট্রেনই এ অঞ্চলে সবসময় ভুল যাত্রী নিয়ে ভুল স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে। এতে জ্বালানি পোড়ে ঠিকই, কিন্তু কোনো লক্ষ্য সাধিত হয় না। কেউই গন্তব্যে পৌঁছে জানাতে পারেন না, আমি আলোর দেখা পেয়েছি। এর প্রধান কারণ সম্ভবত— তিনটি বিষয়ই এখানে বেঁটে মানুষজন দ্বারা শাসিত। অর্থ, ক্যামেরা, ও খ্যাতি— এ তিনের পাকে পড়ে কাণ্ডারিরা এখানে সহজেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে অনিবার্যভাবে, এ অঞ্চলে দর্শন হয়ে উঠেছে লালন ফকির ও চাকুরিজীবীদের কর্মকাণ্ড। আমি বলছি না যে বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শনকে গ্রিক বা কন্টিনেন্টাল দর্শনের চশমা দিয়ে দেখতে হবে, কিন্তু বাউল গান ও উদাস ছড়াকবিতার সাথে দর্শনের যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে, সেটি অনুধাবন করা জরুরি। অন্যথায় সব তরলকেই পানি মনে হবে, এবং পান করার পর আফসোস করতে হবে— আহা, কেউ সতর্ক করলে হয়তো গড়লটি থেকে বাঁচা যেতো।

দর্শনের জন্ম কৌতূহল থেকে। যে-প্রাণী বুদ্ধিমান ও কৌতূহলী, যে-জীব দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু নিয়ে নিঃশঙ্কোচে প্রশ্ন তুলতে পারে, এবং জ্ঞানযোগে সুসংহতভাবে সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারে, তার কর্মকাণ্ডই দর্শন। আমি প্রজ্ঞাবান, প্রজ্ঞার প্রেমে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, আই অ্যাম ইন লাভ উইদ উইজডম, দর্শনের এ ধরণের সংজ্ঞা বিভ্রান্তিকর। কারণ সভ্যতা পিথাগোরাসের যুগে থেমে নেই। বাংলাদেশ বিশকোটি প্রজ্ঞাবানের দেশ, তাদের অনেকেই মুখ খুললে এখন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে প্রজ্ঞায়, বোধির ঝলকে উপচে পড়তে থাকে টেলিভিশন ও পত্রিকা, জার্গনের আঘাতে কাঁপতে থাকে ফেসবুক, তাই বলে কি আমি বলতে পারি, বাংলাদেশ বিশ কোটি দার্শনিকের দেশ? বলতে পারি না। চৌকিদারকে যেমন আমরা পুলিশ সুপার বলি না, তেমনি কেউ সারাক্ষণ নানা পূর্বসূরীর নাম নিলেই তিনি দার্শনিক হয়ে ওঠেন না।

দর্শন পথ সৃষ্টি করে, কিন্তু সে-পথ পথচারীকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে— তা দর্শন নিশ্চিত করে বলতে পারে না। সে পথ দেখায়, তবে ওই পথের শেষে ‘সত্য’ বা ‘সমাধান’ আছে কি না, থাকলে তার রূপ কী, সে-সম্পর্কেও কিছু বলে না। সে শুধু বলে, ওই দিকে যাও, ‘সত্য’ বা ‘সমাধান’ পাওয়া যেতে পারে। যদি পাওয়া যায়, তাহলে তা কিছু ক্ষেত্রে হয়ে উঠে বিজ্ঞান, কিছু ক্ষেত্রে প্রথা। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে ওই পথের প্রান্ত থেকে সৃষ্টি হয় আরও অনেক নতুন পথ। সরল করে বললে, দর্শন আমাদেরকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রচলিত ‘সত্য’ ও ‘সমাধান’ প্রত্যাখ্যান করে নতুন সত্য ও সমাধান নির্মাণ করতে বলে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও ধর্মের সাথে দর্শনের পার্থক্য হলো: ১) বিজ্ঞান সর্বদা প্রচলিত সত্যে স্থির থাকতে চায়, অথবা চাহিদা অনুযায়ী প্রচলিত সত্য ও সমাধানের উন্নয়ন ঘটিয়ে ‘অধিকতর গ্রহণযোগ্য সত্য ও সমাধান’ উদ্ভাবন করে; ২) ধর্ম তার সুবিধা ও মতলব অনুযায়ী সত্যের রূপ নির্দিষ্ট করে দেয়, যার বাইরে ধর্ম অনুসারীদের চিন্তা করার কোনো সুযোগ থাকে না।

ফলে বলা যায়, দর্শন বিজ্ঞানকে পথ দেখাতে পারলেও ধর্মকে পারে না। কারণ ধর্মের ধর্ম হলো সারাক্ষণ একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির হয়ে থাকা। আসন ছাড়লেই এর বিলুপ্তি ঘটে। ধর্ম যদি বলে, ওই পুকুরে একটি তিমি মাছ আছে, তাহলে ধার্মিকের পক্ষে ওই তিমি মাছটিকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু দর্শনে এ স্থিরতা নেই। দর্শন গতিশীল ও প্রবাহমান। দর্শন যখন স্থির হয়ে পড়ে, তখন তা আকার ধারণ করে ধর্ম ও রাজনীতিক দলের। গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীরের দর্শন এখন ধর্ম হয়ে গেছে, যেরকম মার্ক্সের দর্শন পরিণত হয়েছে রাজনীতিক লিফলেটে। সুতরাং এক অর্থে বলা যায়, অন্ধ অনুসারী বা মুরিদ নয়, দার্শনিকের প্রধান কাজ সমাজে নতুন দার্শনিক তৈরি করা, যারা তার মতামতকে এগিয়ে নেবেন সামনের দিকে, অথবা বিকল্প মতামত দ্বারা চ্যালেঞ্জ করবেন বিদ্যমান মতামতকে। থ্যালিস যখন বললেন, সবকিছুর উদ্ভব পানি থেকে হয়েছে, তখন তাঁর ছাত্র এনাক্সিম্যান্ডার বললেন— পানি নয়, সবকিছুর উদ্ভব ঘটেছে আপিরোন থেকে। কিন্তু এনাক্সিম্যান্ডারের ছাত্র আনেক্সিমিনিস প্রচার করলেন নতুন কথা। তিনি বললেন, পানি নয়, সবকিছুর জন্ম বাতাস থেকে। তবে বাতাসও বেশিদিন টেকে নি। হেরাক্লিটাস এসে বললেন, মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে আগুন থেকে। এভাবে আমরা হেরাক্লিটাস থেকে জেনোফেন, জেনোফেন থেকে পিথাগোরাস, পিথাগোরাস থেকে পার্মেনিডিস, পার্মেনিডিস থেকে জেনো, জেনো থেকে ইমপেডোক্লিস, ইমপেডোক্লিস থেকে এনাক্সাগোরাস, এবং এনাক্সাগোরাস থেকে লুসিপাস-এ এসে জানলাম— মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে পরমাণু দিয়ে। লুসিপাস বললেন, সবকিছুই অবিভাজ্য ছোট ছোট কণা দ্বারা গঠিত। ডেমোক্রিটাসও বললেন, হ্যাঁ, চারপাশে যা কিছু আমরা দেখি, তার সবই পরমাণু ও শূন্যস্থান।

জ্ঞান ও সত্য সন্ধানের এই যে নিরবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, নির্ভীক সংগ্রাম, যা পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে থ্যালিস থেকে এসে পৌঁছোলো ডেমোক্রিটাস পর্যন্ত, এটিই দর্শন। থ্যালিসদের কর্মকাণ্ডকে ২০২২ সালে এসে আমাদের কাছে খুব তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু মানুষের যা রেকর্ডেড ইতিহাস, তাতে থ্যালিসদের ওই ক্ষুদ্র প্রশ্নটি, অর্থাৎ ‘আমরা যা দেখি, তা কী দিয়ে তৈরি?’— এটি থ্যালিসদের আগে আর কারও মনে এমন তীব্র শক্তিতে উদয় হয় নি। সবাই যখন দেব-দেবী নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, নিঃশর্ত সমর্পণ ছাড়া আর কোনো ভাবনা যখন কারও মনে ছিলো না, তখন প্রাচীন গ্রীসে হঠাৎ একদল মানুষ দেখা দিলো, যারা হুট করে চারপাশের সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলো, এটি মহাবিস্ময়কর ঘটনা। কী দরকার ছিলো প্রশ্ন করার? কীসের তাড়না তাদেরকে উস্কে দিয়েছিলো জ্ঞান ও সত্যের তালাশের দিকে? কেন জেনোফেন একদিন বলে বসলেন, দেব-দেবীর উপাসনা করা অর্থহীন, এদের আচরণ অযৌক্তিক, ঘোড়ার যদি হাত থাকতো, তাহলে সে ঘোড়ার মতোই দেখতে একটি দেবতার ছবি আঁকতো? সম্ভবত তাদের ভেতর জন্ম নিয়েছিলো হঠাৎ এমন কোনো বোধ, যা স্থির ধর্মীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে পায়ে মাড়িয়ে উঁকি দিয়েছিলো মুক্ত আকাশে। এ বোধ, এ কৌতূহলই দর্শন, যা প্রাচীন মিশরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের ছিলো না। গণিত, জ্যামিতি, ও জ্যোতির্বিদ্যায় অসাধারণ দক্ষতা থাকার পরও, শতকের পর শতক ধরে ধর্মতন্ত্রে স্থির থাকায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক চিন্তা মিশর ও ব্যাবিলনে ছড়াতে পারে নি। কারণ ধর্মতন্ত্রে নিয়ম হলো— গতকালের সত্যই আজকের সত্য। কোনো নতুন সত্য উদ্ভাবনের সুযোগ এখানে নেই। গতকাল কেউ সূর্যের পূজা করলে, আজকেও তাকে সূর্যের পূজাই করতে হবে— এই ছিলো মিশর ও ব্যাবিলনের নিয়ম। এ নিয়ম ভাঙার সাহস কেউ করে নি। কিন্তু গ্রিক মাইলেসিয়ানরা এ নিয়ম ভেঙেছিলো। একটি ছোট প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে তারা সূচনা করেছিলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবিপ্লবটির, যেটিকে আমরা এখন দর্শন বলি।

দর্শন ধারণা দেয়, আর বিজ্ঞান সে-ধারণাকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে স্থিরতা দান করে। আইনস্টাইন যখন বললেন যে, আলো খুব ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকা পথ অনুসরণ করে, সোজা পথ অনুসরণ করে না, তখন তা ছিলো দর্শন। কিন্তু এডিংটন যখন পর্যবেক্ষণযোগে প্রমাণ করলেন যে, আলো সত্যি সত্যিই সূর্যের মতো ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেঁকে যায়, ইউক্লেডীয় সরল জ্যামিতিক পথ সে অনুসরণ করে না, বরং স্থান-কালের বক্র জিওডেসিক পথ অনুসরণ করে, তখন তা হয়ে গেলো বিজ্ঞান। অর্থাৎ কোনো জ্ঞান বা ধারণা যতোক্ষণ পর্যন্ত অনিশ্চিত, ততোক্ষণ পর্যন্ত তা দর্শন। কিন্তু যখনই তা কানজেকচার বা স্পেকুলেশন থেকে পরিণত হয় নিশ্চিত জ্ঞানে, তখনই তা রূপ ধারণ করে বিজ্ঞানের। হিগস কণা একসময় দার্শনিক স্পেকুলেশনের অংশ হলেও, ২০১২ সালের পর তা পরিণত হয়েছে প্রমাণিত বা প্রচলিত সত্যে। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, সবার ক্ষেত্রেই এটি ঘটেছে। তবে দর্শন কেবল ন্যাচারাল ফিলোসোফি বা বিজ্ঞান-উৎপাদক দর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ন্যাচারাল ফিলোসোফি দর্শনবৃক্ষের অনেকগুলো ডালপালার একটি ছোট অংশ মাত্র।

প্রশ্ন জাগতে পারে, দর্শনের ব্যাপ্তি তাহলে কী? দর্শন কী নিয়ে কাজ করে?

দর্শন ‘সবকিছু’ নিয়েই কাজ করে। কোনো প্রাণী তার চারপাশকে কীভাবে দেখছে ও শুনছে, বাস্তবতাকে সে কী প্রক্রিয়ায় অনুভব ও অনুধাবন করছে, কোনো বিষয়ে মানুষ কী উপায়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সমাজে তার আচরণ কেমন, রাষ্ট্রের সাথে মানুষের সম্পর্ক কী, কোনো আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্কের বৈধতা কী উপায়ে নির্ধারিত হয়, পদার্থ ও শক্তির অস্তিত্ব আছে কি না, সময়ের সাথে স্থানের সম্পর্ক কী, মহাবিশ্বের সংখ্যা কতো, গণিত ও জ্যামিতির ভিত্তি কী, ঈশ্বর বলে কোনো কিছু আছে কি না, আইন কখন আইন হয়ে ওঠে, শিক্ষাপদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত, মানুষের মনের আসল রূপ কী, ভাষা কীভাবে কাজ করে, বৈজ্ঞানিক সত্যের সীমাবদ্ধতা আছে কি না, ধর্মের ভিত্তি কী, মানুষের জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা কতোখানি, রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন হওয়া উচিত, সত্য-মিথ্যা ভালো-মন্দ কী রূপে নির্ধারিত হয়, জীবনের কোনো মানে আছে কি না, অপরাধ ও শাস্তি কী জিনিস, মানুষকে কী রূপে শাসন করা উচিত, এ সমস্ত কিছুই দর্শনের কর্মক্ষেত্র। দর্শন সবকিছুকেই পথ দেখায়। আবার কোথাও যে পথ নেই, সেটিও দেখায়। মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় নিয়েই সে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা রাখে। প্রশ্নহীন গুরু-শিষ্যবাদ ও পীর-ফকিরি প্রথার কোনো স্থান দর্শনে নেই।

ভৌগোলিক বৈচিত্রের মতোই দর্শনে দেখা দিয়েছে নানা অঞ্চল ও সমাজভিত্তিক বৈচিত্র। পৃথিবীর একেক অঞ্চলে মানুষ একেক সময়ে অবতারণা করেছে একেক দর্শনের। প্রাচীন গ্রীস ও প্রাচীন চীনের মানুষের চিন্তাপদ্ধতির সাথে প্রাচীন ভারতের মানুষের চিন্তাপদ্ধতি মিলবে না। আরব অঞ্চলের মানুষ যে-প্রক্রিয়ায় চিন্তা করেছে, আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষ সে-প্রক্রিয়ায় চিন্তা করে নি। আবার আমি যে-প্রক্রিয়ায় চিন্তা করছি, তার সাথে মধ্যযুগ ও আঠারো শতকের ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তাপদ্ধতি মিলবে না। চিন্তার এ বৈচিত্র দর্শনে সব স্থানে সব কালেই ছিলো। ভাষা ও সভ্যতার বৈচিত্র আমলে নিলে, দর্শনের এ বৈচিত্রকেও একটি স্বাভাবিক পরিণতি হিশেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।


—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
(‘বিশ্বসাহিত্য ভাষণ / দর্শন খণ্ড’ থেকে)

27/05/2018

ক্লাব এর খেলা বাবদ খরচ নিয়ে কিছু সদস্য কথা তুলেসেন ।এ বেপার নিয়ে আগামি ক্লাব মিটিং এ বিস্তারিত আলোচনা হবে।সবাই কে থাকতে বলা হল

পক্ষে
মামুন হোসেন
সাংগঠনিক সম্পাদক
দুর্গাপূর গাড়াইল ব্রাদারহুড ক্লাব

19/08/2017

আগামী ঈদে ক্লাবের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত হবে।।সকল সদস্যগন কে উপস্থিত থাকতে বলা হল

মো রাসেল মিয়া
সাধারণ সম্পাদক
দূর্গাপুর গাড়াইল ব্রাদারহুড ক্লাব

28/05/2015

ফেসবুকে সূর্য তরুণ সংঘ(দূর্গাপূর গাড়াইল,ধামরাই,ঢাকা)-র যাত্রা শুভ হোক।
বিঃদ্রঃ সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ধন্যবাদ সবাইকে।

Address

Durgapur Garail, Dhaka
Dhamrai
1350

Telephone

+8801923431492

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when দূর্গাপুর গাড়াইল ব্রাদারহুড ক্লাব posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category