20/10/2022
[দর্শন, বিজ্ঞান, ও ধর্ম— এ তিনটির পার্থক্য]
দর্শন কী? এ প্রশ্ন বাংলাভাষী কাউকে করা বিপজ্জনক। যারা টকশো ও অধ্যাপনা করেন, তারা এ প্রশ্নের উত্তরে যা বলেন, তার বেশিরভাগই মুখস্ত এনসাইক্লোপিডিক বক্তৃতা। শুনলে মনে হবে, একটি ভাঙা রেলগাড়ি, তার পথ ও বগি হারিয়ে রওয়ানা দিয়েছে কোনো অন্ধকার অরণ্যের দিকে। দর্শন, বিজ্ঞান, ও ধর্ম— এ তিনটি ট্রেনই এ অঞ্চলে সবসময় ভুল যাত্রী নিয়ে ভুল স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে। এতে জ্বালানি পোড়ে ঠিকই, কিন্তু কোনো লক্ষ্য সাধিত হয় না। কেউই গন্তব্যে পৌঁছে জানাতে পারেন না, আমি আলোর দেখা পেয়েছি। এর প্রধান কারণ সম্ভবত— তিনটি বিষয়ই এখানে বেঁটে মানুষজন দ্বারা শাসিত। অর্থ, ক্যামেরা, ও খ্যাতি— এ তিনের পাকে পড়ে কাণ্ডারিরা এখানে সহজেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে অনিবার্যভাবে, এ অঞ্চলে দর্শন হয়ে উঠেছে লালন ফকির ও চাকুরিজীবীদের কর্মকাণ্ড। আমি বলছি না যে বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শনকে গ্রিক বা কন্টিনেন্টাল দর্শনের চশমা দিয়ে দেখতে হবে, কিন্তু বাউল গান ও উদাস ছড়াকবিতার সাথে দর্শনের যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে, সেটি অনুধাবন করা জরুরি। অন্যথায় সব তরলকেই পানি মনে হবে, এবং পান করার পর আফসোস করতে হবে— আহা, কেউ সতর্ক করলে হয়তো গড়লটি থেকে বাঁচা যেতো।
দর্শনের জন্ম কৌতূহল থেকে। যে-প্রাণী বুদ্ধিমান ও কৌতূহলী, যে-জীব দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু নিয়ে নিঃশঙ্কোচে প্রশ্ন তুলতে পারে, এবং জ্ঞানযোগে সুসংহতভাবে সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারে, তার কর্মকাণ্ডই দর্শন। আমি প্রজ্ঞাবান, প্রজ্ঞার প্রেমে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, আই অ্যাম ইন লাভ উইদ উইজডম, দর্শনের এ ধরণের সংজ্ঞা বিভ্রান্তিকর। কারণ সভ্যতা পিথাগোরাসের যুগে থেমে নেই। বাংলাদেশ বিশকোটি প্রজ্ঞাবানের দেশ, তাদের অনেকেই মুখ খুললে এখন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে প্রজ্ঞায়, বোধির ঝলকে উপচে পড়তে থাকে টেলিভিশন ও পত্রিকা, জার্গনের আঘাতে কাঁপতে থাকে ফেসবুক, তাই বলে কি আমি বলতে পারি, বাংলাদেশ বিশ কোটি দার্শনিকের দেশ? বলতে পারি না। চৌকিদারকে যেমন আমরা পুলিশ সুপার বলি না, তেমনি কেউ সারাক্ষণ নানা পূর্বসূরীর নাম নিলেই তিনি দার্শনিক হয়ে ওঠেন না।
দর্শন পথ সৃষ্টি করে, কিন্তু সে-পথ পথচারীকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে— তা দর্শন নিশ্চিত করে বলতে পারে না। সে পথ দেখায়, তবে ওই পথের শেষে ‘সত্য’ বা ‘সমাধান’ আছে কি না, থাকলে তার রূপ কী, সে-সম্পর্কেও কিছু বলে না। সে শুধু বলে, ওই দিকে যাও, ‘সত্য’ বা ‘সমাধান’ পাওয়া যেতে পারে। যদি পাওয়া যায়, তাহলে তা কিছু ক্ষেত্রে হয়ে উঠে বিজ্ঞান, কিছু ক্ষেত্রে প্রথা। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে ওই পথের প্রান্ত থেকে সৃষ্টি হয় আরও অনেক নতুন পথ। সরল করে বললে, দর্শন আমাদেরকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রচলিত ‘সত্য’ ও ‘সমাধান’ প্রত্যাখ্যান করে নতুন সত্য ও সমাধান নির্মাণ করতে বলে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও ধর্মের সাথে দর্শনের পার্থক্য হলো: ১) বিজ্ঞান সর্বদা প্রচলিত সত্যে স্থির থাকতে চায়, অথবা চাহিদা অনুযায়ী প্রচলিত সত্য ও সমাধানের উন্নয়ন ঘটিয়ে ‘অধিকতর গ্রহণযোগ্য সত্য ও সমাধান’ উদ্ভাবন করে; ২) ধর্ম তার সুবিধা ও মতলব অনুযায়ী সত্যের রূপ নির্দিষ্ট করে দেয়, যার বাইরে ধর্ম অনুসারীদের চিন্তা করার কোনো সুযোগ থাকে না।
ফলে বলা যায়, দর্শন বিজ্ঞানকে পথ দেখাতে পারলেও ধর্মকে পারে না। কারণ ধর্মের ধর্ম হলো সারাক্ষণ একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির হয়ে থাকা। আসন ছাড়লেই এর বিলুপ্তি ঘটে। ধর্ম যদি বলে, ওই পুকুরে একটি তিমি মাছ আছে, তাহলে ধার্মিকের পক্ষে ওই তিমি মাছটিকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু দর্শনে এ স্থিরতা নেই। দর্শন গতিশীল ও প্রবাহমান। দর্শন যখন স্থির হয়ে পড়ে, তখন তা আকার ধারণ করে ধর্ম ও রাজনীতিক দলের। গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীরের দর্শন এখন ধর্ম হয়ে গেছে, যেরকম মার্ক্সের দর্শন পরিণত হয়েছে রাজনীতিক লিফলেটে। সুতরাং এক অর্থে বলা যায়, অন্ধ অনুসারী বা মুরিদ নয়, দার্শনিকের প্রধান কাজ সমাজে নতুন দার্শনিক তৈরি করা, যারা তার মতামতকে এগিয়ে নেবেন সামনের দিকে, অথবা বিকল্প মতামত দ্বারা চ্যালেঞ্জ করবেন বিদ্যমান মতামতকে। থ্যালিস যখন বললেন, সবকিছুর উদ্ভব পানি থেকে হয়েছে, তখন তাঁর ছাত্র এনাক্সিম্যান্ডার বললেন— পানি নয়, সবকিছুর উদ্ভব ঘটেছে আপিরোন থেকে। কিন্তু এনাক্সিম্যান্ডারের ছাত্র আনেক্সিমিনিস প্রচার করলেন নতুন কথা। তিনি বললেন, পানি নয়, সবকিছুর জন্ম বাতাস থেকে। তবে বাতাসও বেশিদিন টেকে নি। হেরাক্লিটাস এসে বললেন, মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে আগুন থেকে। এভাবে আমরা হেরাক্লিটাস থেকে জেনোফেন, জেনোফেন থেকে পিথাগোরাস, পিথাগোরাস থেকে পার্মেনিডিস, পার্মেনিডিস থেকে জেনো, জেনো থেকে ইমপেডোক্লিস, ইমপেডোক্লিস থেকে এনাক্সাগোরাস, এবং এনাক্সাগোরাস থেকে লুসিপাস-এ এসে জানলাম— মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে পরমাণু দিয়ে। লুসিপাস বললেন, সবকিছুই অবিভাজ্য ছোট ছোট কণা দ্বারা গঠিত। ডেমোক্রিটাসও বললেন, হ্যাঁ, চারপাশে যা কিছু আমরা দেখি, তার সবই পরমাণু ও শূন্যস্থান।
জ্ঞান ও সত্য সন্ধানের এই যে নিরবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, নির্ভীক সংগ্রাম, যা পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে থ্যালিস থেকে এসে পৌঁছোলো ডেমোক্রিটাস পর্যন্ত, এটিই দর্শন। থ্যালিসদের কর্মকাণ্ডকে ২০২২ সালে এসে আমাদের কাছে খুব তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু মানুষের যা রেকর্ডেড ইতিহাস, তাতে থ্যালিসদের ওই ক্ষুদ্র প্রশ্নটি, অর্থাৎ ‘আমরা যা দেখি, তা কী দিয়ে তৈরি?’— এটি থ্যালিসদের আগে আর কারও মনে এমন তীব্র শক্তিতে উদয় হয় নি। সবাই যখন দেব-দেবী নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, নিঃশর্ত সমর্পণ ছাড়া আর কোনো ভাবনা যখন কারও মনে ছিলো না, তখন প্রাচীন গ্রীসে হঠাৎ একদল মানুষ দেখা দিলো, যারা হুট করে চারপাশের সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলো, এটি মহাবিস্ময়কর ঘটনা। কী দরকার ছিলো প্রশ্ন করার? কীসের তাড়না তাদেরকে উস্কে দিয়েছিলো জ্ঞান ও সত্যের তালাশের দিকে? কেন জেনোফেন একদিন বলে বসলেন, দেব-দেবীর উপাসনা করা অর্থহীন, এদের আচরণ অযৌক্তিক, ঘোড়ার যদি হাত থাকতো, তাহলে সে ঘোড়ার মতোই দেখতে একটি দেবতার ছবি আঁকতো? সম্ভবত তাদের ভেতর জন্ম নিয়েছিলো হঠাৎ এমন কোনো বোধ, যা স্থির ধর্মীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে পায়ে মাড়িয়ে উঁকি দিয়েছিলো মুক্ত আকাশে। এ বোধ, এ কৌতূহলই দর্শন, যা প্রাচীন মিশরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের ছিলো না। গণিত, জ্যামিতি, ও জ্যোতির্বিদ্যায় অসাধারণ দক্ষতা থাকার পরও, শতকের পর শতক ধরে ধর্মতন্ত্রে স্থির থাকায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক চিন্তা মিশর ও ব্যাবিলনে ছড়াতে পারে নি। কারণ ধর্মতন্ত্রে নিয়ম হলো— গতকালের সত্যই আজকের সত্য। কোনো নতুন সত্য উদ্ভাবনের সুযোগ এখানে নেই। গতকাল কেউ সূর্যের পূজা করলে, আজকেও তাকে সূর্যের পূজাই করতে হবে— এই ছিলো মিশর ও ব্যাবিলনের নিয়ম। এ নিয়ম ভাঙার সাহস কেউ করে নি। কিন্তু গ্রিক মাইলেসিয়ানরা এ নিয়ম ভেঙেছিলো। একটি ছোট প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে তারা সূচনা করেছিলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবিপ্লবটির, যেটিকে আমরা এখন দর্শন বলি।
দর্শন ধারণা দেয়, আর বিজ্ঞান সে-ধারণাকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে স্থিরতা দান করে। আইনস্টাইন যখন বললেন যে, আলো খুব ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকা পথ অনুসরণ করে, সোজা পথ অনুসরণ করে না, তখন তা ছিলো দর্শন। কিন্তু এডিংটন যখন পর্যবেক্ষণযোগে প্রমাণ করলেন যে, আলো সত্যি সত্যিই সূর্যের মতো ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেঁকে যায়, ইউক্লেডীয় সরল জ্যামিতিক পথ সে অনুসরণ করে না, বরং স্থান-কালের বক্র জিওডেসিক পথ অনুসরণ করে, তখন তা হয়ে গেলো বিজ্ঞান। অর্থাৎ কোনো জ্ঞান বা ধারণা যতোক্ষণ পর্যন্ত অনিশ্চিত, ততোক্ষণ পর্যন্ত তা দর্শন। কিন্তু যখনই তা কানজেকচার বা স্পেকুলেশন থেকে পরিণত হয় নিশ্চিত জ্ঞানে, তখনই তা রূপ ধারণ করে বিজ্ঞানের। হিগস কণা একসময় দার্শনিক স্পেকুলেশনের অংশ হলেও, ২০১২ সালের পর তা পরিণত হয়েছে প্রমাণিত বা প্রচলিত সত্যে। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, সবার ক্ষেত্রেই এটি ঘটেছে। তবে দর্শন কেবল ন্যাচারাল ফিলোসোফি বা বিজ্ঞান-উৎপাদক দর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ন্যাচারাল ফিলোসোফি দর্শনবৃক্ষের অনেকগুলো ডালপালার একটি ছোট অংশ মাত্র।
প্রশ্ন জাগতে পারে, দর্শনের ব্যাপ্তি তাহলে কী? দর্শন কী নিয়ে কাজ করে?
দর্শন ‘সবকিছু’ নিয়েই কাজ করে। কোনো প্রাণী তার চারপাশকে কীভাবে দেখছে ও শুনছে, বাস্তবতাকে সে কী প্রক্রিয়ায় অনুভব ও অনুধাবন করছে, কোনো বিষয়ে মানুষ কী উপায়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সমাজে তার আচরণ কেমন, রাষ্ট্রের সাথে মানুষের সম্পর্ক কী, কোনো আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্কের বৈধতা কী উপায়ে নির্ধারিত হয়, পদার্থ ও শক্তির অস্তিত্ব আছে কি না, সময়ের সাথে স্থানের সম্পর্ক কী, মহাবিশ্বের সংখ্যা কতো, গণিত ও জ্যামিতির ভিত্তি কী, ঈশ্বর বলে কোনো কিছু আছে কি না, আইন কখন আইন হয়ে ওঠে, শিক্ষাপদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত, মানুষের মনের আসল রূপ কী, ভাষা কীভাবে কাজ করে, বৈজ্ঞানিক সত্যের সীমাবদ্ধতা আছে কি না, ধর্মের ভিত্তি কী, মানুষের জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা কতোখানি, রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন হওয়া উচিত, সত্য-মিথ্যা ভালো-মন্দ কী রূপে নির্ধারিত হয়, জীবনের কোনো মানে আছে কি না, অপরাধ ও শাস্তি কী জিনিস, মানুষকে কী রূপে শাসন করা উচিত, এ সমস্ত কিছুই দর্শনের কর্মক্ষেত্র। দর্শন সবকিছুকেই পথ দেখায়। আবার কোথাও যে পথ নেই, সেটিও দেখায়। মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় নিয়েই সে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা রাখে। প্রশ্নহীন গুরু-শিষ্যবাদ ও পীর-ফকিরি প্রথার কোনো স্থান দর্শনে নেই।
ভৌগোলিক বৈচিত্রের মতোই দর্শনে দেখা দিয়েছে নানা অঞ্চল ও সমাজভিত্তিক বৈচিত্র। পৃথিবীর একেক অঞ্চলে মানুষ একেক সময়ে অবতারণা করেছে একেক দর্শনের। প্রাচীন গ্রীস ও প্রাচীন চীনের মানুষের চিন্তাপদ্ধতির সাথে প্রাচীন ভারতের মানুষের চিন্তাপদ্ধতি মিলবে না। আরব অঞ্চলের মানুষ যে-প্রক্রিয়ায় চিন্তা করেছে, আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষ সে-প্রক্রিয়ায় চিন্তা করে নি। আবার আমি যে-প্রক্রিয়ায় চিন্তা করছি, তার সাথে মধ্যযুগ ও আঠারো শতকের ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তাপদ্ধতি মিলবে না। চিন্তার এ বৈচিত্র দর্শনে সব স্থানে সব কালেই ছিলো। ভাষা ও সভ্যতার বৈচিত্র আমলে নিলে, দর্শনের এ বৈচিত্রকেও একটি স্বাভাবিক পরিণতি হিশেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।
—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
(‘বিশ্বসাহিত্য ভাষণ / দর্শন খণ্ড’ থেকে)