16/07/2026
||কেন এই রথযাত্রা হয়||
কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন এই রথযাত্রা হয়? কেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নাথ, স্বয়ং জগন্নাথ দেব তাঁর রাজকীয় গর্ভগৃহ ছেড়ে বড় ভাই বলরাম আর ছোট বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসেন? কেনই বা তিনি প্রতি বছর নিয়ম করে মাসির বাড়ি যান? চলুন আজ কোনো কৃত্রিম ছক ছাড়া, একেবারে মনের আঙিনা থেকে জেনে নেওয়া যাক এই উৎসবের আসল ইতিহাস আর গভীর তাৎপর্য।
রহস্যময় মূর্তি ও রথযাত্রার সূচনা
প্রাচীন ওড়িশার পুঁথি আর পুরাণ অনুযায়ী, এই রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল বহু যুগ আগে, সত্যযুগে。 মালবদেশের পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্ন পেয়েছিলেন যে ভগবান বিষ্ণু সমুদ্রের জলে ভাসমান এক বিশেষ কাষ্ঠখণ্ড বা দারুবৃক্ষ রূপে আবির্ভূত হবেন। রাজা সেই পবিত্র কাঠ উদ্ধার করার পর মূর্তি গড়ার জন্য এক রহস্যময় বৃদ্ধ কাষ্ঠশিল্পী উপস্থিত হন, যিনি আসলে ছিলেন স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। তবে তাঁর একটি কঠিন শর্ত ছিল—একুশ দিন তিনি বন্ধ ঘরের ভেতর একা কাজ করবেন, আর এই সময়ে কেউ যেন সেই ঘরের দরজা না খোলে।
কিন্তু ভেতরের ঠকঠক শব্দ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রানীর চরম ব্যাকুলতায় ১৫ দিনের মাথায় ঘরের দরজা খুলে ফেলা হয়। দরজা খুলতেই দেখা গেল বৃদ্ধ শিল্পী উধাও, আর পড়ে আছে হাত-পা বিহীন, বড় বড় চোখ ওয়ালা তিনটি অর্ধসমাপ্ত মূর্তি। রাজা তো গভীর অনুশোচনায় ভেঙে পড়লেন। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তিনি ভক্তের ভালোবাসার এই ব্যাকুল রূপেই জগতবাসীর কাছে প্রকাশ পেতে চান。 এই ভাবেই পুরীতে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার প্রতিষ্ঠা হলো এবং রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে স্বয়ং ভগবান এই রথযাত্রা শুরু করার আদেশ দিয়েছিলেন。
উপরিউক্ত দৃশ্যটি লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, কীভাবে একটি উৎসব লাখো মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। এই বিশাল কাঠের রথ এবং তাকে ঘিরে থাকা মানুষের এই আকুলতাই হলো রথযাত্রার মূল প্রাণশক্তি, যা বছরের পর বছর ধরে একই ভাবে জীবন্ত রয়েছে।
কেন এই মাসির বাড়ি যাত্রা?
রথযাত্রার মূল কারণটি যেমন পারিবারিক, তেমনই আবার আধ্যাত্মিক ভালোবাসায় মোড়া। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, রথযাত্রা হলো জগন্নাথ দেবের তাঁর জন্মস্থান বা মাসির বাড়ি যাত্রা। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রানী গুণ্ডিচার গভীর ভক্তির কারণে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কথা দিয়েছিলেন যে তিনি বছরে একবার তাঁর প্রাসাদে আসবেন。 সেই রানী গুণ্ডিচার নামানুসারেই এই মন্দিরের নাম গুণ্ডিচা মন্দির。 জগন্নাথ দেব তাঁর ভাই ও বোনকে নিয়ে এই গুণ্ডিচা মন্দিরে মোট সাত দিন কাটান। যাওয়ার দিনটিকে আমরা বলি সোজা রথ আর সাত দিন পর নিজের মন্দিরে ফিরে আসার দিনটিকে বলি উল্টো রথ বা বাহুড়া যাত্রা।
আবার বৈষ্ণব দর্শনের দিকে তাকালে এর একটি চমৎকার মানবিক অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। দ্বারকার ঐশ্বর্য আর রাজকীয় জাঁকজমকের মাঝে থেকেও শ্রীকৃষ্ণের মন সবসময় পড়ে থাকত তাঁর ছোটবেলার দিনগুলোতে, সেই বৃন্দাবনের রাখাল বালক আর ব্রজবাসীদের নিটোল ভালোবাসার টানে。 রথযাত্রা হলো শ্রীকৃষ্ণের সেই দ্বারকার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে শ্রীধাম বৃন্দাবনে ফিরে যাওয়ার এক পরম প্রতীকী রূপ। ভক্তরা যখন রথের দড়ি টানেন, তারা আসলে ভগবানকে তাঁদের নিজেদের হৃদয়ের বৃন্দাবনে টেনে নিয়ে যান。
সাম্য ও ঐক্যের এক অনন্য বার্তা
এই উৎসবের সবচেয়ে বড় বিউটি কিন্তু লুকিয়ে আছে এর সামাজিক বার্তার মধ্যে। প্রাচীন কালে সাধারণ মানুষের জন্য মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে নানা সামাজিক বাধা ছিল। কিন্তু রথযাত্রার দিন ভগবান নিজেই মন্দির থেকে সাধারণ মানুষের ধুলোবালির রাস্তায় নেমে আসেন। তিনি তখন আর শুধু মন্দিরের বদ্ধ দেবতা নন, তিনি হয়ে ওঠেন পতিতপাবন—যিনি সবার দুঃখ হরণ করতে নিজে এগিয়ে আসেন。 এখানে কোনো ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই, কোনো জাত-পাতের বিচার নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে একই দড়িতে টান দিয়ে রথ এগিয়ে নিয়ে যান。
এমনকি পুরীর পরম শক্তিশালী রাজাকেও এই বিশেষ দিনে সাধারণ সেবকের মতো রথের সামনে সোনার ঝাঁটা দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে হয়, যাকে বলা হয় ছেরা পহরা。 এই প্রথাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বরের দরবারে ক্ষমতা বা অহংকারের কোনো মূল্য নেই, সেখানে একজন রাজা আর একজন সাধারণ মানুষ একদম সমান。
ছোটবেলার সেই কাদা মাখা রাস্তায় আলতো করে কাঠের রথের দড়ি টানার আনন্দ আর আজকের দিনে পুরীর সেই লাখো মানুষের জনসমুদ্র, সবকিছুর মূলে রয়েছে ঈশ্বরের প্রতি মানুষের এক চিরন্তন টান। এই রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে আপনার ছোটবেলার কোনো বিশেষ স্মৃতি কি খুব মনে পড়ছে? মেলা থেকে কেনা সেই মাটির আলতা-বাটি বা পাঁপড় ভাজার গল্প কমেন্ট বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন, আর এই সুন্দর ইতিহাসটি বন্ধুদের জানাতে পোস্টটি শেয়ার করতে ভুলবেন না।