11/01/2026
২০১৯ সালের জুন মাসের দুই তরিখে বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের লাইভ স্কোরকার্ড বাংলায় দেবার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় খেলাহবের। তারপর একে একে পাড়ি দিতে হয় অনেক সংকট। কখনো কোভিডের ভয়াল থাবা থামিয়ে দেয় পুরো বিশ্বকে, আবার কখনো অর্থনৈতিক সংকট এসে বাঁধাগ্রস্ত করে আমাদের পথচলাকে। আমাদের যে কেবল নির্মম বাস্তবতা এসেই আটকে দিয়েছে তাই নয়, অনেক সময়ে নিজেদের ক্লান্তি আর দ্বিধাও আগলে ফেলেছে আমাদের অগ্রযাত্রাকে! তবে "খেলা হবে" নামটির স্পর্ধাই বারংবার খেলায় নামিয়েছে আমাদের। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন এক উচ্চতায় উঠিয়ে নেওয়ার যুগ-যুগান্তের স্বপ্ন কখনোই পিছু ছাড়েনি আমাদের। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট অন্য যেকোন সময়ের থেকে আলাদা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে প্রবেশ করায় নতুন এক বাস্তবতার দোলাচলে। একদিকে আমরা দেখি প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের ঐতিহাসিক অর্জন, অন্যদিকে আবকাঠামোগত দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার নতুন এক স্তর আমাদের ক্রিকেটকে ফেলে নিত্যনতুন সংকটের মুখে। আবার বিস্ময়ের সাথে আমরা এটাও পর্যবেক্ষণ করি যে, যেকোন ক্রান্তিলগ্নে আগের যে কোন সময়ের থেকে দৃঢ়ভাবে একাট্টা হয় বাংলাদেশের ক্রিকেট সমাজ। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র সাকিব আল হাসানের নাটকীয় ক্যারিয়ারের সমাপ্তি যেমন আটকে যায় নতুন কোন বন্দোবস্তে, তেমনি বিপিএলের অব্যবস্থাপনা আমাদের মুখ লুকাতে বাধ্য করে ক্রিকেট বিশ্বের অগ্রসরমাণ সমাবেশে। আর এতসব ডামাডোলের মাঝে আমরা নিজেরাই খেই হারিয়ে এগিয়ে চলি নিশ্চিত বিস্মৃতির পথে।
কিন্তু তখন ঘটে এক মোড় ঘুরানো ঘটনা। প্রিয় স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হয়েও, শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও নিজের ভক্ত-সমর্থকদের আশাবাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মাঠে ফিরে আসেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সব থেকে বড় মুখপাত্র সাকিব আল হাসান! লাহোর কালান্দারের হয়ে পেশাওয়ার জালমির বিপক্ষে সাকিবের ফেরাটা টাইগার অন্ধভক্তদের দেয় নতুন এক আত্মবিশ্বাস। যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে আমাদেরও! সাকিব যদি পারেন, তবে আমরা কেন নয়, এই মূলমন্ত্র জপতে জপতে আমরাও ফেরত আসি একদফা। সেই ফিরে আসাটা ধ্রুবতারার মতো ভরসা জাগানিয়া ছিলো না, বরং অন্ধকার রাতের আকাশের শত-সহস্র উল্কাপিন্ডের মতোই ছিলো ক্ষণিকের! যেন চোখ একটু অন্যদিকে সরালেই আজন্ম অদেখাই থেকে যাবে তার অস্তিত্ব।
এবার আমরা লিখতে এসেছি নতুন ইতিহাস। এবার আর আমরা কাঠপেন্সিলের দেহের মতো ক্ষয়ে যাবো না, আমরা বল পয়েন্ট কলমের সীমিত জীবনের মতো ঝরে পরবো না। বরং ফাউন্টেনপেনের কালি শেষ হয়ে গেলেও আবার যেমন কালি ভরে সেটিকে পুনর্জীবন দেওয়া যায়, আমরা হবো বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেই ফাউন্টেনপেন। এবার আর আমরা মাঠ ছাড়বো না, খেলা শেষ হবার একবল আগেও নিশ্চিত পরাজয়ের চোখরাঙানি আমাদেরকে দমিয়ে ফেলতে পারবে না। মহাকালের যাবতীয় অনিশ্চয়তাকে আমরা তাই মহাকালের হাতেই ছেড়ে দিলাম, আর স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলাম দেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে শাসন করার পর্যায়ে নিয়ে যাবার ঔদ্ধত্য!
২০১১ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একর পর এক বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেটাররা রিকশায় করে এসে মঞ্চে উঠছিলেন। সবার শেষে এসেছিলেন কে বলুন তো? হ্যাঁ, সাকিব আল হাসান। প্রতীকী সেই মুহুর্তটি আমাদের ক্রিকেটের আজন্ম লালিত সেই স্বপ্নকেই মঞ্চায়িত করেছিল একটিবারের জন্য। সেই মঞ্চায়ন কোন একদিন বাস্তবায়িত হবেই। সেদিন কি আমরা থাকবো? বা থাকবে কি আমাদের খেলা হবে? আজ রাতের এই পোস্টটি কি হারিয়ে যাবে হাজারো অলীক স্বপ্নের মতো? ঐ যে বললাম, মহাকালই তা আমাদের জানিয়ে দেবে! প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার আত্মজৈবনিক বই "ফাউন্টেনপেন" উৎসর্গ করেছিলেন সাকিবকে। হুমায়ূন নিজেও কি জানতেন এই তরুণ একদিন শাসিয়ে বেড়াবে পুরো ক্রিকেটপাড়াকে? তিনি কি জানতেন কোন একদিন ক্রমশ ম্রিয়মাণ সাকিবের হার না মানা মানসিকতাই আগুন ধরিয়ে দেবে আমাদের একরত্তি আশাকে?
হয়তো জানতেন না। তবে হুমায়ূন আহমেদ তার লেখনীতে ঠিক যেমনটি বলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবেই অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চাই আমরা। সেথানে আমরা হবো ফাউন্টেনপেন, কালি ফুরিয়ে গেলেও নতুন কালিতে, নতুন রঙে আমরা ফিরবো বারবার। এবার কালি ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে আর আমাদের ভাবান্তর নেই। মহাকাল যদি আমাদের লেখার খাতা ছিঁড়ে না ফেলে, কিংবা আমাদের কলমের মাথা গুঁড়িয়ে না দেয়, তবে আমরা লিখেই যাবো। হয়তো একদিন আমাদের হাত স্তব্ধ হয়ে যাবে, আমাদের চোখের আশা মিলিয়ে যাবে। তবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের ক্রিকেটই হলো সেই ফাউন্টেনপেন, যে কখনো থেমে যায় না। বারবার নতুন কালিতে লিখতে আসে ইতিহাসের নতুন কোন অধ্যায়!
ছবি: ফাউন্টেনপেন বইয়ের উৎসর্গপত্র
ক্রেডিট: সাজিয়া
লাইসেন্স: CC-BY-SA 4.0