23/07/2017
উড়তে শেখা: বেলুন আবিষ্কার
ফয়সাল আকরাম ইথার
bdnews24.com
জন্ম থেকেই মানুষের আকাঙ্ক্ষা উপরে ওঠার, উন্নতি করার। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ একদিন ভেবে বসল, আচ্ছা তাহলে আমরা মাটিতে কী করি? আমাদের আকাশে ওঠা দরকার না? পাখির মতো? তখন কেউ ইকারুসের মত গায়ে মোম দিয়ে পাখা লাগিয়ে উঠতে চাইল আকাশে কেউ বা অন্য কোনো পন্থায়।
মানুষের উড়তে শেখার শুরুটা তাই একদিনে হয়নি। হার না মানা মানুষের আকাশে ওঠার আবিষ্কারের গল্প প্রায় দুশো বছর ধরে। কখনও হামাগুড়ি দিয়ে আবার কখনও লাফিয়ে লাফিয়ে আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে উড়তে শেখার পথে। আজকের লেখা সেই লাফ দেওয়ার মতোই এক আবিষ্কারের এবং সে আবিষ্কারের নায়ক দুই আপন ভাইকে নিয়ে।
না, ভেবো না আমি রাইট ব্রাদার্সের কথা বলছি। এই দুই ভাই, সেই দুই ভাই না। এদের পরিবারের নাম মন্টগলফিয়ার। এরা হলেন মন্টগলফিয়ার ভাইয়েরা। রাইট ব্রাদার্স যেমন আবিষ্কার করেছিলেন আকাশে উড়ার প্লেনের, এই দুই ভাই আবিষ্কার করেছিলেন আকাশে উড়ার বেলুনের। বড় ভাই এর নাম জোসেফ মন্টগলফিয়ার (Joseph-Michel Montgolfier)। তিনি একটু আবেগপ্রবণ, স্বপ্ন দেখতে ভালবাসতেন। ছোট ভাই এর নাম ইতিএন মন্টগলফিয়ার (Jacques-Étienne Montgolfier)। তার আবার ব্যবসায়িক বুদ্ধি বেশি।
তারা দুজনই বাবার কাগজের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ইতিএন মন্টগলফিয়ার এর ব্যবসায়িক বুদ্ধির কারণে অল্পদিনের মধ্যেই তাদের কাগজের ব্যবসা বেশ বড় হয়ে উঠেছিল। একদিন ফায়ারপ্লেস এর আগুনের ধারে বসে ছিলেন জোসেফ মন্টগলফিয়ার। ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা শার্ট শুকাতে দেওয়া ছিল। জোসেফ খেয়াল করলেন, আগুনের তাপে শার্টের পকেট ফুলে উঠে উপরে উঠে গেল। জোসেফ ভাবলেন, আগুন থেকে একটা বিশেষ গ্যাস বের হচ্ছে নিশ্চয়ই। তিনি এই গ্যাস এর নাম দিলেন 'মন্টগলফিয়ার গ্যাস'।
ব্যাপারটা আরও ভালোমতো বোঝার জন্য, জোসেফ একটি তিন ফিট বাই তিন ফিট এর কাগজের বাক্সের মত জিনিষ বানালেন। তার নিচে আগুন আনলেন আর বাক্স গেল উড়ে । খুশিতে জোসেফ তার ছোটভাইকে চিঠি লিখলেন বাড়ি আসার জন্য। ছোটভাই ইতিএন সাথে সাথে জিনিষপত্র নিয়ে হাজির। দুই ভাই মিলে শুরু করলেন তাদের গবেষণা। দুজন মিলে একই রকম কিন্তু তিনগুণ বড় আর একটা বাক্সের মত জিনিস বানালেন আর তার তলায় আগুন রাখলেন। ফলাফল হল আগের মতোই। উড়ে গেল সেগুলো।
দুই ভাই যখন নিশ্চিত হলেন যে তাদের বানানো বেলুন কাজ করে; তখন তারা ঠিক করলেন, এবার ব্যাপারটাকে সবার সামনে আনতে হবে। নাহলে আবিষ্কারক হিসাবে ইতিহাসে তাদের নাম লেখা হবে না। তাই তাদের এই চেষ্টার ফল দেখাতে ১৭৮৩ সালের ৪ঠা জুনে ফ্রান্সের এনোনে (Annonay) শহরে প্রথম গরম বাতাসের বেলুন আকাশে উড়ল। সেদিনই তাদের এই আবিষ্কারের কথা ছড়িয়ে গেল সারা ফ্রান্সে।
এদিকে একই সময়ে প্যারিসে আবির্ভাব হয়েছে আরেক রকম উড়তে শেখার আবিষ্কারকের বেলুন। যার নাম 'হাইড্রোজেন বেলুন'। জেকুয়েস চার্লস (Jacques Charles) নামের একজন ফ্রেঞ্চ কেমিস্ট এবং আবিষ্কারক ভেবে দেখলেন হাইড্রোজেন গ্যাস একটি ভাল উড়তে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এই গ্যাস ব্যাবহার করে কিভাবে 'হাইড্রোজেন বেলুন' বানানো যায় তা তিনি জানতেন না। তাই উনি দ্বারস্থ হলেন আরেক দুই ভাই রবার্ট ভাইদ্বয়ের। এনি জিন রবার্ট (Anne-Jean Robert ) আর নিকলাস লুইস রবার্ট (Nicolas-Louis Robert) এই দুই ভাই মিলে জেকুয়েস চার্লস এর জন্য 'হাইড্রোজেন বেলুন' বানানো শুরু করলেন তাদের প্যারিস এর ওয়ার্কশপ-এ।
জেকুয়েস চার্লস আর রবার্ট ভাইয়েরা তাদের 'হাইড্রোজেন বেলুন' এর প্রথম প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিলেন ১৭৮৩ সালের ২৭ অগাস্ট। তাদের জায়গাটা ছিল এখন যেখানে আইফেল টাওয়ার দাড়িয়ে আছে, প্যারিস এর ঠিক সেই জায়গাটা। তখন সে জায়গার নাম ছিল 'শেম্প দে মারস' । মজার ব্যাপার হল, তাদের প্রদর্শনী দেখতে যারা এসেছিল, সেই ভিড় এর মধ্যে ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনও।
জেকুয়েস চার্লস আর রবার্ট ভাইয়েরা সফলভাবে তাদের 'হাইড্রোজেন বেলুন' উড়ালেন। এই বেলুনের নাম ছিল 'লে গ্লোব' । 'লে গ্লোব' ছিল পঁয়ত্রিশ কিউবিক মিটারের রাবারের সাথে সিল্ক মিশিয়ে তৈরি। এটি প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট উড়ে প্যারিস থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে গনেস (Gonesse) গ্রামে গিয়ে পড়েছিল। গ্রাম এর লোকজন তো এ জিনিস তাদের জীবনে কখনো দেখেনি তাই বেলুনটা মাটির কাছাকাছি আসলে যার যা ছিল সব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরেছিল বেলুনের উপর। তারা ভেবেছিল গ্রামে শয়তান এসেছে।
এখানে আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, 'হাইড্রোজেন বেলুন' এর আবিষ্কারক জেকুয়েস চার্লস ছিলেন মন্টগলফিয়ার ভাই দের 'হট এয়ার বেলুন' প্রজেক্ট এর অন্যতম স্পন্সর। তারা একে অন্যকে সাহায্য করছিলেন বিভিন্নভাবে । তখনকার ফ্রান্সের রাজাও এই তিনজনের কাজের প্রতি নজর রাখছিলেন। দুই প্রকার বেলুনেরই মানুষ ছাড়া সফল উড্ডয়নের পর দুদলই রাজার কাছে প্রস্তাব করলেন যে তারা এবার মানুষ সহ বেলুন উড়াতে চান। সে আরেক মজার গল্প। ওটা না হয় আর কোনোদিন উড়তে উড়তে করা যাবে। আজ উড়তে শেখা থাক এ পর্যন্তই।