16/09/2020
সাফ চ্যাম্পিয়ানশীপ ২০০৩: বাংলাদেশের স্বপ্নের আসর
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। রেসকোর্সের উত্তপ্ত ময়দানে শেখ মুজিবের বিদ্রোহী কন্ঠে "যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো" শুনে অনেকেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিলেন জার্সি গায়ে ফুটবল নিয়ে।" স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নামের সেই দলের গল্পটা আমাদের সবার জানা। এতো বছর পরও তাদের কথা মনে হলে গর্বে বুক ভরে উঠে। স্বাধীনতার এক বছর পর ১৯৭২ এ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ফিফার সদস্য পদ লাভ করে ১৯৭৪ সালে। ফুটবলে বাংলাদেশের তেমন একটা সফলতা নেই। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার কাছে ফুটবল কখনো মাথা উচু করে দাড়াতে পারেনি একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে। তবে একসময় আবাহনী-মোহামেডান দ্বন্ধে পুরো জাতি দুই ভাগ হয়ে যেতো। ৮০ বা ৯০ এর দশকে গ্যালারী ভর্তি দর্শক থাকতো মাঠে। সেই দিনগুলো এখন অতীত। ক্রিকেটের পেছনে যেভাবে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে সেটার এক তৃতীয়াংশ গুরুত্ব দেওয়া হয়না ফুটবলে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গর্ব কাজী সালাউদ্দীনের দুর্নীতিতে গত এক যুগে দেশের ফুটবল নিজের রং হারিয়েছে। নেমে এসেছে অন্ধকার। বর্তামনে ফিফা র্য্যাংকিংয়ে ২১০ দেশের মধ্যে আমরা ১৯০ তম। ফুটবলে বাংলাদেশের গর্ব করার মতো বেশি কিছু না থাকলেও এদেশের মানুষের হৃদয়ে আছে ফুটবল। স্বাধীনতার এতো বছর হয়ে গেলেও আমাদের ফুটবলে সফলতার গল্প খুবই সংক্ষিপ্ত। সাফ গেমসে চ্যাম্পিয়ান হওয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু নেই আমাদের ফুটবল ইতিহাসে। ১৯৮০ সালে সালাউদ্দীন, মোনেম মুন্না, বাদল, মোর্শেদিদের হাত ধরে এশিয়া কাপের মূলপর্বে খেলেছিলো বাংলাদেশ৷ এর পরবর্তী প্রজন্মের আমিনুল, মুন্না, কাঞ্চন, রজনী, আরিফ খান জয়, আলফাজদের হাত ধরে জিতেছে সাফ চ্যাম্পিয়ানশীপের ফাইনাল।
ক্লাব ফুটবলে বার্সা, রিয়াল, বায়ার্ন, পিএসজি জুভেন্টাস, লিভারপুল, ইউনাইটেড, চেলসি, মিলান কোন দলের বা লীগের খেলা এ দেশের মানুষ রাত জেগে দেখে না? প্রিয় দলের হারে কত রাতে অশ্রু ঝরেছে এদেশের ফুটবল প্রেমীদের সেটা কেউ কখনো টের পাবে না। বাংলাদেশে তো সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় বিশ্বকাপ ফুটবলে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বিতর্কে রক্তক্ষয়ী
সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে এদেশে। বিশ্বকাপ এলে পতাকা, ব্যানারে চেয়ে যায় পুরো দেশ। প্রিয় দলের খেলায় ৯০ মিনিট হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে চলতে থাকে সবার। চায়ের দোখান থেকে অফিস সব জায়গায় চলে ফুটবলীয় আলোচনা। প্রিয় দলের পতাকার রংয়ে বাড়ি, গাড়ি সাজানো বাঙ্গালীর প্যাশন এখন৷ ২০১৪ বিশ্বকাপে এক জার্মান ফ্যান কয়েক কিলোমিটার পতাকা লাগিয়ে অবাক করে দিয়েছিলো বিশ্বকে। তাকে সম্মাননা দিতে জার্মান ফুটবলের এক বড় কর্তা বাংলাদেশে এসে চারিদিকে
এতো পতাকা ও ব্যানার দেখে বলেছিলো, "আমার মনে হচ্ছে বাংলাদেশে খেলা হচ্ছে বিশ্বকাপ।" বাংলাদেশে বর্ষাকাল ঋতু জনপ্রিয়তো শুধু ফুটবলের জন্য। বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা কাঁদা মেখে গ্রামে, হাওরে বা শহরের ছোট গলিতে ফুটবল নিয়ে মেতে উঠা আমাদের স্বভাব।
ফুটবল হৃদয়ে ধারন করা সেই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি আসে ২০০৩ সালে। ২০০৩ এ সাফ ফুটবলের দশম আসর বসে ঢাকায়। টুর্নামেন্টটি ২০০২ এ অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের উপর ফিফার স্থগিত আদেশ থাকায় এক বছর দেরিতে আসরটির পর্দা উঠে। এএফসির অনুরোধে সেই বছর যোগ হয় নতুন দলে আফগানস্থান। প্রথম বারের মতো সাফ ফুটবল খেলতে আসে ভূটান। টুর্নামেন্টের সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু
জাতীয় স্টেডিয়ামে। "এ গ্রুপে" ছিলো ভারত, পাকিস্তান,
শ্রীলঙ্কা, আফগানস্থান। "বি গ্রুপে" স্বাগতিক বাংলাদেশির সঙ্গী ছিলো মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান। ২০০৩ সালের দশ জানুয়ারি ঢাকায় এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দশ দিনের জন্য পর্দা উঠে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের।
বাংলাদেশের কোচ জর্জ কোটান ডিফেন্সিভ ভাবে খেলাতেন দলকে। সেই আসরে তার ফর্মেশন ছিলো ৫-৩-২। তবে খেলা শুরুর পর সেটা হয়ে যেতো ৩-৫-২ ফর্মেশনে। কারন রাইট ব্যাক ও ল্যাফট ব্যাক হাসান ও বাবু উপরে উঠে খেলতেন। ডিফেন্সে অধিনায়ক রজনী কান্তের সঙ্গী ছিলেন সুজন ও নজরুল। দলের প্রাণভোমরা ছিলো মাঝমাঠের আরিফ খান জয় ও মতিউর মুন্না৷ গেম প্ল্যান সাজানো হতো দলের মেইনম্যান আরমানকে কেন্দ্র করে। অ্যাটাকিং মিডে খেলা এই মিডফিল্ডারের পাসিং, ক্রস, লং পাস ছিলো দক্ষতার ছোঁয়া । যে কারনে বাংলাদেশ দলের আক্রমন সাজাতে নেতৃত্ব দিতেন তিনি। ফরোয়ার্ড হিসেবে ছিলেন কাঞ্চন ও আলফাজ। ৮০ দশকের দলে যে পরিমাণ তারকা ছিলো সেই পরিমাণ তারকা না থাকলেও বাংলাদেশ দল ছিলো ভারসাম্যপূর্ণ। প্লেয়ারদের সঠিকমতো ব্যবহার করে বাংলাদেশ দলকে প্রতিপক্ষের কাছে ভয়ংকর রুপে দাড় করাতেন কোচ জর্জ।
গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে নেপালের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। গ্যালারীতে উপস্থিত থাকা ৫৫ হাজার দর্শককে হতাশ করেনি বাংলাদেশ ফুটবল দল। ম্যাচের ৩০ মিনিটে আলফাজের করা গোলে ১-০ তে জিতে শুভ সূচনা করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মিনিটের আরিফ খান জয়ের করা একমাত্র গোলে জিতে জয়ের মিশন অব্যহত রাখে স্বাগতিক বাংলাদেশ। সেই সাথে নিশ্চিত হয় সেমিফাইনাল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভূটানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান হয় বাংলাদেশ। ম্যাচে জোড়া গোল করেন ফরহাদ, অপর গোলটি করেন টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া কাঞ্চন। তিন ম্যাচেই ক্লীনশীট রাখে বাংলাদেশ। গ্রুপ বি থেকে শেষ চারে বাংলাদেশের সাথে জায়গা করে নেয় মালদ্বীপ। গ্রুপ এ থেকে শেষ চারের যোগ্যতা অর্জন করে পাকিস্তান ও ভারত।
সেমি ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হয় টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সফল দল ভারত। সেমিতে হট ফেবারিট ভারতকে ২-১ গোলে হারিয়ে মহাকাব্যের জন্ম দিয়ে ফাইনালের টিকেট পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের হয়ে ৭৭ মিনিটে কাঞ্চন প্রথম গোল করেন। কিন্তু মিনিট চারেক পর গোল শোধ করে ভারত। অতিরিক্ত সময়ে দূরপাল্লার শটে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল কর গ্যালারীতে দর্শকদের উল্লাস ফিরিয়ে আনেন মুন্না অপর সেমিতে মালদ্বীপের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় পাকিস্তান। ৩য় স্থান নির্ধারনী ম্যাচে পাকিস্তানকে ২-১ হারায় ভারত।
ফাইনালে গ্রুপ পর্বে হারানো মালদ্বীপের মুখোমুখী হয় বাংলাদেশ। চোখে অনেক স্বপ্ন ও বুকে অনেক আশা
নিয়ে গ্যালারীতে ৪৬ হাজার দর্শক উপস্থিত হয়েছিলো। টিভির সামনে ছিলো হয়তো কোটি কোটি বাঙ্গালির চোখ। স্বপ্নের ফাইনালে ভক্তদের নিরাশ করেনি আমিনুল, জয়, ফরহাদ, কাঞ্চনরা। ফাইনালে ১৩ মিনিটে বাংলাদেশের একমাত্র গোল করে আবারো দলের ত্রানকর্তা হন কাঞ্চন। এটি ছিলো টুর্নামেন্টে তার তৃতীয় গোল৷ ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধ করে মালদ্বীপ। ম্যাচ গড়ায় ট্রাইবেকারে। প্রার্থনারত তখন সারা বাংলাদেশ। আমিনুল আমিনুল ধ্বনিতে মুখোরিত গ্যালারী। বাংলাদেশের ৫টি শ্যুট জালের ঠিকানা খোঁজে পায়। মালদ্বীপের ২য় শট আটকে দেন ইনজুরি নিয়ে খেলতে নামা বাংলাদেশি গোলকিপার আমিনুল। ৫ম শটে গোল করেই জার্সি খুলে সতীর্থদের দিকে দৌড় দেন সুজন। ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরউল্লাহর কন্ঠ থেকে ভেসে আসে চ্যাম্পিয়ান চ্যাম্পিয়ান ধ্বনি। ৫-৩ ব্যবধানে জিতে প্রথম বার শিরোপা উল্লাস করে বাংলাদেশ। এটাই ছিলো সাফে বাংলাদেশে প্রথম ও একমাত্র শিরোপা। পরের সতেরো বছরের গল্প আক্ষেপের।
সেইদিন শিরোপা নিয়ে বাধভাঙ্গা উল্লাস করা বাঙ্গালীর স্বপ্ন ছিলো দেশের ফুটবলের গন্ডি আরো বড় হবে। এটা তো মাত্র উত্থান। দেশ একদিন এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ মাতাবে। সেদিনের পর কেটে গেছে সতেরো বসন্ত। ফুটবল ঘুরে দাড়াতে পারেনি বাংলাদেশে। সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে দুর্নীতিবাজদের জন্য। বর্তমান অবস্থা খুবই নাজেহাল। বাংলাদেশের কোচ, প্লেয়ার, ক্লাব কোন কিছুর নাম জানেনা দেশের অধিকাংশ ফুটবল প্রেমী। দেশের ফুটবলে সুদিন ফিরুক সেই স্লোগানে আবারো গর্জে উঠেছে দেশ। অনেক সম্ভাবনা থাকার পরও এগিয়ে যেতে পারছে না দেশের ফুটবল শুধুমাত্র বাফুফের দুর্নীতির জন্য। এবারের বাফুফের নির্বাচনে যেনো সৎ কর্তারা জয়ী হন সেই কামনা রইলো।
@ Burhan Uddin