08/11/2025
২০২৩ বিশ্বকাপের ৭ নভেম্বরের রাতটা যেন এক অলৌকিক গল্প। আফগানিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস যখন ধ্বংসস্তূপে, তখন কেউ ভাবেনি এই ম্যাচের শেষটা ক্রিকেট ইতিহাসের সোনালী পাতায় লেখা থাকবে। ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে কার্যত পরাজয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিল দল। কিন্তু তখনও ক্রিজে ছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, তবুও বেশিরভাগ ক্রিকেট ভক্ত অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় নিশ্চিত ভেবে টিভি সেটের সামনে থেকে উঠে যেত লাগলো, স্টেডিয়ামে থাকা দর্শকরাও বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উপক্রম করছিল। তবে তখনো কিছু ক্রিকেট পাগল মানুষ এটাই ভাবছিল যে, দেখি গ্ল্যান ম্যাক্সওয়েল থাকা পর্যন্ত কি ঘটে, তার ইনিংস টা দেখেই যাই! কিন্তু কে জানতো, সেদিন অস্ট্রেলিয়ান বিগ শো ক্রিকেট বিশ্বকে উপহার দিতে যাচ্ছিল ওয়ানডে ক্রিকেটে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ইনিংসটি।
সেদিনের ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটা যেন মানসিক শক্তি আর ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ। পেশীতে টান খেয়ে মাঠে পড়ে গেলেও তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, আবার ব্যাট তুলেছেন, আবার ছক্কা হাঁকিয়েছেন। প্রতিটি শট যেন ছিল একেকটা বার্তা “আমি হার মানব না।” চোখের সামনে ব্যথা, শরীর কাঁপছে, কিন্তু মাথা শান্ত, লক্ষ্য স্পষ্ট জয়। এমন দৃঢ়তা ক্রিকেট খুব কমই দেখেছে। সেদিন ম্যাক্সির প্রতিটি ছক্কা, প্রতিটি স্ট্রোকে মিশে ছিল অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের গল্প।
৭ উইকেট চলে যাওয়ার পর শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান হিসেবে ম্যাক্সওয়েল তখন বোলার প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে এক অসম্ভব কাজ শুরু করেন। দুজনের মধ্যে হয় ২০২* রানের পার্টনারশিপ, যেখানে কামিন্স করেন মাত্র ১২ রান, বাকি সবটাই ম্যাক্সওয়েলের ব্যাট থেকে, ভাব যায়! এ যেন এক একক নাটক, একক মহাকাব্য। তিনি যেন একাই লড়ছিলেন গোটা আফগানিস্তান বোলিং ইউনিটের বিরুদ্ধে। যার শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, পেশীতে টান, হাঁটতেও কষ্ট। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্য তখন একাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সেই এক পাগলাটে প্রতিভা, যে কখনো হাল ছাড়ে না। ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল ছক্কা, বল পড়ছিল বাউন্ডারির বাইরে, আর দর্শকরা বুঝে গিয়েছিল আজকের দিনটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত ২০১* রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে অপরাজিত থেকে অস্ট্রেলিয়াকে অসম্ভব ও অকল্পনীয় এক জয় এনে দেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। সেই ইনিংস কেবল রান কিংবা রেকর্ডের গল্প নয়, সেটি ইচ্ছাশক্তির, সাহসের, এবং ক্রিকেটের সৌন্দর্যের প্রতীক। ক্রিকেটে শত বছরে হয়তো একবার এমন ইনিংস দেখা যায়, যেখানে ব্যথা, ক্লান্তি, ভাগ্য আর প্রতিভা একত্রে মিশে যায়। সেই দিন ক্রিকেট জানল, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল “বিগ শো” শুধু নামেই নয়, কাজেও সত্যিকারের শোস্টপার।
গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সেই ইনিংসকে যদি কেউ সর্বকালের সেরা ওডিআই ইনিংস বলে দাবি করে, তাতে তর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই। কারণ এটি ছিল শুধু রানের গল্প নয়, ছিল মানসিকতা, সাহস আর ইচ্ছাশক্তির এক চূড়ান্ত প্রদর্শন। ৯১ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর, পেশীতে টান খেয়ে হাঁটতেও না পারা অবস্থায় ২০১* রানে দলকে জয় এনে দেওয়া, এমন কিছু ক্রিকেট ইতিহাসে প্রায় শোনা যায় না। পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ, মাঠের চাপ, শরীরের অবস্থা, সব কিছু ম্যাক্সওয়েলের বিপক্ষে ছিল, তবুও তিনি জয় ছিনিয়ে এনেছেন শিয়ার ডিটারমিনেশন দিয়ে। পরিসংখ্যান, প্রেক্ষাপট আর প্রভাব, সব দিক থেকেই এই ইনিংস সেই একমাত্র, যেটিকে “সর্বকালের সেরা” বললে ক্রিকেট নিজেই সম্মতি দেয়।