15/08/2026
আর্থার উইটি : দি ইংলিশম্যান
১৮৭৮ সালের ১৬ আগস্ট। বার্সেলোনার বাতাসে তখনও ফুটবলের গন্ধ তেমন পরিচিত নয়। বার্সেলোনা তখন এগিয়ে চলেছে শিল্পায়নের পথে, আর কাতালোনিয়া তখন সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়ে নিজের নতুন পরিচয় খুঁজছে। আর ঠিক সেই সময়েই বার্সেলোনায় জন্ম নিলেন এক ইংরেজ বংশোদ্ভূত ফ্রেডেরিক আর্থার উইটি কটন।
আজ যে শহর ফুটবলকে তার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে, সেই শহরের ফুটবল ইতিহাসের একেবারে শুরুর অধ্যায়ে এই মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন খেলোয়াড়, অর্গানাইজার, বিজনেসম্যান এবং পরবর্তীতে এফসি বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, তিনি ছিলেন সেই মানুষদের একজন, যারা বার্সেলোনায় ফুটবলকে শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
আর্থারের পরিবার ছিল বার্সেলোনার অন্যতম ইংরেজ ব্যবসায়ী ফ্যামিলিগুলোর একটি। তাঁর বাবা ফ্রেডেরিক উইটি ১৮৭৩ সালে বার্সেলোনায় এসে ব্যবসা শুরু করেন এবং ব্রিটেন ও স্পেনের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে তোলেন। অর্থাৎ আর্থারের শৈশব থেকেই তাঁর চারপাশে ছিল দুই সংস্কৃতির সহাবস্থান, ইংরেজ ফ্যামিলি হেরিটেজ আর কাতালান শহরের বাস্তবতা।
আর্থারের ভাই এর্নেস্ট উইটিও ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী। দুই ভাই ক্রিকেট, টেনিস, রাগবি এবং ফুটবল সবকিছুতেই ছিলেন নিয়মিত। সে সময় বার্সেলোনায় ফুটবল ছিল একেবারেই নতুন। শহরের ইংরেজ সম্প্রদায়ের মধ্যে এর চর্চা থাকলেও স্থানীয় সমাজে তখনও এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
উইটি ভাইয়েরা সেই সময়ের ইংরেজ ফুটবল কালচার রিপ্রেজেন্ট করলেও, ফুটবলকে বার্সেলোনার প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের অংশ করে তোলার পিছনে তাঁদের অবদান ছিল অসীম। আর এখান থেকেই শুরু হয় এক গল্প, যার শেষ পর্যন্ত নাম হয়ে যায়, FC Barcelona।
১৮৯৯ সালের শেষদিকে সুইস তরুণ হান্স গ্যাম্পার, যিনি পরে জোয়ান গ্যাম্পার নামে পরিচিত, বার্সেলোনায় একটি ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি ফুটবল খেলতে আগ্রহীদের আহ্বান জানান।
ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনায় আর্থার উইটির যোগ দেওয়ার গল্পটা একটু অন্যরকম। বার্সেলোনার প্রথম ম্যাচের আগে আর্থার উইটি এবং তাঁর ভাই এর্নেস্ট ইংরেজ কলোনির দলের হয়ে খেলেছিলেন। সেই ম্যাচটি ছিল নতুন গঠিত বার্সেলোনা দলের বিপক্ষে। পরে ২৪ ডিসেম্বর ১৮৯৯ সালে Català এর বিপক্ষে বার্সেলোনার দ্বিতীয় ম্যাচে আর্থার উইটি ক্লাবটির হয়ে মাঠে নামেন।
অর্থাৎ ইতিহাসের এক অদ্ভুত বাঁকে, উইটি প্রথমে ছিলেন বার্সেলোনার প্রতিপক্ষ, তারপর হয়ে গেলেন সেই ক্লাবেরই ইতিহাসের একজন। এটাই হয়তো ফুটবলের সৌন্দর্য। প্রতিপক্ষ থেকে আপনজন। আর সেই আপনজনদের একজন ছিলেন আর্থার উইটি।
শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। কোনো বিশাল স্টেডিয়াম ছিল না, ছিল না আধুনিক ট্রেনিং ব্যবস্থা, ছিল না কোটি কোটি টাকার স্পনসর। কখনো Bonanova Velodrome, কখনো Hotel Casanovas এর মাঠ, কখনো শহরের অন্য কোনো খোলা জায়গা, এভাবেই চলত ফুটবল।
কিন্তু স্বপ্নটা ছিল বড়। উইটি ছিলেন শুরুর জেনারেশনের একজন, যারা ফুটবলকে শুধু অবসর বিনোদন হিসেবে দেখেননি। তিনি ধীরে ধীরে ক্লাবের অর্গানাইজেশনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯০১ সালে তিনি ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন। তার আগে থেকেই তিনি দলের একজন প্লেয়ার এবং লিডার ছিলেন। মাঠেও তার এবিলিটি ছিল যথেষ্ট।
শুরুতে মিডফিল্ডে খেললেও ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে তিনি মূলত লেফটব্যাক হিসেবে খেলতেন। পরবর্তীতে গ্যাম্পার নিয়মিত খেলা ছেড়ে দিলে উইটি দলের ক্যাপ্টেনসির দায়িত্বও নেন।
তিনি ছিলেন সেই সময়ের এক ধরনের অলরাউন্ড স্পোর্টসম্যান। ফুটবল ছাড়াও টেনিস, রাগবি ও গলফের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। এমনকি ১৮৯৯ সালে Barcelona Lawn-Tennis Club প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত।
তারপর এল ১৯০২ সাল। বার্সেলোনার ইতিহাসে প্রথম বড় ট্রফি। Copa Macaya। কাতালোনিয়ার প্রথম কম্পিটিটিভ ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। আর এই প্রতিযোগিতায় বার্সেলোনার প্রথম বড় সাফল্যের দলে ছিলেন আর্থার উইটি।
পরের বছর এল আরেকটি সাফল্য, Copa Barcelona। এরপর ১৯০৪–০৫ সিজনে Barcelona প্রথমবারের মতো Catalan Championship জেতে। উইটি এই তিনটি শিরোপারই অংশ ছিলেন।
এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। আজকের চোখে তখনকার ফুটবলকে বিচার করলে ভুল হবে। তখন ফুটবল ছিল না কোনো পেশাদার খেলা। খেলোয়াড়রা নিজের কাজের পাশাপাশি ফুটবল খেলতেন। মাঠ, বল, জার্সি, যাতায়াত সবকিছুর মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধতা। একটি ক্লাবকে টিকিয়ে রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
আর সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই উইটি শুধু খেলোয়াড় হয়ে থাকলেন না। তিনি হয়ে উঠলেন ক্লাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯০৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আর্থার উইটি বার্সেলোনার সভাপতি নির্বাচিত হলেন। যদিও এর আগে থেকেই তিনি ক্লাবের বোর্ডে কাজ করেছিলেন। তাঁর সভাপতিত্ব চলেছিল ১৯০৫ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত, মোট ৭৪৬ দিন।
সেই সময় তাঁর কাজ ছিল শুধু অফিসে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল না। ক্লাবের মাঠ পরিবর্তন করতে হয়েছে। নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে হয়েছে। দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। আর বার্সেলোনাকে ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ফুটবল ক্লাবে পরিণত করতে হয়েছে।
তাঁর সময়েই ক্লাবের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় বার্সেলোনায়। Stade Olympique de Toulouse এর বিপক্ষে সেই ম্যাচটি ছিল বার্সেলোনার জন্য নতুন এক অধ্যায়। এরপর ১৯০৪ সালের ১ মে বার্সেলোনা প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে ফ্রান্সে গিয়ে Toulouse এর বিপক্ষে খেলে।
আর উইটির আরেকটি অবদান ছিল আরও ছোট, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইংল্যান্ড থেকে রেগুলার সাইজের কোয়ালিটি ফুটবল নিয়ে আসেন এবং গোলপোস্টে নেট ব্যবহারের প্রচলনেও বড় ভূমিকা রাখেন। আজকের ফুটবলে যা একেবারেই স্বাভাবিক, তখন সেগুলোও ছিল নতুন।
শুধু তাই নয়, তাঁর সভাপতিত্বের সময় তরুণ খেলোয়াড়দের প্রথম দলে সুযোগ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। Comamala, Forns, Quirante এবং Soler এর মতো তরুণরা উঠে আসেন। অর্থাৎ উইটির বার্সেলোনা শুধু বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যতের দল গড়ার দিকেও তাকাচ্ছিল।
এভাবেই ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল ক্লাবটি। একটি ছোট্ট ফুটবল দলের জায়গায় তৈরি হচ্ছিল একটি প্রতিষ্ঠান।
মাঠে তাঁর ক্যারিয়ারও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বিভিন্ন অফিসিয়াল রেকর্ডে ম্যাচের সংখ্যায় ভিন্নতা পাওয়া যায়, কারণ সেই সময়ের ম্যাচের হিসাব আজকের মত নিখুঁতভাবে রাখা সম্ভব হতো না। বার্সেলোনার বর্তমান খেলোয়াড় ডেটাবেসে তাঁর নামে ৮৬টি ম্যাচ ও ৭টি গোল রয়েছে; ক্লাবের জীবনীতে আবার ৭৯ ম্যাচ ও ৬ গোলের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
তবে সংখ্যার এই পার্থক্য তাঁর গুরুত্বকে বদলে দেয় না। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫—এই সময়ে তিনি বার্সেলোনার জার্সিতে ছিলেন ক্লাবের শুরুর যুগের অন্যতম পরিচিত মুখ।
আর তাঁর ভাই এর্নেস্ট উইটি ছিলেন সেই প্রথম প্রজন্মের খেলোয়াড়দের একজন। দুই ভাইয়ের গল্প তাই শুধুই সাধারণ কোনো দুই ভাইয়ের গল্প নয়। এটি বার্সেলোনার ফুটবলের শৈশবের গল্প।
একদিকে সুইস যুবক জোয়ান গ্যাম্পারের স্বপ্ন। অন্যদিকে উইটি ভাইদের ইংরেজ ক্রীড়া-সংস্কৃতি। সবের মিলন হয়েছিল এই বার্সেলোনায়। যে শহর ধীরে ধীরে ফুটবলকে নিজের ভাষায় কথা বলতে শিখছিল।
১৯০৫ সালের ৬ অক্টোবর আর্থার উইটি সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর বিদায়ে ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে আক্ষেপ ছিল। তাঁর সময়ে সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৩৪, যা একটি সদ্য জন্ম নেওয়া ক্লাবের জন্য যা ছিল অগ্রগতি চিহ্ন।
কিন্তু এখানেই তাঁর গল্প শেষ হয় না। কারণ কিছু মানুষ ক্লাব ছেড়ে গেলেও ক্লাবের ইতিহাস থেকে কখনো বেরিয়ে যেতে পারেন না। তিনি ছিলেন সেই সময়ের মানুষ, যখন বার্সেলোনা এখনও বার্সেলোনা হয়ে ওঠার পথে। যখন ক্যাম্প ন্যু ছিল না। যখন কোটি কোটি সমর্থক ছিল না। যখন "Més que un club" স্লোগানটি ইতিহাসের পাতায়ও জন্ম নেয়নি। তখন ছিল শুধু একটি বল, কয়েকজন তরুণ, একটি শহর এবং একটি স্বপ্ন।
১৯৬৯ সালের ৯ নভেম্বর, যে শহরে তাঁর জন্ম, সেই বার্সেলোনাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। ততদিনে পৃথিবী বদলে গেছে, ফুটবল বদলে গেছে, বার্সেলোনাও বদলে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের কিছু নাম সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। কারণ তারাই এক একটা ইতিহাস।
গ্রাসিয়াস ফ্রেডেরিক আর্থার উইটি কটন।
সন্নিবেশ অথৈ
মেম্বার, Força Barça - Bangladesh