24/06/2026
একটা সময় ছিল, যখন ব্রাজিল মাঠে নামলেই মনে হতো কিছু একটা বিশেষ ঘটতে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষ কে, সেটি বড় বিষয় ছিল না; বড় বিষয় ছিল ব্রাজিল খেলছে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করত সাম্বার ছন্দ, ড্রিবল, অসম্ভব কোনো পাস আর সেই চিরচেনা হলুদ জার্সির জাদু দেখার জন্য।
আমার মতো ২০১০ থেকে ফুটবল দেখা শুরু করা ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত।
আমরা এমন এক প্রজন্ম, যারা ব্রাজিলের গৌরবের গল্প শুনে বড় হয়েছি, কিন্তু সেই গৌরব নিজের চোখে খুব কমই দেখেছি।
আমরা পেলের বিশ্বকাপ দেখিনি, আমরা রোমারিওর বিশ্বকাপ দেখিনি, আমরা রোনালদোর বিশ্বকাপ দেখিনি, আমরা রোনালদিনহোর বিশ্বকাপ দেখিনি। আমরা দেখিনি সক্রেটিস এর ছন্দ, বেবেতো আর মাজিনহোর গোলের পর সেই সুন্দর সেলিব্রেশন কিংবা জিকোর সেই দুর্দমনীয় ব্রাজিলকে।
এমনকি ২০০২ সালের সেই পঞ্চম তারকাও আমাদের স্মৃতির অংশ নয়।
আমরা ব্রাজিলকে দেখে বড় হয়েছি ইউটিউবের ভিডিওতে, পুরনো ম্যাচের হাইলাইটস বা রিক্যাপে, আর বড় ভাই বা বাব-চাচাদের মুখে ব্রাজিলের স্বর্ণযুগের গল্প শুনে। এমন সব ড্রিবল দেখেছি, যেগুলো ফুটবল কম, জাদু বেশি মনে হতো। এমন সব মুহূর্ত দেখেছি, যেগুলো দেখে মনে হতো ব্রাজিল কোনো দল নয়, এক ধরনের শিল্প।
পাঁচটি তারকার গর্ব আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকার হিসেবে, কিন্তু সেই তারকাগুলোর আলো নিজের চোখে জ্বলতে দেখিনি।
তারপর একদিন ব্রাজিলের হয়ে আমাদের প্রজন্মেরও একজন নায়ক এলো- নেইমার।
২০১০ সালের ১০ আগস্ট, মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ব্রাজিল জাতীয় দলে অভিষেক হলো নেইমারের। ওই ম্যাচে ১১ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন এবং অভিষেকেই করেছিলেন চমৎকার একটি গোল।
যখন নেইমার পৃথিবীর সামনে নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করলেন, মনে হয়েছিল ব্রাজিল আবার নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মাকে ফিরে পেয়েছে।
রাস্তার ফুটবলের সেই নির্ভীক সৌন্দর্য, সেই সাহস, সেই আনন্দ—সবকিছু যেন ফিরে এসেছিল তার দুই পায়ের মাধ্যমে। রেইনবো ফ্লিক, নাটমেগ কিংবা চোখ ধাধানো ড্রিবল, আর সেই হাসি...
নেইমার শুধু একজন ফুটবলার ছিল না, সে ছিল একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, সর্বকালের সেরা ফুটবল খেলুড়ে দেশের হৃদস্পন্দন।
বহু প্রজন্ম ধরে সেলেসাওরা শুধু ফুটবল খেলেনি, তারা ফুটবলে আনন্দিত হয়েছে, আবেগাপ্লুত হয়েছে। তারা পৃথিবীকে শিখিয়েছে ফুটবল শুধু জেতার খেলা নয়, এটি এক ধরনের শিল্প।
আর আমাদের কাছে নেইমার ছিল সেই শিল্পের শেষ মহান উত্তরাধিকারী, প্রতিবার হলুদ জার্সি গায়ে মাঠে নামার সময় মনে হতো আজ কিছু একটা ঘটবে, আজ হয়তো আবার আমরা সেই পুরনো ব্রাজিলকে দেখব। আর সত্যি বলতে ঐ হলুদ জার্সিতে তিনি কখনোই হতাশ করেন নি আমাদের।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি নির্মম, নেইমার এর পুরো ফুটবল জীবন যেন একের পর এক হৃদয়ভাঙার গল্প।
২০১৪, ২০১৮, ২০২২
প্রতিবার নতুন স্বপ্ন, প্রতিবার নতুন আশা, আর প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে ভেঙে যাওয়া।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা জানি না "যদি" শব্দটার উত্তর কী।
যদি ২০১৪ সালে ইনজুরি না হতো।, যদি ২০১৮ সালে আরও একটু ভাগ্য সহায় হতো, যদি ২০২২ সালে কয়েক মিনিট আর ধরে রাখা যেত।
আর এই "যদি"গুলোই আমাদের তাড়া করে ফেরে।
২০২৬ বিশ্বকাপ যেন এক ঝাঁক কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ, কারও জন্য এটি লাস্ট ডান্স, কারও জন্য উত্তরাধিকারকে আরও সমৃদ্ধ করার মঞ্চ, আবার কারও জন্য নিজেকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ।
এই বিশ্বকাপে আমরা ইতোমধ্যেই অনেক কিছু দেখেছি।
মেসি গোল পেয়েছেন। শুধু গোলই নয়, জোড়া গোল পেয়েছেন, হ্যাটট্রিকও করেছেন।
রোনালদো, এমবাপ্পে, কেন, হালান্ড গোল পেয়েছেন।
এই সময়ের প্রায় সব বড় তারকারাই বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের ছাপ রেখে গেছেন।
আর আজ, ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা শুধু একজনের।
ব্রাজিলের পোস্টার বয়- নেইমারের
কারণ আমরা জানি, হয়তো এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ, হয়তো এটাই শেষবারের মতো পুরো পৃথিবীকে দেখানোর সুযোগ যে কেন একসময় তাকে পেলের উত্তরসূরি বলা হতো।
সমালোচকরা তার জীবনযাপন নিয়ে কথা বলবে, তার ইনজুরি নিয়ে কথা বলবে, তার অপূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলবে, কিন্তু তারা কখনো তার প্রতিভাকে অস্বীকার করতে পারবে না।
ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া কোনো সাধারণ কিছু নয়, পেলেকে সরিয়ে এই স্থান দখল করা ইতিহাস, এটা বাস্তবতা।
আজ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি হয়তো কেবল একটি গ্রুপ ম্যাচ, কিন্তু অনেক সমর্থকের কাছে এটি তার চেয়েও বেশি কিছু।
এটি একটি প্রত্যাবর্তন এর গল্প, একটি অসমাপ্ত গল্পের নতুন অধ্যায়।
এই গল্পে হয়তো শেষ পর্যন্ত আমরা আবারও হৃদয়ভাঙার গল্প লিখব, হয়তো এবারও স্বপ্ন অপূর্ণ থাকবে।
কিন্তু তবুও, যখন সেই হলুদ জার্সি মাঠে নামে, তখন সব যুক্তি হার মেনে যায়।
কষ্ট আছে, হতাশা আছে, অভিমান আছে।
তবুও আশাটাও আছে, আর সেই আশার নাম ব্রাজিল।
সেই আশার নাম নেইমার।
আমি আর শুধু পুরনো প্রজন্মের গল্প শুনতে চাই না, আমি নিজে একটি গল্প বাঁচতে চাই, আমি দেখতে চাই, দুই যুগের অপেক্ষার অবসান।
আমি দেখতে চাই, সাম্বার ছন্দ আবার পৃথিবীর শীর্ষে ফিরে যাক। ফুটবলের সেই জোগো বোনিতোর ছন্দে বিভোর হোক আবারও বিশ্বের কোটি ফুটবলপ্রেমী।
কারণ যতবারই ব্রাজিল আমাদের হৃদয় ভাঙুক, আমরা আবারও ফিরে আসব।
আবারও জার্সি গায়ে চাপাবো।
আবারও বিশ্বাস করবো, কারণ এটাই ব্রাজিল, This is my team.
আর ব্রাজিলকে ভালোবাসা আমার কাছে কখনো যুক্তির বিষয় ছিল না।
Força Seleção. Sempre. 🇧🇷💚💛