24/06/2024
শুরুটা করছি মেসিকে নিয়ে ম্যাড়াডোনা, লিনেকার এবং জিদানের করা তিনটি উক্তি দিয়ে।
"আমি সেই খেলোয়াড়কে দেখেছি যে আর্জেন্টিনায় আমার জায়গা দখল করেছে। সে হল মেসি এবং সে সেরা"
-ম্যারাডোনা।
"মেসি একটা জিনিয়াস ৷ বাকিদের সাথে অনেক ব্যবধানে সে সর্বকালের সেরা ফুটবলার ৷ আমি পেলেকে খেলতে দেখি নাই ৷ তবে সাউনেস, গুলিত, ভেনাবলস এবং বর্তমানে রুনি এরা সবাই মেসিকে সেরা মানে ৷ মেসির ফুটবল অদ্বিতীয় যার সাথে আমরা পরিচিত নই, এরকম অন্য কাউকে দেখা যায় না ৷"
-গ্যারি লিনেকার
"সে সর্বদা সামনে আগানোর কথা ভাবে ৷ সে কখনো ব্যাকপাস কিংবা সাইড পাস দিতে চায় না ৷ তার শুধু একটাই চিন্তা থাকে কিভাবে বল নিয়ে গোলের দিকে যাওয়া যায় ৷ তাই একজন ফুটবল ফ্যান হিসেবে আপনার শুধু তাকে উপভোগ করা উচিত ৷"
-জিদান
সিনেমা কখনো জীবন হয় না, হলেও খুব কম। সিনেমায় জীবনের রূপ দিতে পেরেছেন খুব সংখ্যাক পরিচালক। সিনেমায় মানুষের জীবনকে পোর্ট্রে করার জন্য বিখ্যাত ছিলেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। বাঙালিদের মধ্যে এই কাজটা সবচেয়ে পারফেক্টভাবে করতে পেরেছেন একমাত্র সত্যজিৎ রায়। ঠিক তেমনিই জীবনকে সিনেমায় রূপ দিতে পেরেছেন গুটিকয়েক ব্যক্তি। কিছুকিছু ক্ষেত্রে তাঁরা সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়েছেন। ঠিক তেমন-ই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত শহর রোজারিওর বিস্ময়কর এক বালকের রয়েছে বিস্ময়কর গল্প, যে গল্প হার মানায় সিনেমার গল্পকে, রুপকথাও হার মানে যে গল্পের কাছে।
রোজারিওতে জন্ম, পাঁচ বছর বয়স থেকে ফুটবল খেলা শুরু, এগারো বছর বয়সে গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ধরা পড়া, বাবার জমানো অর্থ দুই বছরের মাথায় চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে যাওয়া, ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করার সক্ষমতা না থাকা, বার্সেলোনার স্কাউট টিম তাঁর খেলায় মুগ্ধ হয়ে বার্সার একাডেমিতে সাইন করানো এবং তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া, এরপর তো বার্সায় মেসি থেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার মেসি হয়ে উঠার শুরু।
গল্পের শেষ এখানেই নয়। বার্সায় যেভাবে সেরা হয়ে উঠেছিলেন তিনি, যেভাবে নিজের ব্যক্তিগত অর্জনের পাল্লা ভারি হচ্ছিলো, যেভাবে বার্সার একের পর এক সব সফলতার গল্প লিখাছিলেন তখন মুদ্রার ওই পিঠে লেখা হচ্ছিলো নিজ দেশ আর্জেন্টিনার হয়ে ব্যর্থতার গল্প। অনেক বছর ধরে আর্জেন্টিনা কোনো শিরোপা জিতছে না, সবার আশা মেসি সেই খরা থেকে উদ্ধার করবে আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু হচ্ছিলো না। টানা দুইবার কোপার ফাইনালে হার, ১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ মুহূর্তে গিয়ে হার। নিজের দেশকে শিরোপা জেতাতে না পারার জন্য নিজের দেশেই প্রচণ্ডভাবে সমালোচনার সম্মুখীন। কোপার ফাইনালে হেরে তো অবসর-ই নিয়ে ফেলেছিলেন, সেখান থেকে তাঁকে আবার একপ্রকার জোর করে ফিরিয়ে আনা।
অবশেষে ২০২১ সালে এসে আর্জেন্টিনার অনেক বছরের শিরোপাহীন থাকার সমাপ্তি। কোপা আমেরিকা জিতে অবশেষে মেসি তাঁর দেশকে অনেক বছর পর শিরোপার স্বাদ দিলেন। এরপর জিতলেন ফিনালসিমা। এরপর ২০২২ সালে এসে সৃষ্টিকর্তা তাঁকে দু’হাত ভরে দিলেন। যেটার জন্য মেসি ডেস্পারেট ছিলেন, পৃথিবীর যেকোনো কিছুর বিনিময়ে যেটা জেতার আকাঙ্কা করেছিলেন তিনি, যেটার জন্য আর্জেন্টিনা এবং তার সমর্থকদের ২৮ বছরের অপেক্ষা, যেটা না জেতা পর্যন্ত মেসির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় সেই অধরা বিশ্বকাপ; অবশেষে মেসি এবং আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলেন। মেসি বিশ্বকে তাঁর পায়ের যাদুতে মুগ্ধ করে ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ সালে জানিয়ে দিলেন- “হ্যা, আমিই বিশ্বের সেরা ফুটবলার!”
গল্পের শেষ কিন্তু এখনো হয় নি। মেসি তাঁর এই জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন, অনেক ভালো কিছুর সাক্ষী হয়েছেন, অনেক ট্র্যাজেডির সাক্ষীও তিনি হয়েছেন। বিশ্বকাপের আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালেই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছেন তিনি। হঠাৎ করেই তাঁর শৈশব-কৈশোর, তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বার্সেলোন্সার খারাপ আর্থিক অবস্থার জন্য মেসিকে চলে যেতে হলো ক্লাব থেকে। মেসির জীবনে যে কয়টা ট্র্যাজেডি এসেছে তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো বার্সা থেকে চলে আসা। মেসির জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন।
মেসির লাইফ সার্কেল হার মানাবে যেকোনো সিনেমার গল্পকে, হার মানাতে বাধ্য। তাঁর লাইফ সার্কেলে সব আছে, সব। সুখের গল্প আছে, কষ্টের গল্প আছে, আনন্দের গল্প আছে, আছে বেদনার সুর। ভালোবাসার গল্প আছে, আছে বিচ্ছেদের গল্প। আছে না পাওয়ার গল্প, আছে না পাওয়ার কারণে একেবারে ভেঙে পরার গল্প। সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও আছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন শক্তভাবেই। হাল ছাড়েন নি, কখনো লক্ষ্য থেকে পিছপা হোননি। একটা সিনামায় এতোকিছু একসাথে আপনি কখনো পাবেন না, কখনো না।
কিন্তু মেসির এতো এতো গুণের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুণ হলো জীবনের সবকিছু পেয়েও, সেরা হয়েও কখন তিনি অহংকার করেন নি। অহমিকা তাঁকে গ্রাস করতে পারেন নি। সবসময় সাধারণের মধ্যেই থেকেছেন এবং থাকতে চেয়েছেন।
৩৭ বসন্ত শেষে মেসি আজ ৩৮-এ পা দিলেন। ১৭ বছর বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করা মেসির বয়স আজ ৩৭। ক্যারিয়ারের শেষ সময়গুলো উপভোগ করছেন তিনি, সাথে আমরাও। ফুটবলকে এভাবে সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন আর কে? ভাবতেই অবাক লাগে খুব শীঘ্রই বুটজোড়া তুলে রাখবেন, জাদুকরের জাদু আর দেখা হবে না। তবে আগামী প্রজন্মে গল্প শোনানোর জন্য রসদ দিয়ে গেলেন তিনি।
শুরুটা করেছিলাম মেসিকে নিয়ে ম্যারাডোনা, লিনেকার এবং জিদানের করা তিনটা উক্তি দিয়ে। শেষ করি মেসিকে নিয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় একটা উক্তি দিয়ে। উক্তিটি ছিলো পেপ গার্ডিওলার। গার্ডিওলা বলেছিলেন- "তাকে নিয়ে লিখো না। তাকে বর্ননা করার চেষ্টা করো না। শুধু দেখে যাও"
শুভ জন্মদিন ছোট “জাদুকর”। জাদুকর শব্দটায় আপনার জন্য নিখুঁট!