21/08/2025
হেনাকে যেদিন বিয়ে করে বাসায় আনলাম বাবা-মা দুজনেরই মুখ গম্ভীর ছিল যদিও আমি তাদের জানিয়েই বিয়েটা করেছি । আসলে এই বিয়ে তে তাদের মত নেই তাই নিজেরাই কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করেছি। বাসায় যখন ঢুকলাম বাবা-মা দুজনেই ড্রইং রুমে বসে, হেনা পা ছুঁয়ে সালাম করার আগেই মা উঠে গিয়ে দরজা লাগালেন, বাবা অবশ্য তার সালাম গ্রহন করলেন কিন্তু কথা বললেন না। ছোট বোন সুমি সেও নিশ্চুপ।
- তোর ভাবিকে ঘরে নিয়ে যা আমি আস্তে করে বললাম। সে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। লজ্জায় হেনার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। হেনা নিজে থেকেই বললো,
- দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে , আসলে বিয়েটা সবার অমতে হয়েছে তো। আমি সবার মন জয় করে নিব , তুমি চিন্তা করো না ।
আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও মনের মধ্যে কিছু একটা দ্বিধা রয়েই গেল।
হাতে টাকাপয়সা তেমন কিছু নেই, হেনা কে কিছুই দিতে পারিনি তাই শুধুমাত্র একটা সোনার চেইন দিলাম বিয়ের রাতে। মেয়েটার মুখটা কি যে মায়াবী লাগছিল তখন ,উপহার পেয়ে সে এত খুশি যা প্রকাশ করার ভাষা নেই।
বিয়ের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে বাবা হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেলেন। মা চিৎকার করে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন অলক্ষী ঘরে এনেছি, আসার সাথে সাথে তাকে বিধবা হতে হয়েছে। সুমি কিছু বলছে না কিন্তু সে মনে মনে মায়ের সাথেই একমত সেটা বুঝতে আমার এক মুহূর্ত দেরি হলো না। হেনা কি করবে বুঝতে পারছে না। সবকিছু এলোমেলো আমার, সবকিছু। বাবার দাফন সম্পন্ন করলাম। মা শোকে পাথর হয়ে গেছে। এটাই স্বাভাবিক আটত্রিশ বছর দুজনের একত্রে বসবাস।
সংসারের হাল ধরার মত অবস্থা এখন মায়ের নেই। সবকিছুর চাপ এসে পড়ল হেনার উপর। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সে নিপুন গৃহিণীর মত সব সামলে নিচ্ছে। ধীরে ধীরে মা আর বোনের মনে জায়গা করে নিচ্ছে ।সব খারাপের বোধহয় একটা ভালো দিক থাকে।
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাড়ির চেহারা পাল্টে গেল। মা হেনাকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা। সংসারের চাবি ওর হাতে তুলে দিয়েছেন। এদিকে সুমীর বিয়ের তোড়জোড় চলছে । ছেলে প্রবাসী, বিয়ে করে সব কাগজপত্র ঠিক করে সুমিকে নিয়ে কানাডায় চলে যাবে। অবশ্য বিয়ের পর কিছুদিন ওর এই বাড়িতেই থাকতে হবে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-সুমি চলে যাবে ,তোমার মন খারাপ মা ?
একগাল হেসে উত্তর দিলেন,
-আমার আরও একটা মেয়ে আছে আর এখনতো প্রযুক্তির যুগ। তোদের ওই ভিডিও কল না কি যেন আছে তাতে তো আমি আমার মেয়েকে দেখতে পাবোই।
সুমির বিয়ে হয়ে গেল। শ্বশুরবাড়িতে সপ্তাহ খানেক থাকার পর ওর স্বামী রাহাত ওকে দিয়ে গেল। রাহাত চলে যাবে কানাডায়। সুমির কাগজপত্র প্রসেসিং হতে একটু দেরি হবে। সুমি যখন ওর শ্বশুরবাড়ির গল্প করছিল কিভাবে ওকে বরণ করেছে, বাসর ঘর কিভাবে সাজানো ছিল, আমি হেনার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখটা একদম কালো হয়ে আছে বুঝে গেলাম আসলে ও এগুলো কিছু পায়নি তাই এসব গল্প শুনতে ভালো লাগছে না। গল্পের মাঝেই তাই বলে উঠলাম, "একটু চা খাওয়াবে হেনা" ও তড়িঘড়ি করে উঠে গেল যেন এর অপেক্ষাতেই ছিল।
হঠাৎ করে সুমির একজোড়া কানের দুল উধাও হয়ে গেল, সারা বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করা শুরু হলো। খুব তিক্ত কথা হলো জিনিসটা পাওয়া গেল আমার তোষকের নিচে। মা আর সুমি অবাক হয়ে হেনার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছু বললো না। বিস্ময়ে আমিও হতবাক, হেনাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ও বলতে লাগলো
-আমি নিইনি।
আমরা কেউ কিছু বললাম না। রাগে আমার চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল।
মা আস্তে করে হাত ধরে আমাকে অন্য ঘরে নিয়ে গেল,
- শোন বাবা, ভুলটা তো আমাদেরই। এই পর্যন্ত বৌমাকে আমরা কোন গয়না বা কিছু দেইনি আর তুই তো বলেছিলি ও একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কাজেই হয়তো লোভ সামলাতে পারেনি। তুই ওকে কিছু বলিস না, ছোটখাট ভুল আমরা সবাই করি দেখিস আর কখনো করবে না।
মা যাই বলুক না কেন সেই দিন থেকে ওর সাথে আমি ঠিকঠাক মতো কথা বলতে পারি না, ইচ্ছা হয় না।
আসলে বাবা-মা ঠিক বুঝতে পারে ছেলের জন্য কোনটা সঠিক আর কোনটা সঠিক না। আমিই ভুল করেছিলাম চিনতে পারিনি নিজের সঠিক জীবনসঙ্গীকে। হাভাতে ঘরের মেয়েকে এনে পড়েছি বিপদে।
দিন পনেরো পরে চিটাগাং গেলাম ব্যাবসার কাজে। ঠিক একদিন পরেই ফোনে মা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলে আর বলতে লাগলেন,
-তুই তাড়াতাড়ি ফিরে আয়, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
ফেরার পর দেখলাম কেঁদে কেঁদে সুমির চোখ পুরো লাল ।আমি চিৎকার করে হেনাকে ডাকতে লাগলাম।
-ভাইয়া আমার যে গয়না গুলো ছিল তার কিছুই পাওয়া যাচ্ছেনা সাথে মায়ের গুলাও আর রাহাত আমাকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছিল সবই আমার ড্রয়ারে ছিল এখন কিছুই নেই আর ভাবী গতকাল সকাল থেকেই উধাও। এখন আমার কি হবে ভাইয়া, রাহাতকে আমি কি জবাব দেবো, আমার সংসারটা কি টিকে থাকবে?
আমি একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। হেনা এটা কি কাজ করলো সুমি সজোরে কাঁদতে লাগলো।
হেনার নামে থানায় মিসিং কমপ্লেইন করলাম। সব ঘটনা শুনে ওরা বললো যে জিনিসপত্র নিয়ে মেয়েটা পালিয়ে গেছে, ওরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবে খুঁজে বের করার। ওই আশ্বাস টুকুই, হেনা কে আর পাওয়া যায়নি। ওর মামা মামির ওখানে খোঁজ নেয়া হয়েছে যেখানে ও বড় হয়েছে ।বাবা মা ছিল না, তারা কিছু জানেনা । হেনা যেন অদ্ভুতভাবে উধাও হয়ে গেল।
এমনিতেই সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কারণে ওর প্রতি আমার ভালোবাসা কমে গিয়েছিলো কিন্তু কখন যে সেটা ঘৃণায় বদলে গেল বুঝতেই পারিনি অনেকগুলো দিন কেটে গেল মা বললেন হেনার আশা ছেড়ে দিতে। আমি এক গাল হেসে বললাম,
-তোমাকে কে বললো যে আমি হেনার জন্য বসে আছি? -তাহলে বিয়ে করছিস না কেন ?
-মেয়ে দেখো তোমরা । বলে আমি উঠে চলে আসলাম। আসলেই বিয়ে করা উচিত, কার জন্য অপেক্ষা করছি আমি।
বছর দশেক পর, মা চলে গেছেন দুই বছর হয়েছে। সুমি কানাডাতে ভালই আছে ।আমি স্ত্রী আর দুই পুত্র নিয়ে সুখেই আছি। ব্যবসা ভালো চলছে, ভাবলাম এই সুযোগে বাড়িটা কমপ্লিট করে ফেলি। খনন কাজ শুরু হতেই চেঁচামেচি শুনতে পারলাম। দৌড়ে গিয়ে দেখি একটা কঙ্কাল । ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম কঙ্কালের গলায় একটা সোনার চেইন যেটা আমি হেনাকে দিয়েছিলাম বিয়ের রাতে।
কি হয়েছিল তাহলে হেনার সাথে! মা তো বেঁচে নেই সুমি নিশ্চয়ই জানবে। পুলিশ এলো অনেক ঝামেলা হলো। মাঝে সুমিকে ফোন দিলাম ও শুধু একটাই কথা বললো
" ওই মহিলা তোমার যোগ্য ছিল না" লাইনটা কেটে দিল। তার মানে কি সব ঘটনা সাজানো ছিল? মা আর সুমি মিলে কি হেনাকে কিছু করেছিল ? আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে । চারপাশে দ্বিধার দেয়াল।
#দ্বিধা
কলমে:সুবর্না শারমিন নিশী