21/03/2026
১৯৮৩ সাল | ফ্লাডলাইটে সন্তোষ ট্রফির ম্যাচ | বাংলা বনাম সার্ভিসেস | মোহনবাগান মাঠে উপচে পড়েছে ভিড় | খেলা শুরু হল | প্রশান্ত ব্যানার্জীর বাড়ানো বলটা পেল ছেলেটা | মাথায় ঝাঁকড়া চুল | বাঁ পায়ে ড্রিবল করার দুর্দান্ত ক্ষমতা | ছেলেটার সামনে তখন সার্ভিসেস দলের তিনজন ডিফেন্ডার | বলটা নিয়ে ডানদিকে কোনাকুনি গেল চলল সে | তারপর একটু এগিয়ে হাফটার্নে প্রায় পঁয়ত্রিশ গজ থেকে বাঁ পা দিয়ে একটা গোলা বেরোল | সার্ভিসেসের গোলকিপার স্বাভাবিকভাবেই ডান পোস্ট কভার করেছিল | একটুও নড়তে পারল না গোলকিপার | বাঁ পোস্ট আর বারের কোনা দিয়ে গোলে জড়িয়ে গেল বলটা | বাংলা জিতেছিল ৬-০ | ছেলেটা সেদিন ১টা গোল ছাড়াও আরও তিনটে গোলেও প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল |
১৯৮৫ সাল | ছেলেটা তখন ইস্টবেঙ্গলে | যুবভারতীতে মহামেডানের সাথে ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ | দুই দলের দর্শকদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা | পি কে বন্দ্যোপাধ্যায় কোচ ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের | ম্যাচের শুরুতে তিনি নামালেন না ছেলেটাকে | দুঃখ পেল | খেলা শুরুর সাথে সাথেই চিমার গোলে পিছিয়ে যায় লাল হলুদ শিবির | খেলা শুরু অনেক পরে নামল ছেলেটা | নেমেই দুটো পাস । তার থেকে দুটো গোল । মাঠে যেন সে দিন ফুল ফুটিয়েছিল ছেলেটা । ড্রিবলের পর ড্রিবল । নিখুঁত চেরা পাস । কিছুতেই রোখা যাচ্ছিল না ওকে । ম্যাচের পর বাচ্চার মতো টগবগ করে ফুটছিল ও । আদরে - আবেগে ভেসে গিয়েছিল ।
১৯৮৮ সাল | ইষ্টবেঙ্গল - মোহনবাগান ম্যাচে এক অনভিপ্রেত কলিশানে কার্টিলেজে সাংঘাতিক আঘাত পেল ছেলেটা | খেলা বন্ধ । মাঠের বাইরে দমবন্ধ করা জীবন । লোকজন ল্যাংড়া বলে কটাক্ষ শুরু করে দিল | লোকে ধরেই নিল এই ছেলে আর কোনওদিন মাঠে নামতে পারবে না | ছেলের রক্তে ফুটবল | শুরু হলো দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই | পাশে দাঁড়ালেন সুদীপদা (চট্টোপাধ্যায়) | তার তত্ত্বাবধানে শিবপুরের মাঠে চলল প্র্যাকটিস, প্রতিদিন কাকভোরে রেসের মাঠের বালিতেও চলল হাড় ভাঙ্গা অনুশীলন | ১৯৮৯-এ ইস্টবেঙ্গল থেকে প্রস্তাব এল । কিন্তু মাত্র ২৫০০০ টাকা দেওয়ার কথা হলো ক্লাব থেকে | ছেলেটা লালহলুদ শিবিরকে বলল আমার টাকা লাগবে না, যদি ভালো খেলি তখন টাকা দেবেন | বাকিটা ইতিহাস | এয়ারলাইন্স কাপে পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করে আখ্যা পেল ‘ভারতের মারাদোনা’ ! ওই সালেই হলেন ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক | ইস্টবেঙ্গল কলকাতা লিগ জিতল | ছয় বছর পর ঘরে এল ডুরান্ড | তারপর শিল্ড, রোভার্স....আরও কত কি | ১৯৯২ সালে ফিরে এলেন সবুজ মেরুন শিবিরে | ছেলেটার বাড়িতে সেদিন লাল হলুদ সমর্থকদের ইটবৃষ্টি | পাঁচ দিন টানা পুলিশি পাহারা | কতই স্মৃতি....
ছোট থেকেই ফুটবল আর ফুটবল | একটি ছোটদের টুর্নামেন্টের ফাইনালের শেষে সবাই বাড়ি ফিরে এসেছে,শুধু ছেলেটি বাড়ি ফেরেনি। মা চিন্তিত, সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন। পরে জানা গেল সেদিনের খেলায় ছেলেটির দল তিন গোলে জিতেছে,এবং তিনটি গোলই ছেলেটির। বিপক্ষের কর্মকর্তারা খেলার শেষে তাকে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পৌঁছে দিলেন অনেক পরে।
ছেলেটার নাম কৃশানু | কৃশানু দে | ডাকনাম রন্টু | বাড়ি নাকতলায় | প্রথম জীবনে ক্রিকেট ছিল ধ্যান জ্ঞান | পাশাপাশি ফুটবলটাও খেলতেন | পাড়ার এক দাদা একদিন নিয়ে গেলেন ফুটবল কোচ অচ্যুত বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে | রবীন্দ্র সরোবরের পাশের মাঠে উনি প্রাকটিস করাতেন | সেখানে একবার এক স্থানীয় প্রতিযোগিতায় রন্টুদা গোলকিপার হিসাবে খেলেন আর সোনার আংটি উপহার পান | কিন্তু অচ্যুত বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝলেন এই ছেলে গোলকিপার হওয়ার জন্যে জন্মায়নি | ছোটবেলায় বাঁ পা ছিল সামান্য বাঁকা, অথচ সেই পায়েই অসাধারণ ডজ | অচ্যুৎ স্যার ছাত্রকে তালিম দিলেন কিভাবে দুটো আলাদা পায়ের গঠন নিয়ে সেই দুই পায়ের ব্যবহার কি হবে | হেরে গেলে ছাত্রকে কোচ বকতেন না, মনের জোর বাড়িয়ে দিতেন ভালবেসে |
আজও চোখে ভেসে ওঠে কৃশানু-বিকাশ জুটির কথা | ঠিকানা লেখা পাস বাড়াচ্ছেন কৃশানু, সেই পাস ধরে গোল করছেন বিকাশ ৷ ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যে, সেটা শুধু মাঠ নয়, মাঠের বাইরেও চলে এল।এমন অনেক সময় হয়েছে যে রন্টুর জন্য কম টাকায় খেলছে বিকাশ। আবার উল্টোটাও হয়েছে। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব কতটা গভীর থাকলে অমনটা সম্ভব | কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিন....
রাজেশ খন্নার অন্ধভক্ত ছিল রন্টুদা | যতবারই ‘আনন্দ’ দেখতেন, ততবারই চোখের জলে ভাসাতেন ।খুব ভালোবাসতেন ইলিশ মাছ | মাটির মানুষ বললেও কম বলা হয় । গালিগালাজ তো কোন ছার, কোনও দিন উঁচু গলায় কথা বলতেন না রন্টুদা | শান্তশিষ্ট ছেলেটা মাঠে নামলে কী ভয়ঙ্কর ভাবে পাল্টে যায় ! লম্বা লম্বা শক্তপোক্ত চেহারার সব ডিফেন্ডারকে চোখের নিমেষে কী করে পেরিয়ে যায়.....বাঁ পায়ে ড্রিবল করছেন কৃশানু দে | কি সব দিন ছিল সে সব। চলে গেছে। চিরতরে। আর হবে না |
২০০২ সাল | দার্জিলিংয়ে অফিসের হয়ে খেলতে গিয়ে পা ভেঙে বাড়ি ফেরেন রন্টুদা | ভুগলেন টানা ছয় মাস | মার্চের ১৩, হঠাৎ ব্লাড প্রেসার প্রচণ্ড কমে গেল । ল্যান্সডাউন নার্সিং হোমে ভর্তি করা হল । অবস্থা ক্রমে খারাপের দিকে । নার্সিংহোম বদলিও করা হল । উডল্যান্ডস । তাতেও কিছু হল না । পালমোনারি এমবলিজমে ধরল । জমাট রক্ত আক্রমণ করে বসল ফুসফুসে । ২০ মার্চ ২০০৩ । দুপুরবেলা....কোথায় হারিয়ে গেল রন্টুদা |
১৯৮১ সালে আন্তঃ রেল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পোর্ট দল । পোর্টের হয়ে মহমেডানের ম্যাচের পর আজকালে শিরোনামে ছিল----
“কৃশানু সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন !”
সত্যিই তাই | মাঠেও যেমন তিনি সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন....জীবনের পথেও তিনি সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন.....
প্রয়াণদিনে জাদুকরকে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য......
© অহর্নিশ
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা, দেবাশীষ সেনগুপ্তের লেখা