26/06/2026
বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলারদের জন্য ভিন্ন ট্রফি, ফিফার বিশেষ পদক্ষেপের নেপথ্যে কী?
বিশ্বকাপ ফুটবলে ম্যাচের সেরা (ম্যান অফ দ্য ম্যাচ) খেলোয়াড়দের দেওয়া ট্রফি নিয়ে সম্প্রতি এক নতুন আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একাংশের অভিযোগ ছিল, মুসলিম ধর্মাবলম্বী ফুটবলারদের আলাদা ট্রফি দিয়ে বৈষম্য করা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিষয়টি মোটেও বৈষম্যের নয়; বরং মুসলিম ফুটবলারদের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA) এই বিশেষ ও সংবেদনশীল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ও আসল সত্য
বিশ্বকাপের ম্যাচের সেরা পুরস্কারের মূল স্পনসর একটি নামী মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা—‘মিশেলব আল্ট্রা’ (Michelob Ultra)। স্বাভাবিকভাবেই এই ট্রফিতে সংস্থাটির নাম ও লোগো খোদাই করা থাকে এবং পুরস্কার নেওয়ার সময় ব্যাকড্রপেও (পেছনের পর্দায়) মদের ব্র্যান্ডটির বিজ্ঞাপন থাকে। লিয়োনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বা ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের মতো তারকারা এই ট্রফি নিয়েই ছবি তুলেছেন।
তবে ইসলাম ধর্মে মদ্যপান ও এর প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়ায় অনেক মুসলিম ফুটবলারই এই ব্র্যান্ডিংয়ের মুখোমুখি হতে অস্বস্তি বোধ করেন। এই সংবেদনশীলতা বজায় রাখতেই ফিফা মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য একটি বিকল্প ও মদের লোগোবিহীন ট্রফির ব্যবস্থা করেছে।
কী কী পরিবর্তন করা হয়েছে?
লোগো বর্জন: মুসলিম ফুটবলাররা ম্যাচের সেরা হলে তাঁদের যে ট্রফি দেওয়া হচ্ছে, তাতে ওই মদ প্রস্তুতকারক সংস্থার নাম বা লোগো থাকছে না।
বিজ্ঞাপনমুক্ত ব্যাকড্রপ: পুরস্কার নেওয়ার পর ছবি তোলার জন্য যে ব্যাকড্রপ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখান থেকেও মদের ব্র্যান্ডের নাম সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
অনন্য সাধারণত্ব: ট্রফির বাহ্যিক রূপ ও গুরুত্ব বাকিদের মতোই এক থাকছে, কেবল মদের ব্র্যান্ডিংটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত? অতীতের কিছু অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা
ফিফার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে অতীত বিশ্বকাপের কিছু বিতর্কিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা। খেলোয়াড়দের কঠোর ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অবস্থানের কারণেই ফিফা এবার আগে থেকেই সতর্ক ছিল।
১. মোহামেদ এল শেনায়ির ট্রফি প্রত্যাখ্যান (২০১৮)
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলে 'ম্যান অফ দ্য ম্যাচ' নির্বাচিত হন মিশরের গোলরক্ষক মোহামেদ এল শেনায়ি। তৎকালীন স্পনসরও ছিল একটি মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে শেনায়ি সেই ট্রফিটি নিতে সরাসরি অস্বীকার করেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
২. কিলিয়ান এমবাপের লোগো বিতর্ক (২০২২)
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপে ম্যাচের সেরা হয়ে ট্রফি নেওয়ার সময় কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি ট্রফিতে থাকা মদের লোগোটি হাত দিয়ে ঢেকে ছবি তোলেন। মদের ব্র্যান্ডের প্রচার করতে রাজি না হওয়ায় ফিফা তাঁকে জরিমানাও করে, তবুও এমবাপে তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন।
উল্লেখ্য: শুধু এমবাপেই নন, ২০২২ বিশ্বকাপে বেশ কয়েকজন মুসলিম ফুটবলারও একইভাবে হাত দিয়ে লোগো ঢেকে ছবি তুলেছিলেন। যার ফলে মুসলিম ভক্তদের মধ্যে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগ ওঠে।
মূল্যায়ন
অতীতের এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিফা এবার কোনো প্রকার বিতর্কের সুযোগ রাখতে চায়নি। বৈষম্য নয়, বরং "সবার জন্য অন্তর্ভুক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা" (Inclusivity and Respect) নিশ্চিত করতেই ফিফার এই অগ্রিম ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এর ফলে খেলোয়াড়রা যেমন তাঁদের ধর্মীয় অনুশাসন বজায় রাখতে পারছেন, তেমনই মাঠের পারফরম্যান্সের যথাযথ স্বীকৃতিও নিশ্চিত হচ্ছে।