19/03/2026
আলী লারিজানির মেয়ে ফাতেমেহ আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে ক্যান্সার স্পেশালিস্ট ডাক্তার ছিলেন। ইরান যুদ্ধের আগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কেউ কেউ বলছেন, মেয়ের সাথে যোগাযোগের সূত্র ধরে লারিজানিকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে।
তবে নির্ভরগেযাগ্য কোনো সূত্র থেকে এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। আলী লারিজানি ছিলেন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (SNSC) প্রধান। তিনি এত সহজে লোকেশন ট্রাক করতে দেওয়ার কথা না।
সর্বপ্রথম ফার্স নিউজ তথ্য দেয় যে, আলী লারিজানি ইরানের পার্দিস এলাকায় তার মেয়ের বাড়িতে ছিলেন। সেখানে হামলা করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। সেই সূত্রে টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতীয় কয়েকটি মিডিয়া এই খবর প্রকাশ করে। তবে পরদিন ইরান ইন্টারন্যাশনাল এসএনএসসির কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, মেয়ের বাড়িতে থাকা সংক্রান্ত খবর মিথ্যা।
আলী লারিজানির দুই মেয়ে। ফাতেমেহ লারিজানি ও সারা লারিজানি। ফাতেমেহ তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিশেষায়িত ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি হেমাটোলজি এবং অনকোলজিতে বিশেষজ্ঞ, এমোরি ইউনিভার্সিটির ওয়িনশিপ ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ছিলেন। এ বছরের জানুয়ারিতে তার বাবাকে সন্ত্রাসী অভিহিত করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তিনি দেশে ফেরেন।
দ্বিতীয় মেয়ে সারা লারিজানি খাজে নাসিরউদ্দিন টুসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। ইরানের অনেকে তাকে সামাজিক কর্মী হিসেবে জানেন। কিন্তু তিনি অত পাবলিক লাইফ লিড করেন না। কোনো কোনো সূত্রে বলা হয়, তিনি বর্তমানে কানাডায় বসবাস করেন।
আলী লারিজানিকে কীভাবে হত্যা করা হয়, সেটা নিয়ে জেরুজালেম পোস্ট একটা প্রতিবেদন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানি ছিলেন এক নাম্বার টার্গেট। লারিজানিকে দুই সপ্তাহ ধরে ইসরাইল হন্যে হয়ে খুঁজতেছিল। কিন্তু তাকে ট্রাক করা যাচ্ছিল না। বারবার জায়গা পরিবর্তন করছিলেন। কোনো সরকারি বাসভবন বা অফিসে তিনি থাকতেন না। একেকদিন একেক গোপন সেফ হাউজে থাকতেন, সব ধরনের লোকেশন ট্রাকিং সিগনাল এড়িয়ে চলতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল একটা বিশেষ গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার অবস্থান শনাক্ত করে।
ব্লেড মোসের একটা বিশ্লেষণে বলা হয়, চারদিন আগে কুদস দিবসে লারিজানি রাস্তায় প্রকাশ্যে মিছিল করেছিলেন। এরপর থেকে তার গতিবিধি নজরদারি করতে সুবিধা হয়। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, “লারিজানি ও শীর্ষ সামরিক নেতাদের ব্যাপারে তথ্য দিলে এক কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। যে তথ্য দিবে, তাকে নিরাপদে অন্য দেশে নেওয়া হবে।” এর ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, তার আশেপাশের লোক ইনফর্মার হতে পারে।
১৬ মার্চ ২০২৬ লারিজানি-সহ শীর্ষ কয়েকজনের লোকেশন নিশ্চিত হয় ইসরাইল। খবরে বলা হচ্ছে, এই রাতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নতুন মোসাদ প্রধান রোমান গফম্যানকে বড় অপারেশন অনুমোদন করেন। তিনটি শহরে একযোগে হামলা হয়– তেহরান, শিরাজ, তাবরিজ।
লারিজানি ছিলেন তেহরানের কাছে একটি গোপন সেফ হাউজে। সেখানে অত্যন্ত প্রিসাইজ স্ট্রাইক করা হয়। ওই হামলায় আলী লারিজানি, তার ছেলে মোরতাজা ও কয়েকজন দেহরক্ষী শহীদ হন। একই রাতে অন্য হামলায় ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান, আইআরজিসি এয়ারোস্পেস কমান্ডার, বাসিজের বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা নিহত হন।
মিডলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আলী লারিজানি শুধু নিরাপত্তা প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। পশ্চিমা দর্শন বিশেষ করে ইমানুয়েল কান্ট নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বইও লিখেছেন।
লারিজানি ইরানের বিদেশনীতি, পারমাণবিক নীতি ও যুদ্ধনীতির কৌশল তৈরিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণিক আলোচনায় একজন প্রাগমেটিক নেতা হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। ইরানের সংসদের স্পিকার ছিলেন অনেক বছর। খামেনির পর তাকেই সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা মনে করা হতো, কার্যত তিনিই দেশ চালাচ্ছিলেন।
এছাড়া লারিজানি পারিবারিকভাবে অনেক প্রভাবশালী ছিলেন। ধর্ম, রাজনীতি, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা, মিডিয়া, শিক্ষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ- সবকিছু্তেই তার একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল। ব্যক্তিগত ধর্মশিক্ষা ও প্রাক্টিসের বাইরে তার নিজের পড়াশোনা ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আধুনিক সেক্যুলার সংমিশ্রণ ছিল।
লারিজানি আগে একজন শান্ত বাস্তববাদী নেতা ছিলেন। খামেনির মৃত্যুর পর হয়ে উঠেছিলেন কঠোর। আমেরিকা ও ইসরাইলকে কঠিন শিক্ষা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাকে কবুল করুন।