07/08/2026
#ভয়ংকর #বাঁশঝাড়ের #অলক্ষ্মী
শেওলা ধরা পুরনো দিঘির ঘাটে তখন সন্ধ্যে নেমে এসেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বাঁশের ঘর্ষণে একরকম অদ্ভুত ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ। রতন কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল। গাঁয়ের বয়োজ্যেষ্ঠরা সবসময় বারণ করে—সূর্য ডুবলে ঘোষদের পরিত্যক্ত ভিটার পাশ দিয়ে যাওয়া বারণ। কিন্তু আজ রতনের বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে, আর ওই ভিটার মাঝের পথটা ছাড়া অন্য পথ দিয়ে যেতে গেলে অনেকটা ঘুরতে হবে।
রতন পকেট থেকে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বেলে বাঁশঝাড়ের অন্ধকার গলিপথে পা দিল। কুয়াশার মতো থমথমে হাওয়া হাড় কাঁপিয়ে দেয়। হঠাৎ সে অনুভব করল, তার ঠিক পেছন পেছন কেউ হাঁটছে। ভিজা মাটির ওপর খালি পায়ের ধুপধাপ আওয়াজ।
রতন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে আলো ফেলল। কেউ নেই। শুধু বাতাসে একটা তীব্র পচা গন্ধ ভেসে এল, যেন বহুকাল আগের কোনো বাঁসি লাশের গন্ধ। বুকটা কেঁপে উঠল রতনের। সে হাঁটার গতি বাড়াল।
কিছুদূর যেতেই পথটা যেন হুট করে শেষ হয়ে গেল। যে রাস্তা সে চেনে হাতের তালুর মতো, সেখানে এখন শুধু ঘন জঙ্গল আর উঁচু উঁচু বাশের ঝাড় পথ আটকে দাঁড়িয়ে। সে পথ হারিয়ে ফেলেছে! ঠিক তখনই ওপর থেকে কিসের যেন ফোঁস ফোঁস শব্দ।
রতন ভয়ে ভয়ে লাইটটা ওপরের দিকে তুলল। বাঁশের ডালটা অদ্ভুতভাবে নিচে নুয়ে পড়েছে, আর সেটার ওপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে এক নারীমূর্তি। মাথাভর্তি এলোমেলো লম্বা চুল, আর শরীরজুড়ে সাদা থান পরা। রতন লাইটের আলোটা ধরতেই মূর্তিটি আস্তে আস্তে মুখ তুলল।
চোখ দুটো কয়লার মতো কালো, কোনো মণি নেই, আর মুখজুড়ে বিকট রক্তস্নাত এক হাসি। লাল ডালপালার মতো নখওয়ালা হাত দুটো রতনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে এক কর্কশ গলায় বলে উঠল, "কোথায় যাবি? এত বছর পর তো কাউকে পেলাম..."
রতন চিল- চিৎকার দিয়ে হাতের মোবাইল ফেলে দিয়ে উল্টোদিকে দৌড় দিল। পেছনে শুনতে পেল সেই বীভৎস হাসির শব্দ আর বাঁশঝাড়ের পাতার মড়মড় আওয়াজ, যেন ডালপালাগুলো তাকে ধরে ফেলার জন্য নিচে নেমে আসছে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে কোথায় যাচ্ছে কিচ্ছু জানে না, শুধু বুঝতে পারছিল তার ঘাড়ে থুতনির কাছে হাড়হিমে ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস এসে পড়ছে।
পরদিন সকালে গ্রামের লোক রতনকে দিঘির পাড়ের এক বিশালাকার বাঁশগাছের চূড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। উদ্ধার করার পর রতন তিন দিন কোনো কথা বলতে পারেনি, শুধু হাঁ করে ঘোষের ভিটার দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে জল ফেলত। গাঁয়ের লোক আজও বিশ্বাস করে—সেদিন রতন বেঁচে ফিরেছিল বটে, কিন্তু তার আত্মার অর্ধেকটা রয়ে গেছে ওই বাঁশঝাড়ের অন্ধকারেই।
গল্পটি কেমন লেগেছে আমাকে জানান।