14/06/2026
ব্রাজিল সম্ভবত তাদের ইতিহাসের অন্যতম দুর্বল স্কোয়াড নিয়েই এবার বিশ্বকাপে এসেছে।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই এই দল নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। প্রথম ম্যাচের পর অন্তত এটুকু পরিষ্কার, এই দলের সর্বোচ্চ গন্তব্য হয়তো রাউন্ড অব ১৬ কিংবা কোয়ার্টার ফাইনাল।
সমস্যাটা শুধু একটি জায়গায় নয়। দলের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই ঘাটতি চোখে পড়ছে।
ডিফেন্স দিয়ে শুরু করলে, ফুলব্যাক পজিশন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। ডগলাস সান্তোস আজ মোটামুটি ভালো খেললেও অন্য প্রান্তে ইবানেজের ওভারল্যাপ করতে গিয়ে অবস্থানগত ভুলের মূল্য দিতে হয়েছে দলকে। নকআউট পর্বের চাপের ম্যাচে এই ধরনের ভুলই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। বর্তমান ফুলব্যাকদের দেখে মনে হয়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একজনের ভুলেই পুরো দলকে মূল্য দিতে হতে পারে।
মিডফিল্ডের অবস্থা আরও হতাশাজনক। ফুটবলে একটি দলের ছন্দ, নিয়ন্ত্রণ ও গতি নির্ধারণ করে মিডফিল্ড। অথচ ব্রাজিলের মিডফিল্ডাররা অনেক সময় নিজেদের মধ্যেই সহজ পাস আদান-প্রদান করতে গিয়ে বল হারাচ্ছেন। বল দখল ধরে রাখা, খেলা গড়া কিংবা দ্রুত ট্রানজিশন তৈরি করার ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
ক্যাসেমিরো নিঃসন্দেহে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারদের একজন ছিলেন, কিন্তু সময় কাউকে ছাড় দেয় না। তার গতির ঘাটতি এখন চোখে পড়ার মতো। এমন ধীরগতির মিডফিল্ড নিয়ে আধুনিক, দ্রুতগতির ফুটবল খেলাটা কঠিন।
সৃজনশীলতার অভাবও প্রকট। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগে কার্যকর পাস বা সুযোগ তৈরির সংখ্যা খুবই কম। একসময় এই দায়িত্বটা অনেকটাই নেইমার সামলাতেন। কিন্তু চোট আর ফিটনেস সমস্যার কারণে তার কাছ থেকেও আগের মতো ধারাবাহিক অবদান আশা করা কঠিন। ফলে আক্রমণভাগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ও দিকহীন দেখায়।
আক্রমণভাগে ব্রাজিলের নামের জৌলুস বরাবরের মতোই আছে, কিন্তু কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইতিহাসে যে দেশের হয়ে খেলেছেন রোনালদো নাজারিওর মতো কিংবদন্তি, সেই দলকে এখন গোলের জন্য ভরসা করতে হচ্ছে অনেক কম প্রমাণিত নামগুলোর ওপর। রাফিনহা জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। ফরোয়ার্ডদের মধ্যেও বোঝাপড়ার ঘাটতি স্পষ্ট। দ্রুত ওয়ান-টাচ কম্বিনেশন, ট্রানজিশন কিংবা ফাইনাল থার্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা বারবার সমস্যায় পড়ছে।
এই সবকিছুর মাঝেও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই সবচেয়ে বড় আশার নাম। তার ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং মুহূর্ত তৈরি করার ক্ষমতা ব্রাজিলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখছে। কিন্তু শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভর করে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়।
অবশ্য এসব সমস্যা নতুন নয়। অনেকদিন ধরেই ব্রাজিলের স্কোয়াডে ভারসাম্যের অভাব ছিল। রদ্রিগো, এস্তেভাও কিংবা মিলিতাওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের ইনজুরি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। এর মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছেন কার্লো আনচেলোত্তি। কিন্তু মাত্র এক বছরের প্রস্তুতিতে, সীমিত বিকল্প এবং অনিয়মিত পারফরম্যান্সের খেলোয়াড়দের নিয়ে অলৌকিক কিছু করা কোনো কোচের পক্ষেই সহজ নয়। এখনো পর্যন্ত তিনি একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য প্রথম একাদশও পুরোপুরি গড়ে তুলতে পারেননি। ফলে দলীয় সমন্বয়, বোঝাপড়া এবং রসায়নেও ঘাটতি রয়ে গেছে।
তাই ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য হয়তো এই বিশ্বকাপ বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময়। ট্রফির স্বপ্ন দেখার চেয়ে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টা উপভোগ করাই বেশি অর্থবহ হতে পারে। কারণ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান এই খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের জার্সিতে হয়তো আর বেশিদিন দেখা যাবে না।
আর যদি দলটি সেমিফাইনাল বা ফাইনালে না-ও পৌঁছায়, সেটাও হয়তো খুব বড় আক্ষেপের হবে না। কারণ বর্তমান ব্রাজিলকে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল বা আর্জেন্টিনার মতো পরিণত দলগুলোর সামনে দাঁড়াতে হলে ফলাফল কতটা কঠিন হতে পারে, তা কল্পনা করা কঠিন নয়। ২০১৪ সালের সেই স্মৃতি এখনো অনেক সমর্থকের কাছে দুঃস্বপ্ন। নতুন কোনো সংখ্যাকে যেন আর ইতিহাসে যোগ করতে না হয়, সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।