31/08/2026
২০০৫ সালের আগস্ট। আঠারো বছরের এক রোগাটে ছেলে, উচ্চতায় খাটো, কিন্তু পায়ে জাদু নিয়ে জন্মানো — লিওনেল মেসি প্রথমবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামল। অভিষেক ম্যাচেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে, কারো ধারণাও ছিল না যে এই ছেলেটাই একদিন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠবে।
শুরুর বছরগুলো ছিল যন্ত্রণার। বার্সেলোনায় যে মেসি জাদু দেখাতেন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে সেই মেসিকে যেন খুঁজে পাওয়া যেত না। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুটো কোপা আমেরিকা ফাইনালে হার — প্রতিবারই ট্রফির এত কাছে গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। ২০১৬ সালের সেই রাতে, চিলির কাছে পেনাল্টিতে হেরে যাওয়ার পর মেসি ঘোষণা দিয়েছিলেন, জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়াবেন। সমালোচকরা বলত, ঘরের মাটিতে যতই দেবতা হোন, দেশের জার্সিতে তিনি ব্যর্থ। কথাটা মেসির বুকে গেঁথে গিয়েছিল।
কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো এমন গল্প লেখে যা কল্পনাকেও হার মানায়। আর্জেন্টিনার আকুতি, সতীর্থদের ভালোবাসা, আর নিজের ভেতরের এক অদম্য জেদ মেসিকে ফিরিয়ে আনল। ২০২১ সালে অবশেষে এলো প্রথম শিরোপা — কোপা আমেরিকা জয়, মারাকানার মাটিতে ব্রাজিলকে হারিয়ে। মেসির চোখের জল সেদিন বলে দিয়েছিল, কতদিনের অপেক্ষা ছিল এই মুহূর্তের জন্য।
তারপর এলো ২০২২ সাল, কাতার বিশ্বকাপ। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় ম্যাচ — এমবাপের হ্যাটট্রিকের বিপরীতে মেসির দুই গোল, টাইব্রেকারে জয়। অবশেষে বিশ্বকাপ, যে ট্রফির জন্য পুরো একটা প্রজন্ম অপেক্ষা করেছিল। লুসাইল স্টেডিয়ামে যখন মেসিকে ঐতিহ্যবাহী "বিশত" পরিয়ে ট্রফি তুলে দেওয়া হলো, গোটা আর্জেন্টিনা কেঁদেছিল আনন্দে। ২০২৪ সালে যোগ হলো আরেকটা কোপা আমেরিকা শিরোপা।
তবু ফুটবল-দেবতা তার শেষ পরীক্ষা নিতে ভোলেননি। ২০২৬ বিশ্বকাপে ঊনচল্লিশ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন মেসি — আট গোল, চার অ্যাসিস্ট নিয়ে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। এত কাছে গিয়েও আরেকবার হাত ফসকে গেল শিরোপা। এরপর, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে, মেসি হারালেন তার বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসিকে — এক ব্যক্তিগত শোক, যা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটা হয়ে থাকবে।
আজ, ৩১ আগস্ট ২০২৬, সেই দীর্ঘ, ঘটনাবহুল যাত্রার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন মেসি নিজেই — সামাজিক মাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তায় জানিয়ে দিলেন, জাতীয় দলের হয়ে তার পথচলা শেষ। ২০৭টি ম্যাচ, ১২৫টি গোল, দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক মহাকাব্যিক ক্যারিয়ার — যেখানে ছিল হাহাকার, সমালোচনা, চোখের জল, আবার ছিল প্রতিশোধ, গৌরব আর মুকুট। একটা ছেলে, যাকে একসময় "শুধু ক্লাবের প্লেয়ার" বলে খোঁচা দেওয়া হতো, শেষমেশ হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা, সবচেয়ে বেশি গোলদাতা।
মেসির বিদায় তাই শুধু একটা খেলোয়াড়ের অবসর নয় — এটা একটা প্রজন্মের বেড়ে ওঠার, ভেঙে পড়ার, আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। আর্জেন্টিনা এখন অপেক্ষায়, তাদের রাজপুত্রকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়ার — এমন একটা সংবর্ধনা, যা তার প্রাপ্য।