06/04/2026
লিখন:একজন হারিয়ে যাওয়া রিশাদের রূপকথা
বাংলাদেশ ক্রিকেটে “যদি” শব্দটা খুব পরিচিত—আর সেই “যদি”-র তালিকায় একদম ওপরে যে নামগুলোর একটি থাকে, সে হলো জুবায়ের হোসাইন লিখন।প্রতিভা, সম্ভাবনা—সবই ছিল। কিন্তু গল্পটা শেষ হয়েছে খুব দ্রুত, অপ্রত্যাশিতভাবে।
লিখনকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। কেউ দায় দেন বিসিবির পরিকল্পনার অভাবকে, কেউ আবার বলেন নিজের অনিয়মিততা ও খামখেয়ালিও ছিল বড় কারণ। প্র্যাকটিসে অনিয়ম, সুযোগের অভাব—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তাকে নিয়ে এতো অবহেলা , গাফিলতি না থাকলে হয়তো আমরা ২০২০ এ যে রিশাদকে পেয়েছি, তার অনেক আগেই আরেকজন লিখনকে পেতে পারতাম, যে ভয় ধরাতো কোহলিদের। তবে আজ সেই তর্কে না গিয়ে বরং দেখা যাক, ছেলেটা কী হতে পারত।
২০১৫ সালে ভারতের বিপক্ষে ফতুল্লার সেই টেস্টটা অনেকেরই মনে আছে। বৃষ্টির কারণে দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচে ভারতের ওপেনিং জুটি ভালোই জমে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে বল হাতে খুব নিয়ন্ত্রিত না থাকলেও হঠাৎই ম্যাচে ছাপ ফেলেন লিখন। তাঁর গুগলিতে বোল্ড হন বিরাট কোহলি—যা যে কোনো তরুণ লেগস্পিনারের জন্য বিশাল অর্জন।
সেদিন শুধু কোহলিই নন, একই ম্যাচে আরেকটি অসাধারণ ডেলিভারিতে বোল্ড করেন ঋদ্ধিমান সাহা-কেও। ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে ঢুকে যাওয়া সেই বল এখনো অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর কাছে বাংলাদেশের স্পিন ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাকিব আল হাসান-এর মন্তব্য ছিল আশাবাদী—তিনি বিশ্বাস করতেন, লিখন ভবিষ্যতে ৩০০ থেকে ৪০০ উইকেট নেওয়ার মতো বোলার হতে পারেন। তবে একইসাথে তিনি এটাও উল্লেখ করেছিলেন, পর্যাপ্ত ম্যাচ না খেললে একজন লেগস্পিনারের পক্ষে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন।
বাস্তবতা হলো, সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেক, আর ২০১৫-এর মধ্যেই কার্যত ক্যারিয়ারের সমাপ্তি। এমনকি বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ-এর ২০১৫ আসরে তিনি অবিক্রিতই থেকে যান। পরে ২০২১ সালে বিপিএলে অভিষেক হলেও সেখানেও নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ খুব একটা কাজে লাগাতে পারেননি—মাত্র ৫ ম্যাচে কোনো উইকেটই পাননি।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, এত বছর পরও বয়সের হিসেবে তিনি এখনো খুব বেশি বড় নন—২০২৫ সালে এসেও মাত্র ২৯। অর্থাৎ, ক্যারিয়ারটা লম্বা হওয়ার যথেষ্ট সময় ছিল, কিন্তু সেই পথটা আর খোলা থাকেনি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পরিসংখ্যানও খারাপ নয় মোটেই—
টেস্ট: ৬ ম্যাচে ১৬ উইকেট
ওয়ানডে: ৩ ম্যাচে ৪ উইকেট
টি-টোয়েন্টি: ১ ম্যাচে ২ উইকেট
মোট ১০ ম্যাচে ২২ উইকেট—একজন কিশোর লেগস্পিনারের জন্য যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক সূচনা।
তাই আফসোসটা থেকেই যায়। অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে উঠে এসে জাতীয় দলে শুরুতেই নিজের সামর্থ্যের ঝলক দেখানো এক তরুণ—যার সামনে বড় মঞ্চ ছিল—সেই গল্পটা পূর্ণতা পেল না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে তাই লিখনের নামটা হয়তো পরিসংখ্যানে বড় নয়, কিন্তু “হতে পারত” তালিকায় সে সবসময়ই থাকবে।