25/04/2015
পাকিস্তানকে বলা হয় টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বিশ্বের অন্যতম সেরা। একবার ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম এই ফরম্যাটে বিশ্বকাপ জেতারও ইতিহাস আছে তাদের। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সর্বোচ্চ উইকেট-শিকারি শীর্ষ তিন বোলারই এই পাকিস্তানের। শহীদ আফ্রিদির নেতৃত্বে এই দলের বাকি নামগুলো দেখুন-সমীহ কিন্তু জাগবেই। কিন্তু আজ মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে এই দলটিকেই উড়িয়ে দিয়ে ৭ উইকেটের দুর্দান্ত এক জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। এ কোন বাংলাদেশ? এটা সেই বাংলাদেশ যে বাংলাদেশকে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে দুর্বলতম দল বলতেও দ্বিধান্বিত হন না অনেক বোদ্ধাই।
এ তো নতুন দিনের বাংলাদেশই। ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করেই নিজেদের বদলে যাওয়ার উদাহরণটা গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার কাছেই রাখা হয়ে গেছে বাংলাদেশের। আজ টি-টোয়েন্টিতেও পাকিস্তানকে একই স্টাইলে উড়িয়ে দিয়ে পাল্টে যাওয়ার ব্যাপারটির শক্ত ভিত্তিই দিয়ে দিল মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবালদের বাংলাদেশ।
টসজয়ী পাকিস্তান প্রথমে ব্যাট করতে নেমেই বুঝে গিয়েছিল টি-টোয়েন্টিতেও বাংলাদেশ সহজে ছেড়ে দিচ্ছে না। টসের সময় আফ্রিদি নিজেদের লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন ১৬০। ভেবেছিলেন ওই রান করলেই বাংলাদেশকে এলোমেলো করে দেওয়া যাবে। কিন্তু এলোমেলো হওয়া কাকে বলে সেটা পাকিস্তান দেখল নিজেদের ইনিংস শুরু করেই। মুস্তাফিজুর রহমান আর সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ১৪১ রানে আটকে থাকার পর ওই সাকিবই আবার ব্যাট হাতে নাকাল করলেন তাদের। সঙ্গে ছিলেন সাব্বির রহমান। এই যুগলের দুটি ফিফটিতে ২২ বল বাকি থাকতেই ম্যাচ বাংলাদেশের। ওয়ানডের মতো টি-টোয়েন্টিতেও অসহায়ভাবেই আত্মসমর্পণ পাকিস্তানের।
১৪১ রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল একটু ঘেমে-নেয়েই। তামিম ইকবাল মোহাম্মদ হাফিজের প্রথম ওভারেই ১৪ রান তুলে নিয়ে স্টেডিয়াম উন্মাতাল করে দিলেও খুব দ্রুতই সাজঘরে ফেরেন সৌম্য সরকার। অপ্রয়োজনীয় একটি রান নিতে গিয়ে সাঈদ আজমলের দারুণ এক ডাইরেক্ট থ্রো’এর শিকার হন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সৌম্য। উমর গুলের বলে এর কিছুক্ষণ বাদেই আউট তামিম। অফস্টাম্পের বাইরের একটি বলে ফ্ল্যাশ খেলে স্লিপে হাফিজের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। এই সফরে এই প্রথমবারের মতো দ্রুত উইকেট হারানোর ধাক্কাটা বাংলাদেশ কীভাবে সামলায়, দেখার বিষয় ছিল সেটিও। ১৯ রানে মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকুর রহিমও আউট হয়ে গেলে বড় ধরনের পরীক্ষার সামনেই পড়েন সাকিব আল হাসান আর ব্যাটিং অর্ডারে ওপরে উঠে আসা সাব্বির রহমান।
বদলে যাওয়া বাংলাদেশের আসল খেল শুরু হলো ঠিক এই জায়গাটা থেকেই। কী অসাধারণ ব্যাটিংই না করলেন সাকিব আর সাব্বির। চতুর্থ উইকেট জুটিতে এই দুজন ব্যাটিং করলেন ১০.৪ ওভার। ১০৫ রানের জুটি গড়ে পাকিস্তানিদের ম্যাচে ফেরার শেষ আশাটুকুও নিবিয়ে দিলেন তারা। সাকিব করলেন ৫৭ আর সাব্বির ৫১। সাকিব তাঁর ৫৭ রানের ইনিংসটি খেললেন ৪১ বলে, নয়টি চারের সাহায্যে। সাব্বিরের ৫১ এল ৩২ বলে সাতটি চার ও একটি ছয়ের সাহায্যে। সোহেল তানভীর, ওয়াহাব রিয়াজ, উমর গুল, মোহাম্মদ হাফিজ, সাঈদ আজমলরা কেবল চেয়ে চেয়েই দেখলেন। দেখলেন এক অন্য বাংলাদেশকে।
খেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকদের বিস্ময় উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ল গোটা দেশে, খুব সম্ভবত গোটা ক্রিকেট দুনিয়াতেই। জীবনের প্রথম টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে মুস্তাফিজুর রহমান নামের এক বাঁ হাতি পেসার দেখালেন নিজের সক্ষমতা। আফ্রিদি, শেহজাদ, হাফিজদের সামনে ৪ ওভার বল করে মাত্র ২০ রান দিলেন তিনি। ১৬টি ডট বলে পাকিস্তানিদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে তুলে নিলেন ২টি উইকেট। তাও যেনতেন উইকেট নয়, একটি আফ্রিদির, অপরটি হাফিজের। আফ্রিদির উইকেটটি নিয়ে যদিও বিতর্ক আছে, কিন্তু হাফিজের উইকেটটি মুস্তাফিজ তুলে নেন তাঁর বোলিং শৈলীর সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়েই।
মুস্তাফিজের সঙ্গে সাকিবও হাত ঘুরিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চটা দিয়েই। কেন আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর সাকিবকে না পেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, আজ বল হাতে বাংলাদেশের সেরা অলরাউন্ডার আজ সেটাও প্রমাণ করে দিলেন। ৪ ওভারের কোটায় রান খরচে ছিলেন ভয়াবহ রকমের কৃপণ। চার ওভারে বাউন্ডারি দিয়েছেন মাত্র একটি। উইকেট পাননি। কিন্তু ১৭ রান খরচের তাঁর কোটা ছিল যেকোনো টি-টোয়েন্টি বোলারের জন্যই স্বপ্নের মতো।
এই দুইয়ের সঙ্গে ভালো বল করেছেন বাংলাদেশের বাকি বোলাররাও। একটি করে উইকেট তুলে নেন তাসকিন আহমেদ আর আরাফাত সানিও। সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই পাকিস্তানের ইনিংসটা নাগালের মধ্যেই রেখে দেয় বাংলাদেশ।