05/08/2026
গ্রামের শেষ প্রান্তে এক বৃদ্ধ বাস করতেন। তাঁর গায়ের কাপড়ে অসংখ্য ছেঁড়া দাগ, পায়ের স্যান্ডেলে শতবার সেলাই। মানুষ তাঁকে দেখে বলত, "লোকটা বড় গরিব।"
একদিন দূরদেশের এক ধনী বণিক সেই গ্রামে এলো। তার শরীরে রেশম, হাতে সোনার আংটি, সুগন্ধে চারদিক ভরে উঠল। গ্রামের মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধও তাকালেন, তবে তার চোখে ছিল না ঈর্ষা—ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নীরবতা।
বণিক হাসতে হাসতে বলল, — "বুড়ো, তোমার কাপড়টা তো ইতিহাস হয়ে গেছে। নতুন একটা কিনে নাও।"
বৃদ্ধ মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, — "আমার কাপড়ে সময় নিজের নাম লিখেছে। তোমার রেশমে কেবল বাজারের দাম লেখা আছে।"
বণিক কথাটির অর্থ বুঝল না।
সন্ধ্যায় ঝড় উঠল। বণিকের বিশাল অট্টালিকার একাংশ ভেঙে পড়ল। তার ভৃত্যরা পালিয়ে গেল, আত্মীয়রা মুখ ফিরিয়ে নিল। সিন্দুকভর্তি স্বর্ণ ছিল, কিন্তু পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখার মতো একজন মানুষও ছিল না।
অন্যদিকে বৃদ্ধের কুঁড়েঘরের চাল উড়ে গেলেও গ্রামের দরিদ্র মানুষগুলো ছুটে এল। কেউ খড় আনল, কেউ বাঁশ, কেউ এক মুঠো চাল। সেদিন বৃদ্ধের ঘর ভাঙেনি—কারণ ঘরকে ধরে রেখেছিল মানুষের হৃদয়।
পরদিন বণিক কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল, "আমি এত সম্পদ অর্জন করলাম, তবু আজ আমি নিঃস্ব কেন?"
বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "স্বর্ণের ওজন দাঁড়িপাল্লা মাপে, কিন্তু মানুষের মূল্য সময় মাপে। সময় কখনো ধনীদের রেশম মনে রাখে না; সে মনে রাখে কার ছেঁড়া কাপড়ের ভেতরেও সততা বেঁচে ছিল, কার খালি থালায় থেকেও অন্যের জন্য এক মুঠো ভাত রেখে দেওয়ার সাহস ছিল।"
তারপর তিনি শুকনো মাটির ওপর একটি দাগ টেনে বললেন, "দেখো, নদী শুকিয়ে গেলে তার গভীরতা বোঝা যায়। তেমনি মানুষ নিঃস্ব হলে তার চরিত্র প্রকাশ পায়। ধন সম্পদ মানুষের পরিচয় নয়, চরিত্রই তার প্রকৃত বংশপরিচয়।"
বণিক মাথা নত করল। সেদিন প্রথমবার সে নিজের রেশমের পোশাককে ভারী মনে করল, আর বৃদ্ধের ছেঁড়া কাপড়কে সম্মানের পোশাক বলে মনে হলো।
কারণ পৃথিবীতে গরিবের কাঁধে যে ছেঁড়া কাপড় দেখা যায়, সেখানে সময় নিজের স্বাক্ষর রেখে যায়; আর ধনীর রেশমে অধিকাংশ সময় লেখা থাকে কেবল বাজারের দাম—মানুষের মূল্য নয়।