24/07/2025
ফুটবলাররা প্রথম থেকে শেষ পযন্ত সাক্ষাৎকারটি পড়ো অনেক কিছু শিখার ও জানার আছে।
"ফুটবল আমার নিঃশ্বাস" – একান্ত সাক্ষাৎকারে কোচ মারুফুল হক।
বাংলাদেশের কোচিং অঙ্গনের অন্যতম পথপ্রদর্শক মারুফুল হক। জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করেছেন, ঘরোয়া লিগে বহু শিরোপা জিতেছেন, আর দেশের কোচিং শিক্ষায় এনেছেন বৈপ্লবিক চেতনা। ফুটবলকে নিঃশ্বাসের মতো ধারণ করেন তিনি। জীবনের নানা বাঁক, সংকট, সফলতা আর ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আমার সঙ্গে। নিচে তুলে ধরা হলো সেই বিশ্লেষণধর্মী, গভীর ও মানবিক আলাপ।
🔹 ক্যারিয়ারের শুরু ও অনুপ্রেরণা:
প্রশ্ন ১: প্রথম অনুপ্রেরণাটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?
ক্যারিয়ারের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?
মারুফুল হক: পরিবার থেকে, আমার প্লেয়িং ক্যারিয়ারটা খুবই সংক্ষিপ্ত ছিল। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে যে বছর আমি বাইন্ডিং ফ্রি হই, সে বছরই বুয়েটে চাকরি পেয়ে যাই। পরিবার বলল-চাকরি করো, খেলা বাদ। আবার বুয়েট বলল- লিগ খেলা যাবে না, কোচিং করা যাবে। এরপর দেশের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. শামীমুজ্জামান বসুনিয়া স্যারের সহায়তায় ফুচুরো ফিফা কোচেস কোর্সে অংশ নিই। কোর্স ইন্সট্রাক্টর মি. ওয়াল্টার ফিজি আমাকে বলেন, “তুমি লেগে থাকো, ভালো কোচ হতে পারবে।”
১৯৯৫-১৯৯৭ পর্যন্ত সময়টায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য ও জাতীয় কোচ শ্রী প্রতাপ শংকর হাজরা
স্যার আমার বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন। বাবা প্রয়াত অধ্যক্ষ নূরুল হক, মা মিসেস রওশন আরা হক, ভাইবোন ও স্ত্রী- সবাই আমাকে উৎসাহিত করতেন।
এই পারিবারিক ও পেশাগত অনুপ্রেরণাই আমাকে কোচিংয়ে ঠেলে দেয়।
প্রশ্ন ২: কোচিং যাত্রার শুরুটা কেমন ছিল?
মারুফুল হক: ১৯৯৫ সালে এএফসি ‘সি’ লাইসেন্স করার পর বাংলাদেশ আর্মি টিমের বিভিন্ন ইউনিটে এবং ময়মনসিংহ মোহামেডান টিমে কোচিং করিয়ে ছোটখাটো সাফল্য পেতে থাকি। ২০০১ সালে ‘বি’ লাইসেন্স করার পর জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার শ্রদ্ধেয় সাঈদ হাসান কানন ভাই বাড্ডা জাগরণীর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। সে বছর বাড্ডা জাগরণী প্রথম বিভাগ থেকে প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হয়। ২০০২ সালেও প্রিমিয়ার লিগে বাড্ডা জাগরণীর সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছিলাম। মাঝে কিছুদিন বিরতির পর আবারও ২০০৭ সালে প্রথম বিভাগে বাড্ডা জাগরণীর হেড কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।
এখানে উল্লেখ্য, তিন মৌসুম বাড্ডার দায়িত্ব পালন করেও আমি এক টাকাও সম্মানী পাইনি—বরং নিজের টাকায় ট্রেনিংয়ে আসা-যাওয়া করতাম।
২০০৮ সালে প্রখ্যাত কোচ প্রতাপ শঙ্কর হাজরা স্যার, ঢাকা মোহামেডান এসসির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জনাব লোকমান হোসেন ভূঁইয়া সাহেবকে নিয়ে আমার অফিসে আসেন এবং আমাকে মাসিক ত্রিশ হাজার টাকা সম্মানীতে ঢাকা মোহামেডান এসসি টিমের হেড কোচ হওয়ার প্রস্তাব দেন। আমি বিনা- বাক্যব্যয়ে প্রস্তাবে রাজি হয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করি।
তখন আমাকে ঢাকা মোহামেডান এসসির হেড কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে চারদিকে নানা মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কিছু পত্রিকায় এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল—“কোথাকার কোন মারুফ মোহামেডানের হেড কোচের দায়িত্বে!”
এমনকি তৎকালীন অনেক ফুটবল বিশারদ
বলেছিলেন।“যার ফুটবল খেলার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, শুধুমাত্র বই পড়ে বা ল্যাপটপ দিয়ে কোচিং হয় না।” আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আমার কোচিং- জ্ঞানকে পুঁজি করে নীরবে কাজ করে যেতে লাগলাম।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—দেশের টপ লেভেলে কোচিং শুরু করার সেই বছরেই আমি পেয়েছিলাম জুয়েল রানা, আমিনুল, রজনী ও হাসান আল মামুনের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের, যারা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। এবং আমার সহকারী হিসেবে পাশে পেয়েছিলাম চমৎকার ব্যক্তিত্ব ও ফুটবল-জ্ঞানসম্পন্ন জনাব সাইফুল বারী টিটু ভাইকে।
তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা আমি সবসময় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।
প্রশ্ন ৩: খেলোয়াড় থেকে কোচ- এই রূপান্তর আপনার দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে বদলে দিয়েছে?
মারুফুল হক: আমার শৈশব ও কৈশর কেটেছে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল মাঠে, যেখানে সকল ধরনের খেলাধুলার চর্চা ছিল। আমি ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, অ্যাথলেটিকস, সাঁতারসহ অন্যান্য খেলায় সমান পারদর্শী ছিলাম, তবে তুলনামূলকভাবে ক্রিকেটেই বেশি ভালো করতাম। আমার বাল্যকালের ক্রিকেট সাথীদের মধ্যে মাহাবুবুর রহমান সেলিম, হারুন-অর-রশিদ লিটন, সাইফুল ইসলাম খান, জাকির হোসেন পরবর্তীতে জাতীয় দলে খেলেছেন।
তবুও আমার আবেগ ও ভালোবাসা ছিল ফুটবল ঘিরেই। তাই আমি ফুটবলেই মনোনিবেশ করি। যদিও ১৯৮৮ সালে জাতীয় অনুঃ ১৯ দলে প্রাথমিকভাবে ডাক পেয়েছিলাম। কঠোর পরিশ্রম করেও বড় মাপের ফুটবলার হতে পারিনি। তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি—এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালিক, সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী মহান আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাতেই আমি খেলোয়াড় না হয়ে কোচ হয়েছি।
একজন খেলোয়াড় ও কোচ—এই দুইটি একেবারেই ভিন্ন সত্তা। একজন খেলোয়াড় নিজের পারফরম্যান্সে মনোনিবেশ করে, কিন্তু একজন কোচকে দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের মাঠের ভেতর ও বাইরে যা কিছু ঘটে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করে এমন প্রতিটি বিষয়ে চিন্তা করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং তা বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হয়।
তবে একটি অপূর্ণতা আমার মাঝে এখনও রয়ে গেছে—যদি আমার জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতা থাকতো, তাহলে হয়তো কোচ হিসেবে আমার সিদ্ধান্তগুলো আরও ধারালো হতো।
৪.প্রশ্ন: কোচ হওয়ার পর আপনি বাংলাদেশের কোচিং ব্যবস্থায় কী কী ঘাটতি দেখেছিলেন?
মারুফুল হক: আমি কোচ হওয়ার পর দেখলাম, দেশের কোচদের অনেক কিছুই ছিল না- তত্ত্বগত জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক অনুশীলন, উন্নত পরিকল্পনা। তখন থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করি। কোচিং-এ শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করি, আর প্রচুর রিসার্চ করতে থাকি।
প্রশ্ন ৫: আপনার শিক্ষা (BPED ও UEFA লাইসেন্স) কোচিংয়ে কীভাবে ভিন্নতা এনেছে?
মারুফুল হক: ১৯৯৩ সালে আমি ঢাকা সরকারী শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে বিপিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করি। সেই সময় এই কোর্সটি ছিল ১০ মাসের, যেখানে টিচিং মেথড, ফিজিওলজি, এনাটমি ও সাইকোলজি—এই বিষয়গুলো নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা পাই। যদিও খুব গভীরভাবে নয়, তবুও এগুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মে। পরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদেশি বই সংগ্রহ করে পড়তে থাকি এবং এরপর মাস্টার্স অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (এমপিএড) ডিগ্রি অর্জন করি। এই বিপিএড ও এমপিএড কোর্সগুলো আমার কোচিং জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করে এবং আমি সেটা খেলোয়াড়দের ফিটনেস ট্রেনিংয়ে প্রয়োগ করে থাকি।
যদিও আমি আগেই এএফসি 'এ' লাইসেন্স পেয়েছিলাম, তবুও কেন জানি মনে হতো, কোচিং সম্পর্কে আমি এখনো অনেক কিছু জানি না। এই অনুভব থেকেই ২০১৫ সালে আমি ইংল্যান্ড থেকে UEFA 'A' লাইসেন্স অর্জন করি। এএফসি ‘এ’ লাইসেন্স কোর্স সাধারণত ২ থেকে ১২ মাসের মধ্যে হয়, তবে আমাদের সময়ে মাত্র ১ মাসে তা শেষ হয়েছিল। এতে কিছুটা শেখার গ্যাপ থেকে যায়।
উইয়েফা 'এ' লাইসেন্সের ব্যপ্তি ছিল দুই বছর। এখানে বিশেষ করে পেশাদার দলের খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত ও দলগত পারফরম্যান্সে পরিবর্তন আনার জন্য টেকনিক, ট্যাকটিকস, ফিজিক্যাল, মানসিক ও সামাজিক দিকগুলো—সব কিছুই মাঠের ভেতর ও বাইরের আচরণসহ বিশ্লেষণধর্মী পদ্ধতিতে হাতে-কলমে শেখানো হয়। আমি এই কোর্স থেকে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তা ২০১৫ সাল থেকে আমার দলের মেধা ও সক্ষমতা অনুযায়ী প্রয়োগ করার চেষ্টা করি এবং বেশিরভাগ সময়েই সফল হই।
🔹 কোচিং দর্শন ও কৌশল:
প্রশ্ন ৬: আপনি কোন ধরনের ফুটবল খেলাতে বেশি পছন্দ করেন- পজেশন, কাউন্টার, না অন্য কিছু?
মারুফুল হক: সাধারণত আমি বেশি পছন্দ করি পাসিং ও প্রেসিং ফুটবল। অর্থাৎ, বল যদি আমার দলে থাকে, তাহলে গোলকিপার থেকে বিল্ডআপ করে তিনটি জোনে পজিশনিং করে আমরা প্রতিপক্ষের গোলসীমায় পৌঁছাই। পক্ষান্তরে, যদি বল প্রতিপক্ষের কাছে থাকে, তাহলে তাদের পিছন থেকে বিল্ডআপ ভেঙে দিতে হাই প্রেসিং করি—অথবা আমরা বল হারানোর সাথে সাথেই কাউন্টার প্রেসিং করি যেন দ্রুত বলের দখল ফিরে পাওয়া যায়। তবে আমি কীভাবে আমার দলকে খেলাবো, তা নির্ভর করে আমার খেলোয়াড়দের মেধা, যোগ্যতা এবং প্রতিপক্ষ দলের শক্তি ও দুর্বলতার উপর।
প্রশ্ন ৭: একজন কোচ হিসেবে আপনার মূল দর্শন বা ফিলোসোফিটা কী?
মারুফুল হক: শারীরিকভাবে ফিট, মানসিকভাবে ইতিবাচক খেলোয়াড় তৈরি করা আমার দর্শনের মূল। ট্রেনিংয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করি যেখানে আত্মবিশ্বাস, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সহযোগিতার চর্চা হয়। খেলোযাড়দের যোগ্যতা অনুযায়ী সর্ব্বোচ্চ ফিজিক্যাল ফিটনেস নিয়ে এসে তাদের ইতিবাচক মানসিকতার স্থায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও সততা বৃদ্বি করে, ট্রেনিং এ এমন একটি পরিবেশ তৈরী করা যেখানে পর্যায়ক্রমিক চ্যালেঞ্জিং, সহযোগিতার মনোভাব, উৎসাহ প্রদান, প্রচন্ড চপের মুখেও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন ক্ষমতা, ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের টেকনিক, স্কিল, টেকটিকস ও ডিসিশন মেকিং উন্নত থেকে উন্নততর করতে ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ৮: খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা গঠনে আপনি কী পদ্ধতি অনুসরণ করেন?
মারুফুল হক: আমি ৫টি ‘C’ নিয়ে কাজ করি—Confidence, Commitment, Concentration, Communication ও Control। প্রি-সিজনের প্রথম দিন থেকেই মেন্টাল স্কিল ট্রেনিং শুরু করি। এটাই আমার খেলোয়াড়দের মানসিক টাফনেস গঠনের মূল ভিত্তি।
প্রশ্ন:৯. আপনি কোচ হিসেবে খেলোয়াড়দের মধ্যে কী ধরনের দক্ষতা গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?
মারুফুল হক: আমি বিশ্বাস করি – প্রতিটি খেলোয়াড় আলাদা, তাই কোচিংও কাস্টমাইজড হওয়া উচিত। আমি খেলোয়াড়দের চিন্তা করতে শেখাতে চাই। শুধু অনুশীলন নয়, মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করাই আমার লক্ষ্য।
প্রশ্ন:১০. আপনি ঘরোয়া ফুটবলে ‘গেম ম্যানেজমেন্ট’-এর ওপর এত জোর দেন কেন?
মারুফুল হক: কারণ, আমাদের বেশিরভাগ খেলোয়াড় বুঝতে শেখে না কখন কী করতে হবে, বল রাখতে হবে, আক্রমণ করতে হবে, না পজিশনাল খেলতে হবে। এই সিদ্ধান্তগুলো ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে।
১১.প্রশ্ন: শেখ রাসেলকে ট্রেবল জেতানোর সময়টা কেমন ছিল?
মারুফুল হক: অসাধারণ একটা সময়। পুরো দলটা ছিল ব্যালেন্সড, খেলোয়াড়রা আমার দর্শনে বিশ্বাস রাখত। কঠিন সময়ও এসেছিল, কিন্তু সবাই মিলে কাজ করায় ফলাফল এসেছিল।
১২.প্রশ্ন: দল গঠনের ক্ষেত্রে আপনি কী বিষয় বেশি গুরুত্ব দেন?
মারুফুল হক: খেলোয়াড়ের স্কিলের পাশাপাশি তার মানসিকতা, শারীরিক ও চিন্তার গতি, , ফুটবল ইন্টেলিজিন্সি, কোচিং নেয়ার সক্ষমতা, শৃঙ্খলা, দলগত কাজের প্রতি আন্তরিকতা দেখি। শুধু ভালো খেললেই হবে না, সে দলের জন্য কী করতে পারবে সেটাও দেখতে হয়।
১৩.প্রশ্ন: আপনি অনেক তরুণ ফুটবলারকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে এনেছেন – এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
মারুফুল হক: অনেক খেলোয়াড়ই আমার কোচিং খেলে থাকে, যাদের প্রতিভা থাকে তারাই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করছে। আমি বিশ্বাস করি, তরুণদের সুযোগ দিতে হয়, কিন্তু প্রস্তুত করেও দিতে হয়। তাদের নিয়ে আমি আলাদা সেশন করাই না, নিয়মিত সেশন থেকেই প্রতিভাধররা নিজেদের মেলে ধরতে পারে। আমিও তাদের ওপর বিশ্বাস রাখি।
🔹 জাতীয় দল ও ঘরোয়া অভিজ্ঞতা:
প্রশ্ন ১৪: জাতীয় দলের কোচ থাকার সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি কী ছিল আপনার জন্য?
মারুফুল হক: আমি যখন জাতীয় দলের দায়িত্ব নেই, তখন দলটি ছিল একেবারে ভঙ্গুর অবস্থায়। খেলোয়াড়দের মধ্যে মাঠের ভিতর ও বাহিরে শৃংখলার অভাব ছিল। তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও খুবই বিপর্যস্ত ছিল—প্রতিটি খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।
এই পরিস্থিতিতে আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং দলকে একটি সুশৃংখল ইউনিটে রূপান্তর করা। খেলোয়াড়রাও তখন চেষ্টা করছিল নিজেরাই নিজেদের ফিরে পেতে, টিম রুলস মেনে চলছিল। আমি তাদের আচরণে সন্তুষ্টও ছিলাম।
তবে একেবারে শেষ দিকে কয়েকজন খেলোয়াড়ের উশৃংখল আচরণ টিমের পরিবেশ বিঘ্নিত করে। এমন পরিস্থিতিতে একজন খেলোয়াড়কে দল থেকে বহিষ্কারও করতে হয়েছিল।
তবুও আমি জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিজেকে সফল মনে করি। আমার অধীনে জাতীয় দল মাত্র ৭টি ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে ৩টি জয়, ৩টি পরাজয় এবং ১টি ড্র পেয়েছে—অর্থাৎ ৫০% সাফল্য। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এমন সাফল্য আর কারো আছে বলে আমার জানা নেই।
১৫.প্রশ্ন : জাতীয় দলের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কীভাবে আপনার কাজকে প্রভাবিত করেছে?
মারুফুল হক: আমার সময় জাতীয় দলে একজন স্থায়ী ডাক্তারও ছিল না। যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় জামাল ভূঁইয়ার সার্ভিস আমরা হারাই। আরও এক খেলোয়াড় মিথ্যা অজুহাতে দুইটি ম্যাচ খেলেনি- যা টিম স্পিরিটে প্রভাব ফেলেছিল।
প্রশ্ন:১৬.বাংলাদেশে ফুটবলের কাঠামো উন্নয়নে আপনি কী সুপারিশ করবেন?
মারুফুল হক: গ্রাসরুটস ও স্কুল ফুটবলকে টেকসই করা, নিয়মিত অনুর্ধ্ব লিগ আয়োজন, জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, এবং কোচদের মানোন্নয়ন – এই জায়গাগুলো ঠিক না করলে উন্নতি হবে না।
প্রশ্ন: ১৭. আপনি দীর্ঘদিন জাতীয় দলের দায়িত্বে ছিলেন না, তার কারণ কী মনে করেন?
মারুফুল হক: ২০১৫ সালে কেরালা সাফ চ্যম্পিয়নশীপে ব্যার্থ হওয়ার সাথে সাথে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে তৎকালীন জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান প্রয়াত বাদল রায় আমাকে কাজ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেন, উনার অনুরোধে আবার ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে জন্য দায়িত্ব নেই। আমি সবসময় নিজের কাজের প্রতি আন্তরিক থেকেছি। হয়তো আমার দর্শন বা কাজের ধরন কারো কারো সাথে খাপ খায়নি। তবে আমি কখনো কারো বিরুদ্ধে কিছু বলিনি, কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম এবং এররখানেও ব্যার্থ হয়ে ফিরে আসি।
প্রশ্ন;১৮..আপনি একসময় জাতীয় দলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সেই সময়টার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মারুফুল হক: অল্প সময়ের জন্য হলেও দায়িত্ব ছিল চ্যালেঞ্জিং। প্রস্তুতির জন্য সময় ছিল না, খেলোয়াড় বাছাইয়ের সুযোগও ছিল সীমিত। তবুও আমি চেষ্টা করেছি নিজের সর্বোচ্চটা দিতে।
প্রশ্ন:১৯.জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থা আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
মারুফুল হক: আমাদের গঠনগত দুর্বলতা আছে – বয়সভিত্তিক দলগুলো সঠিকভাবে গড়ে উঠছে না, লিগ কাঠামো দুর্বল, এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলি না বললেই চলে, খেললেও সমশক্তি বা দূর্বল দলের সাথেই বেশী খেলে থাকি। সমস্যা গভীরে। কাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়মিত প্রতিযোগিতার অভাব, তরুণ খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক এক্সপোজার না থাকা – সব কিছু মিলিয়ে সমস্যা বহুমাত্রিক। শুধু কোচ পরিবর্তনে কিছু হবে না। একই সাথে কোচের নিজের পছন্দমাফিক ফরমেশনে না গিয়ে খেলোয়াড়রা অভ্যস্ত বা তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী ফরমেশনে খেলানো উচিত।
প্রশ্ন ২০. জাতীয় দলের খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনি কী ধরনের নীতিতে বিশ্বাস করেন?
মারুফুল হক: আমি সবসময় পারফর্ম্যান্স এবং ফিটনেসকে গুরুত্ব দিই। পরিচিত মুখ নয়, যে খেলোয়াড় মাঠে পারফর্ম করছে, তাকেই বেছে নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন ২১: বাংলাদেশের ঘরোয়া কোচিং ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন দরকার?
মারুফুল হক: বাংলাদেশের ঘরোয়া কোচিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটা গ্রাসরুট লেভেল থেকে প্রফেশনাল পর্যায় পর্যন্ত। কোথাও আধুনিক কোচিং-এর ধারে কাছেও আমরা নেই।
যেমন, লং টার্ম প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট (LTPD) প্রসেস অনুসরণ করা হয় না। গ্রাসরুট কোচিং তো অনেক দূরের কথা - আমাদের তো এখনো এই ‘গ্রাসরুট’ শব্দটার মানেই সঠিকভাবে বেশরিভাগ ফুটবল সংশ্লিষ্টরা বোঝেন না। ইউথ লেভেলের ট্রেনিংয়ে যে কনটেন্ট থাকা উচিত, সেটাও নেই।
আসলে একাডেমি আর স্কুলিংয়ের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটাই আমাদের বুঝতে হবে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে - দেশের একটি শীর্ষস্থানীয়, সবচেয়ে সফল প্রফেশনাল ক্লাবের একাডেমিতে তিনটি দল আছে: ৬–১০, ১১–১৪, ১৫–১৮ বছর বয়সের।
এই বয়সভিত্তিক ভাগ কখনোই আধুনিক ফুটবল কোচিংয়ের সঙ্গে যায় না, বয়সভিত্তিক দলসমূহ ২ বছরের বেশী ব্যবধান বিজ্ঞানসম্মত নয়, অর্থাৎ ৬-৭, ৮-৯ এধরনের হতে হবে।।
আমাদের সিস্টেমে পরিকল্পনা, কাঠামো, কোচিং এডুকেশন - সব জায়গায় পুনর্গঠন দরকার। শুধুমাত্র সার্টিফিকেটধারী কোচ তৈরি করলেই হবে না, ফুটবল বুঝে, কনটেন্ট জানা, খেলোয়াড় তৈরির যোগ্যতা রাখা যুগোউপযোগী কোচ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়তে পারব।
🔹 সাফল্য, ব্যর্থতা ও আত্মবিশ্লেষণ:
প্রশ্ন ২২: কোচ হিসেবে আপনার অর্জন কি কি?
মারুফুল হক: ২০০৮ থেকে বিভিন্ন ক্লাবে ও দলে কাজ করে ১১টি শিরোপা জিতেছি—২টি লিগ, ৪টি ফেডারেশন কাপ, ২টি স্বাধীনতা কাপ, ১টি সুপার কাপ, ১টি আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ।
জাতীয় অনুঃ২০ দলকে সাফ চ্যাম্পিয়ন।
এর বাইরে ৫টি লিগ, ১টি সুপার কাপ, ১টি ফেডারেশন কাপ, ১টি আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ এ রানার্স-আপ। তবে আরামবাগকে স্বাধীনতা কাপ জেতানো ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সেই দলে ছিল তরুণ ও কম অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা।
প্রশ্ন ২৩: আপনার কোচিং ক্যারিয়ারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত আছে যা আপনি বদলাতে চাইতেন?
মারুফুল হক: ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা ও ফরাশগঞ্জ ম্যাচে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলাম। তখন ৩ পয়েন্ট পেলে লিগ চ্যাম্পিয়ন হতাম। এখন মনে হয়—প্রতিরোধ করা উচিত ছিল।
প্রশ্ন: ২৪. আপনার দৃষ্টিতে আদর্শ খেলোয়াড় কেমন?
মারুফুল হক: যে শৃঙ্খলাবদ্ধ, শেখার আগ্রহ আছে, এবং দলের প্রয়োজনে নিজের চাওয়া বিসর্জন দিতে পারে।
প্রশ্ন:২৭. বিদেশি কোচ ও স্থানীয় কোচদের মধ্যে আপনি কী ধরনের মৌলিক পার্থক্য দেখেন?
মারুফুল হক: আমাদের দেশে কাজ করে গিয়েছে বা করছে বেশীরভাগ কোচদের চেয়ে আমাদের দেশীয় কোচরা ভালো। তবে বিদেশীদের মধ্যে যারা ভালো ছিলেন তাদের অনেকেই ডেডিকেটেড, ফুটবল পন্ডিত, অভিজ্ঞ এবং তাদের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু ছিল আমি চেষ্টাও করেছি কিছু শিখতে। তারা নিয়ম-কানুনে চলে। তবে স্থানীয় কোচরা দল, খেলোয়াড় এবং বাস্তবতার সাথে আরও বেশি সংযুক্ত থাকে। ভালো বিদেশিদের ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান বেশি হলেও, স্থানীয় কোচরা খেলোয়াড়দের আবেগ-অনুভূতি ও বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে পারে।
প্রশ্ন:২৮. বাংলাদেশে ফুটবল উন্নয়নে আপনি কোন কোন কাঠামোগত পরিবর্তন দেখতে চান?
মারুফুল হক:
১. সঠিক পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত অর্থের যোগান
২. দেশব্যাপী গ্রাসরুটস ফুটবলের প্রচলন
৩. যুব ফুটবলের সঠিক পরিকল্পনা ও বছরব্যাপী প্রশিক্ষনে জোড় দেয়া
৪. কোচ এডুকেশন পদ্ধতি আধুনিক করা
৫. দেশের সর্ব্বোচ্চ লীগকে পতিদ্বন্ধিতাপূর্ন, যথাযথভাবে পরিচালনা করা
৬. দেশের প্রতিভাবানদের বিদেশের লীগে অংশ গ্রহন।
প্রশ্ন:২৯. আপনি কি মনে করেন, ঘরোয়া লিগ দেশের ফুটবল উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে?
মারুফুল হক: ঘরোয়া লিগ কিছু ভূমিকা রাখলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনিয়মিত ক্যালেন্ডার, কোচিং দলগুলোর অপেশাদারিত্ব ও রেফারিং সমস্যাসহ অনেক দিক রয়েছে যেখানে উন্নয়ন জরুরি।
প্রশ্ন:৩০. ক্লাব ফুটবলে আপনার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি কোনটি?
মারুফুল হক: আরামবাগকে প্রথমবার প্রিমিয়ারে নিয়ে আসা এবং শেখ রাসেলকে ইতিহাসে প্রথমবার ট্রেবল জেতানো – এই দুইটা মুহূর্ত আমার হৃদয়ের খুব কাছে।
প্রশ্ন:৩১. আপনি কীভাবে নিজেকে হালনাগাদ রাখেন?
মারুফুল হক: আমি নিয়মিত বিশ্বমানের কোচিং জার্নাল, সাময়ীকি, প্রকাশনা , আন্তর্জাতিক এবং বিশ্বমানের বিভিন্ন লীগ ও চ্যাম্পিয়শীপের টেকনিক্যাল রিপোর্ট ও ট্রেনিং সেশন দেখি।বিশ্ব ফুটবলের সর্বশেষ অবস্থান না জানলে নিজেকে পিছিয়ে পড়াদের দলভুক্ত মনে হয় তাই শুধু সার্টিফিকেট পেলেই হবে না, শেখার আগ্রহ থাকতে হবে।
প্রশ্ন:৩২.আপনি কোচিং ক্যারিয়ারে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ কোনটা মোকাবিলা করেছেন?
মারুফুল হক: হয়তো আরামবাগের সময়। সুযোগ-সুবিধা কম, খেলোয়াড় তরুণ, মাঠ নেই। তবুও ট্যাকটিক্স, মানসিকতা ও সংগঠনের মাধ্যমে দলটিকে দাঁড় করিয়েছিলাম।
প্রশ্ন:৩৩.ফেডারেশন বা ক্লাবের কোন সিদ্ধান্তে আপনি সবচেয়ে হতাশ হয়েছেন?
মারুফুল হক: অনেক সময় দেখা গেছে ভালো কাজ করেও অবমূল্যায়িত হয়েছি। দল ভালো করেও কাঙ্ক্ষিত সম্মান পাইনি। কোচদের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সমস্যা রয়েছে।
প্রশ্ন:৩৪.আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ফুটবলের ৫ বছর পরের চেহারা কেমন দেখতে চান?
মারুফুল হক: আমি চাই জাতীয় দল নিয়মিত সাফের ফাইনাল খেলুক, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক, ঘরোয়া ফুটবলে দর্শক ফিরুক এবং ক্লাব-ফেডারেশন যেন সঠিক পথে চলে।
🔹 প্রযুক্তি ও আধুনিক ফুটবল:
প্রশ্ন ৩৫: আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালাইসিসের গুরুত্ব কীভাবে দেখেন?
মারুফুল হক: আধুনিক ফুটবল, প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালাইসিস—এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক ও সম্পূরক। বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালাইসিস ছাড়া কোনো দল কিংবা খেলোয়াড় ব্যক্তিগতভাবে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বললে, আশির দশকের একজন খেলোয়াড় ৯০ মিনিটে ৭-৮ কিলোমিটার দৌড়াতো, কিন্তু আজকের দিনে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত—এটা সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তি ও ডেটাভিত্তিক ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে।
প্রফেশনাল ফুটবলে এখন প্রতিটি দলে আলাদা করে ডেটা/ভিডিও অ্যানালিস্ট ও টেকনিক্যাল স্টাফ থাকে। তবে একজন হেড কোচ হিসেবে এসব বিষয়ে আপনার সম্যক জ্ঞান না থাকলে আপনি সেই বিশেষজ্ঞদের কাছে আপনার প্রয়োজনীয় চাহিদা উপস্থাপনই করতে পারবেন না। বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী কোচই পাওয়া যায় না, সেখানে স্পেশালাইজড টেকনিক্যাল এনালিস্ট পাওয়া আরও কঠিন। তাই আমি মনে করি, একজন কোচের এসব বিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
আমি নিজে যেখানে কাজ করি সেখানে কষ্ট করে হলেও নিজেই জিপিএস ডেটা অ্যানালাইসিস, ড্রোন ভিডিও বিশ্লেষণ, কোয়ানটেটিভ ও কোয়ালিটেটিভ ডেটা এনালাইসিস করে গেমপ্ল্যান সাজিয়ে থাকি। এটা কষ্টসাধ্য, কিন্তু পারফরম্যান্সের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন ৩৬: আরামবাগে GPS সিস্টেম চালু করেছিলেন—এর প্রভাব কেমন ছিল?
মারুফুল হক: ২০১৭ সালে আরামবাগে আমি বাংলাদেশে প্রথম জিপিএস সিস্টেম চালু করি। সেখানে খেলোয়ড়দের প্রতিদিন ট্রেনিং ডাটা ও ম্যাচ ডাটা খেলোয়াড়দের সাথে শেয়ার করতাম এবং তাদের কি করনীয় তা বলে দিতাম, তারা উৎসাহিত হয়ে তাদের সেরাটা ট্রেনিং ও ম্যাচে দিতে চেষ্টা করতো, যার ফলে উন্নতিটা চোখে পরার মত ছিল।
প্রশ্ন ৩৭: বাংলাদেশের কোচদের প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ঘাটতি নিয়ে কী ভাবেন?
মারুফুল হক: আমরা জাতিগতভাবে নতুন কিছু সহজে গ্রহণ করতে পারি না। আমাদের যেসব বিষয়ের ওপর ভালো ধারণা নেই, সেগুলোর কাছাকাছি যাওয়ারও আগ্রহ দেখি না। অথচ আমাদের পেশাগত উৎকর্ষতা অর্জনের জন্য এসব দূর্বোধ্য বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করাটা জরুরি—সময় দিতে হবে, শিখতে হবে, প্রয়োজনে যাদের জ্ঞান আছে, তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশীয় কোচেরা এই কাজগুলো করতে চান না। কারণ, আমরা চাই না কেউ আমাদের দুর্বলতা জেনে ফেলুক। অথচ একজন প্রকৃত পেশাদার কোচের উচিত নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে সেটি দূর করার চেষ্টা করা। প্রযুক্তিগত দিকগুলো আমাদের কোচিংয়ে প্রবেশ না করলে আধুনিক ফুটবলে আমরা প্রতিযোগিতা করতে পারবো না।
🔹 যুব উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
প্রশ্ন ৩৮: বাংলাদেশের ফুটবলে যুব উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ঘাটতিটা কোথায় দেখেন?
মারুফুল হক: সঠিক যুগপোযোগী বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও ফুটবল সংস্কৃতি। একটি দেশের ফুটবল সংস্কৃতি পরিবর্তন ও সঠিক পরিকল্পনা ফুটবলের সর্ব্বোচ্চ সংস্থাকে করতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এসবের কোনটাই আমাদের দেশে নাই।
প্রশ্ন ৩৯: আপনি যদি কাঠামো বদলাতে পারতেন, প্রথম ৩টি কাজ কী করতেন?
মারুফুল হক:
১. কোচ এডুকেশন ঢেলে সাজাতাম
২. দেশজুড়ে গ্রাসরুট চালু করতাম
৩. লং টার্ম প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট চালু করতাম
প্রশ্ন ৪০: বিদেশি ক্লাবে কোচিংয়ের সুযোগ থাকলেও যাননি কেন?
মারুফুল হক : ২০১৩ সালে যুক্তরাস্ট্রের দুটি একাডেমীতে কাজের অফার ছিল, বেতন কাঠামোর জন্য যাওয়া হয়নি। ২০১৫ সালে সার্ক অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী দলের হেড কোচের অফার ছিল কিন্তু তৎকালীন সময়ে স্থানীয় ক্লাবের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকায় যাওয়া হয়নি। চলতি সিজনে ইন্দোনেশিয়ার বিআরআই লীগ ১ এর একটি দলের অফার থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক কারনে যাওয়া হচ্ছে না।
🔹 ব্যক্তিগত প্রেরণা ও রোল মডেল:
প্রশ্ন ৪১: কঠিন সময়ে আপনি নিজেকে কীভাবে মোটিভেট রাখেন?
মারুফুল হক:কোন দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর ক্লাব কর্তৃপক্ষের চাহিদা ও দলের শক্তিমত্তা অনুযায়ী আমি সিজনের জন্য একটি স্পষ্ট টার্গেট সেট করে ফেলি। কারণ আমি জানি, পৃথিবীর কোনো ফুটবল দলই পুরো সিজনে একই ধারায় খেলতে পারে না — আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। একটি সিজনে বহুবার কঠিন সময় আসে। কঠিন সময়ে আমি প্রথমেই আত্মসমালোচনা করি—এই পরিস্থিতির জন্য আমার দায় কতটুকু? এরপর দেখি দলের অন্যান্য সদস্যদের দায় কতটা। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমি ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করি এবং সেগুলো কাটিয়ে উঠতে নিজের পরিশ্রম, মনোযোগ এবং একাগ্রতা আরও বাড়িয়ে দিই।
এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা থাকে—সিজনের শুরুতে নিজেকে দেওয়া সেই টার্গেট। সেটাই আমাকে মূলত মোটিভেটেড রাখে। তবে যদি পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়, তখন আমি কোরআন শরীফ পাঠে মনোনিবেশ করি। এতে মানসিক শান্তি পাই এবং নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পাই।
প্রশ্ন ৪২: আপনার রোল মডেল কে?
মারুফুল হক: কোচিং এ এককভাবে কোন কোচ বা ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রভাবিত করে না, আমার মনে হয় আমার নিজস্ব একটা স্টাইল এতদিনে তৈরী হয়ে গিয়েছে যা আমি নিজে বুঝতে পারিনা, সেটা আপনারা ভালো বলতে পাবেন। তবে স্যার আলেক্স ফার্গুসনের মোটিভেশন ও ম্যাচ ম্যানেজম্যন্ট পদ্ধতি, আর্সেন ওয়েঙ্গারের ব্যক্তিত্ব, হোসে মরিনহোর ট্রেনিং পদ্ধতি, ক্লপের কমিউনিকেশন পদ্ধতি আমার কাছে ভালো লাগে।
প্রশ্ন ৪৩: তরুণ শিক্ষানবিশ কোচদের জন্য আপনার বার্তা কী?
মারুফুল হক: পরামর্শ বলতে আমি কিছুই দিতে চাইনা, তবে আমি যেভাবে আজকে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেটাই শেয়ার করছি। মহান আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে নিজেকে সারাজীবনের ছাত্র ভেবে আকাশসম ধৈর্য ও অধ্যবসায়, প্রচুর পড়াশুনা ও কোচিং বিষয়ে আপডেট থাকা আর টাকার পিছনে না দৌড়ে প্রতিদিন কোচিং প্র্যাকটিস করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। টাকাই একদিন তোমার পিছনে দৌড়াবে।
🔹 শীর্ষ লিগ, ক্লাব ও ফেডারেশন:
প্রশ্ন ৪৪: দীর্ঘদিন শীর্ষ লিগে কোচিং করার অভিজ্ঞতায় আপনি কী মনে করেন, আমাদের ঘরোয়া লিগের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা কী?
মারুফুল হক: যেভাবে বাংলাদেশে প্রফেশনাল লিগ চলে আসছে, তার সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা হলো বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা—চাই সেটা রেজিস্ট্রেশন হোক বা খেলানোর নিয়ম। গত ১৭ বছরে এই নিয়ম প্রায় ১৭ বার পরিবর্তন হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, এ নিয়মটা কোনো না কোনোভাবে কারো স্বার্থে প্রভাবিত হয়ে এসেছে। এটা কখনোই খেলোয়াড় তৈরির স্বার্থে বা লিগের গঠনমূলক উন্নয়নের কথা ভেবে করা হয়নি। ফলে আমাদের ঘরোয়া ফুটবলের মৌলিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি—যেখানে স্থানীয় খেলোয়াড়রা নিয়মিত খেলার সুযোগ পাবে, উন্নতি করবে, এবং একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে থাকবে।
প্রশ্ন ৪৫: প্রশ্ন: বারবার ফিক্সচার পরিবর্তন বা বিলম্ব—এই বিষয়গুলো কোচের পরিকল্পনায় কী প্রভাব ফেলে?
মারুফুল হক: দেখুন, আধুনিক ফুটবলে প্রফেশনাল ক্লাবসমূহ সাধারণত ৬-৮ সপ্তাহের প্রি-সিজন ট্রেনিং করে থাকে, আর আমরা তো এখনো আধুনিক ফুটবলের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের বেশিরভাগ ক্লাব এবং অতীতের লীগ পরিচালনাকারীদের কাছে “প্রি-সিজন” জিনিসটার গুরুত্বই ছিল না। আর গুরুত্ব থাকলেও, কখনো নির্ধারিত সময়ে সিজন শুরু করতে পারেনি।
ফলে ক্লাব কর্তৃপক্ষও কোচকে আদর্শ সময় অনুযায়ী প্রি-সিজনের সুযোগ দেয় না। আবার কেউ কেউ সময়মতো প্রি-সিজন শুরু করলেও, তারা জানতে পারে না প্রথম ম্যাচ কবে, কোথায়, কার সাথে। এতে করে কোচদের জন্য ম্যাচ-ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করাটা দারুণ কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সেই কোচরা, যারা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ম্যাচ প্রস্তুতি নিতে চান। কারণ আপনি পরিকল্পনা করবেন একরকম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ফিক্সচার বদলে গেলে পুরো প্রস্তুতি যেন ভেস্তে যায়। এটা শুধু পরিকল্পনায় নয়, খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতিতেও বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রশ্ন ৪৬: বাংলাদেশের ক্লাব গুলোতে সময়মতো বেতন না দেওয়া- এটি কতটা বড় সমস্যা?
মারুফুল হক: ক্লাবসমূহে পেশাদারিত্বের স্ট্রাকচার ও খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্বের মনোভাব থাকলে এমন সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে বেতন বঞ্চিত খেলোয়াড়রা এ বিষয়ে অজানা এ কারনে ফেডারেশনের দারস্থ হয় না। আবার খেলোয়াড়রা কন্ট্রাক্ট ফরমে কোন কিছু না দেখে স্বাক্ষর করে ফেলে এবং নিজের কাছে কোন কপিও রাখেনা।
প্রশ্ন ৪৭: অনেক ক্লাবে এখনও পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাব দেখা যায়। কোন সংস্কারগুলো আপনি অতি জরুরি মনে করেন?
মারুফুল হক: ২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রফেশনাল লীগ চালু হলেও এখন পর্যন্ত কোন স্থায়ী কাঠামোতে দাঁড় করাতে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। আসলে এ কারণেই আমাদের প্রফেশনাল লীগ এখনও এএফসির কোন ক্যাটাগরিতেই পড়ে না। উল্লেখ্য, এএফসির সদস্য দেশগুলোর সর্বোচ্চ লীগের মান অনুযায়ী এ, বি, সি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়।
২০০৭ সালে শুধু ২/৩টা সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করে জোর করে একটা প্রফেশনাল লীগ চালু করা হয়—একটা প্রি-ম্যাচিউরড বেবির মতো। তখন যদি ৩/৪ বছর সময় নিয়ে ধাপে ধাপে ক্লাব স্ট্রাকচার প্রফেশনাল আদলে আনা হতো, তাহলে আজকে বাংলাদেশে একটা শক্ত ভিত্তির উপর প্রফেশনাল লীগ দাঁড় করানো যেত।
আপনি যদি ইপিএল বা লা লিগার লীগ ম্যানেজমেন্ট অথরিটিকেও এনে দিয়ে দেন, তারপরও পরিবর্তন সম্ভব নয়—কারণ বিপিএলে অংশ নেওয়া ক্লাবগুলোর মধ্যে ১টা বাদে কেউই প্রফেশনাল স্ট্রাকচারে চলে না।
তাই আমি মনে করি, আমরা যা ২০০৭ সালে করতে পারিনি, এখনই সেটি শুরু করা উচিত। আগামী ৪/৫ বছরে ক্লাবগুলোকে ধাপে ধাপে প্রফেশনাল কাঠামোর দিকে এগোতে হবে। যদি এই সময়ে ৫/৬টি ক্লাব স্ট্রাকচারাল পরিবর্তনে সক্ষম হয়, তাহলে সেই ৫/৬টি ক্লাব নিয়েই প্রফেশনাল লীগ শুরু করতে হবে।
যদি আগে থেকেই এই ঘোষণা দেওয়া থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো অযাচিত প্রভাব বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না। প্রফেশনাল কাঠামোর আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে—দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কোনো ক্লাবের কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে না, কারণ তখন ক্লাব হবে একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান।
প্রশ্ন ৫২: ক্লাব কর্মকর্তারা খেলোয়াড় নির্বাচন বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করলে একজন কোচ কীভাবে তা সামলান?
মারুফুল হক:আমার দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে আমি কিছু ক্লাবে এই ধরনের হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হয়েছি, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র ও শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র-এ। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে তৎকালীন সময়ে কিছু হাইয়ার অথরিটি তাদের ঘনিষ্ঠ বা অনুগত খেলোয়