05/02/2026
ফাঁকিবাজ দৌড়বিদদের কম কষ্টে আলট্রা রানে সফল হওয়ার চিকন বুদ্ধি! 🙂
🔴নূরুল হুদা🔴
————
এই টাইটেলটা দেওয়ার কারণ একটাই—সবার মনোযোগ আকর্ষণ করা।
আমার লেখাটা আসলে আমি যেভাবে চিন্তা করে আলট্রা শুরু করি এবং কীভাবে একটা ভালো টাইমিং নিয়ে শেষ করার চেষ্টা করি, সেটারই বর্ণনা। এটা আপনাকে ফলো করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দেশে অনেক বড় মানের ট্রেইনার আছেন, তাদের ছোঁবটে ট্রেনিং করলে আরও দারুণ ফলাফল আসতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র আমার মতো “ফাঁকিবাজদের” জন্য—যারা সহজে আলট্রা শেষ করতে চায়।
এবার আসি মূল লেখায়। আমি এই সিস্টেমের নাম দিয়েছি “সিন্দুক থিউরি”, বিষয়টা মনে রাখার সুবিধার জন্য। লেখাটি মোট ৮টি ছোট টপিকের উপর ভিত্তি করে লেখা।
কিছু টপিক বাদ যাচ্ছে, লেখা বড় হয়ে যাবে বলে। ইনশাআল্লাহ, সেগুলো নিয়ে পরে কখনো লিখবো।
⸻
👉 ১/ কয়েক কিলোমিটার বা কিছু পথ বেশি ধরে হিসেব শুরু করাঃ-
প্রথমে আমরা যখন প্ল্যান করি, তখন সাধারণত প্ল্যানের সঙ্গে কয়েক কিলোমিটার বেশি ধরে হিসেব করলে DNF হওয়া এড়ানো যায় এবং ভালো টাইমিংও আসে—যদি রানিং প্ল্যান ঠিক থাকে।
প্রথম টপিকটাই কি একটু উল্টোপাল্টা মনে হচ্ছে? উল্টোপাল্টা মনে হলেও এটাই করা উচিত।
কারণ মানুষের পা সব সময় সোজা চলে না—এদিক-সেদিক যেতেই হয়। এছাড়া হাইড্রেশন, আলট্রা রানে ওয়াশরুম যাওয়া-আসা সহ আরও কিছু কারণে পথ বেড়ে যায়।
অতি সম্প্রতি দেশে অনুষ্ঠিত একটি আলট্রা রানে অনেকের DNF হওয়ার কারণ ছিল ঠিক এই বিষয়টি। তারা কাটায়-কাটায় দূরত্ব হিসেব করে নেমেছিল। ইভেন্টের ডিসটেন্স আর ঘড়ির ডিসটেন্স না মেলার কারণে অনেকের ঘড়িতে দূরত্ব কাভার হলেও টাইমিং চিপে কম দেখিয়েছে। ফলাফল—DNF।
তাই আমরা যদি শুরুতেই একটু বেশি পথ ধরে হিসেব করি, তাহলে বিপদমুক্তভাবে রান শেষ করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।
ধরুন, ৫০ কিলোমিটার ইভেন্টে আমরা হিসেব করবো ৫২ কিলোমিটার ধরে।
৫০ কিলোমিটারের কাট-অফ টাইম ৯ ঘণ্টা বা ৫৪০ মিনিট হলে—
৫৪০ ÷ ৫২ = ১০.৩৮ মিনিট, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার ১০ মিনিট ২৩ সেকেন্ড বরাদ্দ।
⸻
👉 ২/ সঞ্চয় বা সিন্দুক থিউরিঃ-
আমরা ইতিমধ্যেই প্রতি কিলোমিটারের বরাদ্দ টাইম হিসেব করে নিয়েছি—১০ মিনিট ২৩ সেকেন্ড।
এখন প্রথম ২০–২২ কিলোমিটারের মধ্যে চেষ্টা করবো প্রায় ১ ঘণ্টা টাইম সেভ করার। যদি এটা করা যায়, তাহলে পরের পথটা মানসিকভাবে অনেক সহজ হয়ে যায় এবং কনফিডেন্স বাড়ে।
৫০ কিলোমিটারে ৯ ঘণ্টা বরাদ্দ থাকলে, ২৫ কিলোমিটারের জন্য ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
যদি প্রথম ২৫ কিলোমিটার ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে শেষ করা যায়, তাহলে বাকি ২৫ কিলোমিটার অনেক সহজ হয়ে যায়।
কারণ প্রথম অর্ধেকে ১ ঘণ্টা সেভ হয়েছে।
মানে—পরের ২৫ কিলোমিটার বরাদ্দ করা ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে শেষ করলেও আপনি ১ ঘণ্টা আগে ফিনিশ লাইনে পৌঁছাবেন।
এখন দ্বিতীয় ২৫ কিলোমিটারে প্রতি কিলোমিটারের বরাদ্দ থাকবে সেই ১০ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। এখানে চেষ্টা থাকবে—কোনো কিলোমিটারেই এর বেশি সময় না নেওয়া।
প্রথম ২৫ কিলোমিটারে যে ১ ঘণ্টা বাঁচানো হলো, সেটাকে ফিক্সড ডিপোজিটের মতো সিন্দুকে তুলে রাখুন।
২৬–২৭–২৮ কিলোমিটার থেকে প্রতিটা কিলোমিটারেই কয়েক সেকেন্ড করে সিন্দুকে জমা করতে থাকুন।
সব কিলোমিটারে জমা করা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন কী করবেন?
ধরুন, ২৬ নম্বর কিলোমিটারে স্ট্রেচিং ও হাইড্রেশন মিলিয়ে ১৩ মিনিট লেগে গেছে—বরাদ্দের চেয়ে ৩ মিনিট বেশি।
তখন ২৬–৩০ কিলোমিটারের মোট বরাদ্দ টাইম (৫ × ১০:২৩ ≈ ৫২ মিনিট) ধরে হিসেব করবেন। এখান থেকে ১–২ মিনিট সেভ করার প্ল্যান করবেন এবং সেগুলো আগের মতোই সিন্দুকে জমা করবেন।
⸻
👉 ৩/ ভালো টাইমিং কিভাবে হবেঃ-
ভালো টাইমিংয়ে আলট্রা শেষ করার জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো হাঁটার গতি বাড়ানো।
আলট্রা রানে শেষের দিকে দৌড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে—বিশেষ করে আমাদের মতো শৌখিন রানারদের জন্য হাঁটা বাধ্যতামূলক।
হাঁটার গতি বাড়াতে হলে সাধনা দরকার। আমি মাঝে মাঝেই ১ মিনিটে কত স্টেপ ফেলতে পারি তা গুনে হাঁটি। কয়েকদিন প্র্যাকটিস করলেই হাঁটার গতি অনেক বেড়ে যায়।
ফলাফল—প্রতি কিলোমিটার ৯ মিনিট বা তার কাছাকাছি গতিতে ধারাবাহিকভাবে হাঁটা সম্ভব হয়।
⸻
👉 ৪/ মুভিং টাইম বাড়ানো, রেস্ট কমানোঃ-
যত বেশি মুভিং টাইম বাড়ানো যাবে, সফলতার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
মুভিং টাইম বাড়ানোর একমাত্র উপায়—রেস্টিং টাইম কমানো।
পুরো রেসজুড়ে এই বিষয়টায় খেয়াল রাখতে হবে।
⸻
👉 ৫/ রাস্তার এপাশ-ওপাশ কম করাঃ-
অনেক দৌড়বিদ অজান্তেই রাস্তার এপাশ-ওপাশ করে অতিরিক্ত দূরত্ব যোগ করে ফেলে।
সোজা রাস্তার ক্ষেত্রে এক পাশ ধরে টানা দৌড়ানো উচিত।
আর বৃত্তাকার ট্র্যাক হলে—ভেতরের দিক ধরে দৌড়াতে হবে।
যেমন হাতিরঝিল স্টেডিয়াম রানের মত ট্রাকে ভিতরের দিক ধরে দৌড়ানো—হাতিরঝিলে ঝিলের পানির যত কাছে থাকবেন, পথ তত কম হবে।
⸻
👉 ৬/ দৌড়ে টাইম বাঁচাই, হেঁটে নষ্ট করিঃ-
অনেকে দৌড়ে খুব দ্রুত যায়, কিন্তু হাঁটার সময় টাইম নষ্ট করে ফেলে।
উদাহরণ:
৬ মিনিটে ১ কিলোমিটার দৌড়ালেন, পরের কিলোমিটার ১৪ মিনিটে হাঁটলেন—এভারেজ ১০।
কিন্তু ৭ মিনিটে দৌড়ে, ৯ মিনিটে হাঁটলে এভারেজ আরও ভালো হয়।
তাই দৌড়ে টাইম সেভ করে হাঁটার সময় নষ্ট করা যাবে না।
প্রতিটি কিলোমিটারে বরাদ্দ টাইমের বেশি খরচ না করাই মূল কথা।
⸻
👉 ৭/ বন্ধুর পদচিহ্ন এড়িয়ে চলাঃ-
আলট্রা দৌড়ে সবচেয়ে বড় ভুল হলো অন্যকে ফলো করা বা আগে থেকেই পার্টনার সেট করে নেওয়া।
প্রতিটি মানুষের হার্টরেট, পেস ও সহনশীলতা আলাদা।
স্পিড রানারকে ফলো করলে নিজের কমফোর্ট জোন নষ্ট হয়।
আবার দুর্বল পার্টনার হতাশা ছড়ায়।
তাই আগে থেকে পার্টনার ঠিক না করে, দৌড়ের মাঝে যে আপনার পেসে আছে—তাকেই সাময়িক সঙ্গী বানান। এতে সফলতার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
⸻
👉 ৮/ নিউট্রিশনঃ-
গাড়ি চলার জন্য যেমন তেল দরকার, শরীর চলার জন্য তেমনি হাইড্রেশন দরকার।
হাইড্রেশন নিতে হবে দুর্বল হওয়ার আগেই।
দুর্বল হয়ে গেলে হাইড্রেশন নিলে এনার্জি ফিরতে সময় লাগে।
মাসেল ক্র্যাম্প এড়াতে হাইড্রেশনের সঙ্গে থাকা সব ধরনের খাবার টাচ করা জরুরি।
অনেক আলট্রা রানার (আমি নিজেও) দৌড়ের মাঝে ফল খাওয়ার পাশাপাশি চকলেট খাই। কারণ—
চকলেটের চিনি দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং তাড়াতাড়ি শক্তি দেয়।
ফলে থাকা ফাইবার ফ্রুকটোজকে রক্তে মিশতে সময় নেয়।
তাই দৌড়ের মাঝে হাইড্রেশন ও নিউট্রিশনের দিকে নজর রাখলে কয়েক সেকেন্ডের বিনিময়ে কয়েক মিনিট এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
⸻
সবশেষে, এত বড় লেখার জন্য দুঃখিত। এখানে যা লিখেছি, সবই আমার নিজের আলট্রা দৌড়ের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার ফসল। অনেক কিছু ছোট করতে হয়েছে লেখা বড় হয়ে যাওয়ার ভয়ে।
অনেকের সঙ্গে এই প্ল্যান মিলবে না সেটাই স্বাভাবিক—অনেকের প্ল্যান হয়তো আরও ভালো।
আশা করবো, আপনারাও আপনাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন—তাতে আমি সহ অনেকেই উপকৃত হবো।