11/02/2025
খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালের এক উত্তাল সকাল। গ্রীসের ছোট্ট শহর ম্যারাথনের যুদ্ধক্ষেত্রে ধুলো-মাটি উড়ে যাচ্ছে, চারদিকে সৈন্যদের তলোয়ারের ঝনঝনানি আর যুদ্ধের গর্জন। গ্রীকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল পারস্য বাহিনী, যাদের সংখ্যা গ্রীকদের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু গ্রীক যোদ্ধারা জানত, তাদের একটিই পথ—জয় অথবা মৃত্যু।
যুদ্ধ চলল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গ্রীক সেনাপতি মিলতিয়াদেস কৌশলে পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করলেন। শত্রুরা পালিয়ে গেল, যুদ্ধজয় নিশ্চিত হলো। কিন্তু একটা বড় দায়িত্ব রয়ে গেল—এই সুসংবাদ অ্যাথেন্সের জনগণকে জানানো দরকার, যাতে তারা আতঙ্কিত হয়ে শহর ছেড়ে না পালায়।
গ্রীক বাহিনীর সবচেয়ে দ্রুতগতির দূত ফিডিপ্পিদেসের (Pheidippides) ওপর এ দায়িত্ব পড়ল। তিনি যুদ্ধের পুরো সময় লড়াই করেছেন, ক্লান্ত শরীর। তবু দেশের স্বার্থে আরেকটি যুদ্ধ তাকে জিততেই হবে—সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
ফিডিপ্পিদেস জানতেন, সময় কম। কোনো দেরি না করে তিনি দৌড় শুরু করলেন। তখনকার কাঁচা-পথ, পাহাড়ি ভূমি, কাঁটাযুক্ত গুল্ম—সব উপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে চললেন। সূর্যের তীব্র গরম, পানির অভাব, কিন্তু তবুও পা থামল না।
একজন সাধারণ সৈনিকের দৌড় তখন হয়ে উঠেছে ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি মুহূর্ত। তিনি ছুটছেন, শ্বাস ভারী হয়ে আসছে, তবুও থামছেন না।
কোনো ব্রেক নেই, কোনো বিশ্রাম নেই। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু মনে একটাই ভাবনা—“আমাকে পৌঁছাতেই হবে!”
অবশেষে, প্রায় ৪২ কিলোমিটার (২৬.২ মাইল) দৌড়ে তিনি অ্যাথেন্সের প্রধান চত্বরে পৌঁছালেন। জনগণ তার দিকে তাকিয়ে আছে, যুদ্ধের খবর জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
ফিডিপ্পিদেস ধুলো-মাখা শরীর নিয়ে শেষ শক্তি দিয়ে চিৎকার করলেন—
“নিকোমেন!” (আমরা জিতেছি!)
এই কথা বলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলো। ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে, সেই মহান দূত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
ফিডিপ্পিদেসের এই আত্মত্যাগের গল্প কখনো হারিয়ে যায়নি। ১৮৯৬ সালে, যখন প্রথম আধুনিক অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়, তখন তার স্মরণে ম্যারাথন দৌড় আয়োজন করা হয়। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে ৪২.১৯৫ কিমি ম্যারাথন দৌড় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ ম্যারাথনে অংশ নেয়, ফিডিপ্পিদেসের সেই মহান দৌড়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য। তারা হয়তো যুদ্ধের সংবাদ বহন করছে না, কিন্তু প্রতিটি দৌড়ই তাদের নিজস্ব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
এভাবেই, এক সাধারণ সৈনিকের আত্মত্যাগ থেকে জন্ম নিলো পৃথিবীর সবচেয়ে ঐতিহাসিক দৌড়—ম্যারাথন!