21/08/2026
মাঝে মাঝে কি আপনার মনের ভেতর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এক অদ্ভুত শূন্যতা বা একাকীত্ব কাজ করে? একটু খেয়াল করে দেখুন তো, ক্যারিয়ার হয়তো ঠিকঠাক চলছে, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে মেলামেশা হচ্ছে, তবু বুকের গভীরে কেমন যেন একটা খালি খালি ভাব থাকে। মনে হয় জীবনে সব পেয়েও আসল আনন্দটাই যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এই অস্বস্তি আর মানসিক ক্লান্তি ঢাকতে আমরা কত কী-ই না করি, হুটহাট দূরে কোথাও ঘুরতে চলে যাই, নতুন কোনো মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করি, কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ আটকে রেখে সাময়িক ডোপামিন খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু মজার বিষয় হলো, সাময়িক সেই ঘোর বা উত্তেজনা কেটে গেলে ভেতরের সেই পুরোনো অস্থিরতা আবার ফিরে আসে। কখনো কি শান্ত মাথায় একা বসে ভেবে দেখেছেন, আমাদের ভেতরের এই না-বোঝা বিষণ্ণতা আর দীর্ঘস্থায়ী একঘেয়েমির আসল কারণটা ঠিক কী?
বিখ্যাত লেখক ও মানসিক গবেষক রবার্ট গ্রিন এই জটিল মানবিক সংকটের এক অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আমরা যে জিনিসটার অভাব সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করি, তা কোনো নতুন অভিজ্ঞতা, দামি গ্যাজেট বা পদমর্যাদা নয় বরং তা হলো আমাদের নিজেদেরই শৈশবের সেই সাবলাইম বা তীব্র জাদুকরী অনুভূতি। শৈশবে আমাদের পুরো পৃথিবীটাই ছিল এক অপার বিস্ময়ে ভরা। তখন একটি বৃষ্টিভেজা জানালার কাঁচ, মাটির গন্ধ, বাতাসের দোলা, কিংবা ঘরের এক কোণে জমে থাকা ধুলোর মধ্যেও আমরা যে গভীর আনন্দ খুঁজে পেতাম, বড় হওয়ার পর তা পুরোপুরি মুছে যায়। সেই ছোট বয়সে আমাদের মস্তিষ্কে কোনো জটিল ফর্মুলা, সামাজিক নিয়মের শেকল বা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো ভারী বোঝা ছিল না। আমরা পুরো পৃথিবীকে কোনো পূর্বধারণা ছাড়া সরাসরি এবং নিজের সব কটি ইন্দ্রিয় দিয়ে অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভব করতাম।
রবার্ট গ্রিন মানুষের এই মানসিক রূপান্তরকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, বড় হওয়ার সাথে সাথে আমরা আমাদের একটি আসল সত্তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলি, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন Lost Self বা হারিয়ে যাওয়া আদি সত্তা। শৈশব থেকে যখন আমরা কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিই, বিশেষ করে আমাদের বিশের কোঠায় (20s) পৌঁছাই, তখন আমাদের ওপর চারপাশের সমাজের কঠিন প্রত্যাশা চাপতে শুরু করে। আমরা তখন নিজের আসল চিন্তা ভুলে গিয়ে সারাক্ষণ ভাবতে থাকি, লোকে আমাকে দেখে কী ভাবছে? , আমি কি সবার চোখে সফল হতে পারছি? , আমার ক্যারিয়ার বা সামাজিক স্ট্যাটাস ঠিক আছে তো? । মানুষের ইগো, ক্ষমতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজের চোখে সবসময় নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার এই অবিরাম চাপ আমাদের মনের ভেতরের সেই মুক্ত ও কৌতূহলী জানলাটিকে শক্তভাবে বন্ধ করে দেয়।
বাস্তব জীবনের দিকে তাকালে এই সংকটের নির্মম প্রভাব খুব করুণভাবে চোখে পড়ে। আমাদের দক্ষিণ এশীয় সামাজিক বাস্তবতায় একজন তরুণ যখন স্কুল-কলেজ পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় কিংবা নতুন কোনো অফিসে যোগ দেয়, তখন তাকে প্রতিনিয়ত তুলনা আর প্রতিযোগিতার এক অমানবিক ইঁদুর দৌড়ে নামতে হয়। পরিবার ও সমাজের তৈরি ছকে বাঁধা সফলতার সংজ্ঞায় খাপ খাওয়াতে গিয়ে সে তার শৈশবের আঁকাআঁকি, সুরের চর্চা কিংবা অহেতুক কৌতূহল নিয়ে কিছু শেখার আনন্দকে নিজের হাতেই জলাঞ্জলি দেয়। সে হয়তো দিনশেষে একটি ভালো চাকরি পায়, ব্যাংকে কিছু টাকা জমায়, কিন্তু ভেতর থেকে সে হয়ে পড়ে একদম অনুভূতিহীন একটি যান্ত্রিক রোবট। তার পঞ্চেন্দ্রিয় স্থবির হয়ে যায় এবং সে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য ও মানুষকে কেবল কাজের বা প্রয়োজনের নিক্তিতে মাপতে শুরু করে। অফিস পলিটিক্স, পদোন্নতির চিন্তা আর অন্যকে টপকে যাওয়ার ভাবনায় সে এতটাই মশগুল থাকে যে নিজের ভেতরের সত্তাটিই হারিয়ে যায়। আমাদের অবচেতন মন এই নির্মম বন্দিদশা সহজে মেনে নিতে পারে না বলেই মনের গভীরে সেই তীব্র বিষণ্ণতা আর অস্থিরতা প্রতিনিয়ত জন্ম নেয়।
মানসিক দিক থেকে এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি জটিল আত্মরক্ষামূলক ফাঁদ। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আমরা নিজেদের দুর্বল বা অসহায় ভাবতে প্রচণ্ড ভয় পাই। শৈশব মানেই ছিল অন্যের ওপর নির্ভরতা আর না-জানার অনিশ্চয়তা। তাই বড় হয়ে আমরা অবচেতনভাবে সেই শৈশবের সারল্যকে তুচ্ছ মনে করি এবং সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি। কিন্তু রবার্ট গ্রিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, শৈশবের সেই মুক্ত মন কিন্তু বড়দের এই কঠোর মানসিকতার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। কারণ একটি শিশু যেভাবে কোনো স্বার্থ বা হিসেব ছাড়া নতুন নতুন চিন্তার সংযোগ তৈরি করতে পারে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের ইগোর খাঁচায় বন্দি থেকে তা কল্পনাও করতে পারে না।
এই হারিয়ে যাওয়া আদি সত্তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমাদের আবার নতুন করে শিশু হওয়ার দরকার নেই প্রয়োজন শুধু দৃষ্টিভঙ্গির এক সাহসী পরিবর্তন। কোনো নতুন মানুষ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে নিজের অহংকার আর সব জানার ভান একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে। যেকোনো চেনা দৃশ্য বা ঘটনাকেও দেখতে হবে ঠিক সেই ছোট্ট শিশুর সতেজ চোখে, যে প্রথমবারের মতো বিশাল সমুদ্র বা পাহাড় দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ক্ষমতা, কৌশল এবং মানব চরিত্রের আসল খেলায় তারাই সবচেয়ে বেশি দূরদর্শী হন, যারা নিজেদের চিন্তাকে সমাজের কৃত্রিম ছাঁচে আটকে রাখেন না। শৈশবের সেই সতেজ ও গভীর দৃষ্টিকে নিজের ভেতর পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে আপনি কেবল মানসিক প্রশান্তিই পাবেন না, বরং বাস্তব জীবনের যেকোনো জটিল পরিস্থিতি ও মানুষের মানসিক সমীকরণ অন্যদের চেয়ে অনেক আগে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন।
© কালেক্টেড 🃏🪄🎩🎭