15/10/2023
খোলা জানালা
২য় পর্ব
অনন্য শফিক
'
'
(২)
রাতে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ করে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।আর হঠাৎ করে বিছানার পাশে জানলায় ঠকঠক শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠলাম প্রচন্ড ভয় নিয়ে। তারপর ভাবলাম কী করবো আমি!ভয় লাগছিলো প্রচন্ড! যদি জানলার কাছে নতুন ফাঁদ পেতে রাখে আমার শাশুড়ি!তাই জানলা না খুলে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলাম খাটের উপর। এখনও নাক আর কান দুটো প্রচন্ড ব্যথা করছে।মনে হচ্ছে সেই ব্যাথায় আমি পাগল হয়ে যাবো। ঠিক এই সময় বাবা মার কথাও খুব মনে পড়লো। আমার বাবাকে আমি যতটুকু চিনি তিনি খুব সৎ এবং সাহসী পুরুষ।জীবনে কখনো তাকে কোনকিছু নিয়ে সামান্য অবহেলা করতে দেখিনি। দেখিনি কারোর দু পয়সা মেরে খেতে।
কারোর উপর মিথ্যে চাপিয়ে দিতে।বাবা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে একশোবার ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেন। এবং এই বিয়ের সিদ্ধান্তটাও তিনি খুব ভেবেচিন্তেই নিয়েছিলেন।বাবা বলেছিলেন তার ছাত্রীর ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিলে এতো বাছ বিচারের কী প্রয়োজন! তাছাড়া আমার শাশুড়ি আমার মায়েরও বান্ধবী। স্কুল জীবনে মার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল আমার শাশুড়ির। তবে এটা সত্য আমার মা বাবার সাথে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পালিয়ে গিয়েছিলেন এই জন্য যে বাবা স্কুল মাস্টার হলেও তার ধন সম্পদ কিংবা বংশ-গৌরব অতটা উন্নত ছিল না। কিন্তু আমার নানা তৎকালীন সময়ের এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তিদের একজন ছিলেন।অগাধ ধনসম্পদের মালিকও ছিলেন তিনি।নানা বাবা মার প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি বলেই বাবা মা পালিয়েছিলেন।বিয়ে করেছিলেন বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে। তারপর ফিরে এলে নানা মেনেও নিয়েছিলেন সেই বিয়ে। আমি এতো কিছু জানলে ওই বিষয়টা কেন জানবো না যে আব্বার সাথে আমার শাশুড়ির বিয়ে ঠিক ছিল!
'
জানলায় এখনও শব্দ হচ্ছে। বিরতিহীন।ঠক ঠক ঠক। ভাবলাম জানলাটা একবার খুলেই দেই!
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এটা নাঈম ছাড়া আর কেউ না। নাঈমের প্রতি আমার প্রচন্ড রাগ আছে। এই রাগটা অন্তত ঝেড়ে নেয়া যাবে এখন।আর কোনভাবে এখান থেকে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারলে এদের প্রত্যেকটার নাকে বড়শি দিয়ে ঘুরিয়ে ছাড়বো!
মনে প্রচন্ড সাহস নিয়ে জানলা খুলতেই দেখি সারা শরীরে চাদর আবৃত কেউ দাঁড়িয়ে আছে
দেখে আমার হৃৎপিণ্ড কেমন কেঁপে উঠলো। এই গরমের সময় আবার চাদর পরে আসবে কে!এ এক নতুন ষড়যন্ত্র না তো?আমি তড়িঘড়ি করে জানলাটা লাগিয়ে দিতে চাইতেই চাদরের ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে খপ করে আমার হাতটা ধরে ফেললো। ভয়ে আমি চিৎকার করতে গিয়েও চিৎকার করতে পারলাম না। শুধু বড় বড় চোখে তাকালাম।আর তখন দেখি চাদরের ভেতর থেকে নাঈমের মুখটা বেরিয়ে আসছে। আমি তখন শব্দ করেই বলে উঠলাম,
--- 'হাতটা ছাড়ুন।হাত ধরেছেন কেন?'
--- নাঈম ফিসফিস করে বললো,'আস্তে।কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।'
--- 'কী দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে?'
--- 'তোমার সাথে কথা বলতেছি এইটা। আম্মা জানে আমি এখন ঘুমিয়ে গেছি। কিছুক্ষণ আগে মিছেমিছি নাক ডেকে প্রমাণ করেছি যে আমি এখন ঘুমে বিভোর। আমি ঘুমিয়ে গেছি এটা প্রমাণ হবার পর আম্মাও ঘুমিয়ে গেছে। আমি আসার সময় দেখে এসেছি আম্মা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।'
আমার ঘেন্না হচ্ছিল ওর প্রতি। আমি ভাবতেও পারছিলাম না একটা ছেলে কী করে এমন কাপুরুষ হয়!আমি তখন রাগের গলায় বললাম,
--- 'আপনার মতন এমন কাপুরুষ আমি জীবনেও দেখি নাই। আপনি আমার হাত ছাড়ুন।যান এখান থেকে। নাইলে আপনার মুখের উপর আমি বমি করে দিবো!'
আমি একটানে নাঈমের হাত থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম।নাঈম তখন কাচুমাচু করে বললো,
--- 'প্লিজ! তুমি আমায় ভুল বুঝো না। আমি আম্মাকে ম্যানেজ করে ফেলবো এক দুই দিনের ভেতর। আম্মা কোন কারণে তোমাদের উপর রাগ। সেই রাগ থাকবে না দেখো!'
আমি ওর কথা শুনে জানলার কপাটটা ঠাস করে লাগিয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু এর আগেই ঘরের দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলো আমার শাশুড়ি।তার সাথে আরো একজন কম বয়সী মেয়ে। আমার শাশুড়ি এসেই আমার চুল টেনে ধরে বললেন,
--- 'কার সাথে পিরিত করস হারামজাদি? আমি আগেই সন্দেহ করছিলাম তোরে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ!'
বলে আমার মুখের উপর তিনি একদলা থুথু ছিটিয়ে দিলেন।আমি তখন চিৎকার করে বললাম,
--- 'আপনি এমন অসভ্যতামি করছেন কেন আমার সাথে? আমি আপনার ছেলের সাথে কথা বলছিলাম। নিজের স্বামীর সাথে কথা বলাও কী অপরাধ?'
--- আমার শাশুড়ি তখন বললেন,'তুই বললেই হইলো আমার ছেলের সাথে কথা বলছস! আমার ছেলে ঘরে ঘুমাচ্ছে।'
--- আমি তখন আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম,'ওই দেখুন,জানলার বাইরে দেখুন আপনার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।'
কিন্তু আমার শাশুড়ি যখন তাকালেন তখন দেখা গেল নাঈম আর ওখানে নাই।আমার শাশুড়ি তখন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আমার গালে ক্রমাগত চড় বসিয়ে দিতে শুরু করলেন।আর ওই মেয়েটি বাড়ির সকলকে ডেকে তুলতে লাগলো এই বলে যে,
--- 'আপনারা উঠেন। সবাই ঘুম থেকে উঠেন। উঠে দেখেন নতুন বউ তার প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে খালাম্মার হাতে ধরা খাইছে !'
'
(৩)
সারা পাড়া জেনে গেলো আমার সম্পর্কে।সবার মুখে এক কথায় নাঈমের বউ ভালো না। নাঈমের বউ ভালো না।বাসর রাতে নিজের বর রেখে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যেতে গিয়ে ধরা পড়েছে নাঈমের বউ। ছিঃ ছিঃ ছিঃ!নাঈম তার মার কাছে এসে বললো,
--- 'আম্মা, তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করতেছো। এইসব করে কিন্তু নিজের মান সম্মান নষ্ট করতেছো!'
আমার শাশুড়ি তখন রেগেমেগে আগুন হয়ে নাঈমকে বললেন,
--- 'লায়েক হয়ে গেছো তুমি?বউয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মে গেছে।যে মা তোমারে জন্ম দিছে তারে ভুইলা এখন বউয়ের সাফাই গাও! আমারে মান সম্মান শিখাও?'
নাঈম এবার ধীরে সুস্থে তার মাকে বললো,
--- 'আম্মা, তুমি প্রতিশোধের আগুনে কান্ড জ্ঞান হীন হয়ে পড়েছো! আর প্রতিশোধ তুমি কার থেকে নিচ্ছো? মীরার কী অপরাধ এখানে? ভুল করলে তার বাবা মা করেছে।সাহস এবং শক্তি থাকলে তার বাবা মাকে শাস্তি দাও।কথা শোনাও!'
নাঈমের মা ছেলের এমন প্রতিবাদী কন্ঠ শোনে খুব একটা অবাক হলেন না। বরং ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক চিলতে হাসি নিয়ে বললেন,
--- 'জানাবো।ওর মাকে এক্ষুনি জানাবো।জানাবো, কেমন পতি*তা মেয়ে জন্ম দিয়েছে সে এই কথা! আমার কথা শোনার পর ওর মা গলায় দড়িও দিতে পারে লজ্জায়!'
নাঈমের মায়ের কথাগুলো শুনে লজ্জায়, ঘৃণায়,দুঃখে আমার চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমার প্রতিবাদ করার ইচ্ছে হলেও প্রতিবাদ করছি না। প্রতিবাদ করছি না এইজন্য যে আমি এখানে মুখ খুললেই এখানে জমায়েত লোকেরা আমাকেই দোষবে। আমি যতই সত্য বলি তারা কখনো আমার সত্য তাদের কানে তুলবে না।কিন্তু নাঈমের প্রতিবাদ আমার ভালো লাগছে। গতরাতে যে কাপুরুষ নাঈমকে আমি দেখেছিলাম সেই নাঈম আর এই নাঈমের মধ্যে অনেক পার্থক্য!নাঈম এবার তার মাকে বললো,
--- 'তুমি মিথ্যে করে মীরাকে দোষছো। গতকাল আমিই জানলা দিয়ে মীরার সাথে কথা বলছিলাম।'
--- নাঈমের মা মুখ ভেঙচিয়ে বললেন,'বললেই হলো! আমি দেখেছি তুই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস। এখন বউকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলছিস।'
--- নাঈম তখন শব্দ করে হেসে বললো,'আম্মা, তুমি না মা!মা কী করে সন্তানকে এমন নিকৃষ্ট আদেশ নিষেধ করে? এই যে গতকাল আমার বাসর ছিল। সেই বাসরকে তুমি রক্তাক্ত করেছো। নিজের পুত্রবধূর নামে মিথ্যা কুৎসা রটাচ্ছো! পুত্রকে নিষেধ করেছো স্ত্রীর কাছে যেতে। তোমার কথা মেনেই আমি বাসর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আসার পর মনে হলো আমি ঠিক করিনি। আমি ভুল করছি।বাবা মার সৎ আদেশ মানা যাবে কিন্তু অসৎ আদেশ মানলে উল্টো পাপ হবে।এটা ভেবেই আমি লুকিয়ে ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তুমি কিন্তু তা জানো যে আমি লুকিয়ে মীরার সাথে দেখা করতে গিয়েছি। জানার পরেও তোমার প্রতিশোধের আগুনে ওকে জ্বালানোর উদ্দেশ্যে তুমি মিথ্যে বলছো। তোমার পুত্র এবং পুত্রবধূর উপর মিথ্যে অপবাদ তুলছো!'
নাঈমের মা তখন জড়জড় করে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, '
--- দেখেছো গো তোমরা দেখেছো? এই আমার কপাল। নিজের ছেলে ঘরে বউ এনেই মাকে কী রকম অপমান করছে?'
সবাই তখন হৈ চৈ শুরু করলো। তাদের মূলকথা একটাই।ছেলে বউভক্ত হয়ে গেছে।আর ওই মেয়েটি এসে নাঈমের মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আহাজারি শুরু করলো।নাঈম তখন তাকে ধমকে দিয়ে বললো,
--- 'তুই হলি বড় ডাইনি!তুই ই আম্মার কানে মন্রণা দিচ্ছিস?'
মেয়েটি মুখ ঝামটি দিয়ে বলল,
--- 'আমি কোন দোষে মন্ত্রণা দিতে যাবো?'
--- 'তোকে বিয়ে করিনি এই জন্য! আমি তোকে চিনি না তুই যে কত বদ? বিয়ের আগে তুই যখন আমায় প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলি আর আমি যখন না করলাম তখন তুই এর প্রতিশোধ নিতে কী করেছিলি মনে নাই? আমার বোনের মতো বান্ধবীর সাথে আমি নোংরা কী করেছি তুই মানুষের কাছে বলে বেড়াসনি?'
মেয়েটি তখন একেবারে চুপ মেরে গেলো। কিন্তু মুখ খুললো মেয়েটির খালা অর্থাৎ আমার শাশুড়ি। তিনি বললেন,
--- 'বাজে কথা বন্ধ কর।আর আমার সামনে থেকে এক্ষুনি চলে যা বলছি।'
--- নাঈম বললো,'চলে তো যাবোই। কিন্তু এখন না। যাওয়ার আগে আমি মীরার বাবা মাকে ফোন করে এখানে নিয়ে আসবো। তারপর তোমার শোধ তুমি ওদের কাছ থেকে নিবে।আর মীরাকে মুক্তি দিবে।'
নাঈমের মা ছেলের অতবড় সাহসীকতা হয়তো মেনে নিতে পারেননি।তাই তিনি নাঈমের গালে একটা চড় বসিয়ে বললেন,
--- 'আমার কথার বাইরে আরেকটা কথা বললে তোর জিহ্বা কেটে ফেলবো বেয়াদব। তুই ফোন করতে পারবি না। ফোন করবো আমি। '
বলে নাঈমের মা তার বুকের গোপন জায়গা থেকে মোবাইল ফোন বের করলেন। তারপর---
'
চলবে