27/07/2026
সৌন্দর্যের মূল্য
--------------------
রাত তখন প্রায় দুইটা।
পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে। জানালার ওপাশে শুধু দূরের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির বাতি নিঃসঙ্গভাবে জ্বলছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কয়েকটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি, পুরোনো প্রশ্নপত্র, নোটবুক আর এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা। বইয়ের পাতা খুলে আছে, কিন্তু চোখ আর অক্ষরের মধ্যে যেন কোনো সম্পর্ক নেই।
হঠাৎ মনে হলো—এই কয়েক বছর আমি আসলে কী করেছি?
শৈশবের আনন্দ বিক্রি করেছি ভবিষ্যতের কাছে। যৌবনের হাসি বন্ধক রেখেছি একটি পরিচয়ের জন্য। বন্ধুরা যখন বেড়াতে গেছে, আমি লাইব্রেরিতে বসেছি। তারা যখন নতুন পোশাক কিনেছে, আমি ভেবেছি পরীক্ষার ফি কীভাবে দেব। তারা যখন প্রেমপত্র লিখেছে, আমি আবেদনপত্র লিখেছি।
জীবন যেন আমাকে একটাই কথা বলেছে—"আরও একটু অপেক্ষা করো।"
আমি অপেক্ষা করেছি।
একটা চাকরির জন্য।
একটা সম্মানের জন্য।
একটা পরিচয়ের জন্য।
এই অপেক্ষার পথে কত জোড়া জুতা যে ক্ষয় হয়েছে, তার হিসাব নেই। প্রতিটি জুতার তলায় লেগে আছে ধুলোমাখা রাস্তা, সরকারি অফিসের সিঁড়ি, পরীক্ষার কেন্দ্রের করিডোর, আর অগণিত প্রত্যাখ্যানের নীরব ইতিহাস।
কিন্তু সেই রাতেই আমার মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন এল।
হয়তো পৃথিবীর কোনো প্রান্তে, কোনো অচেনা শহরে, কোনো মেয়ে এই মুহূর্তে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে হয়তো নিজের চুল আঁচড়াচ্ছে, মুখে সামান্য ক্রিম মাখছে, নতুন একটি শাড়ি কিংবা পোশাক পরে নিজেকে দেখছে। হয়তো সে নিজেকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলছে।
কেন?
হয়তো ভবিষ্যতের জন্য।
হয়তো এমন একজন মানুষের জন্য, যাকে সে এখনও চেনে না।
হয়তো সেই মানুষটি... আমি।
এই ভাবনাটি যতটা সুন্দর, তার চেয়েও বেশি বিস্ময়কর।
আমরা দুজনই পরিশ্রম করছি—কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন পথে।
আমি সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছি।
সে হয়তো নিজের স্বপ্ন, রুচি, ব্যক্তিত্ব কিংবা সৌন্দর্যকে গড়ে তুলছে।
দুজনেরই গন্তব্য হয়তো এক—একটি পরিবার, একটি সংসার, একটি নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু তখনই আমার ভেতরের আরেকটি কণ্ঠ প্রশ্ন করল—
"তুমি কি সত্যিই একজন মানুষকে বা তার মনকে পাবে? নাকি তুমি শুধু তার সৌন্দর্যের অধিকার পাবে?"
আমি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলাম।
মানুষের জীবনে কি সবকিছুরই মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায়?
যে বাবা নিজের সন্তানের জন্য সারাজীবন পরিশ্রম করেন, তিনি কি সন্তানের ভালোবাসা কিনে নেন?
যে মা রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেন, তিনি কি তার মায়ের অধিকার কিনে নেন?
যে বন্ধু বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ায়, সে কি বন্ধুত্বের দাম চুকিয়ে দেয়?
না।
তাহলে একজন জীবনসঙ্গীর ভালোবাসাকেও কি "অর্জন" বা "কেনা"র ভাষায় মাপা যায়?
সমাজ মাঝে মাঝে আমাদের এমন ধারণা দেয়—ভালো চাকরি, ভালো বেতন, বড় বাড়ি, দামি গাড়ি থাকলে যেন সুন্দর একজন মানুষকে পাওয়া যায়।
কিন্তু সত্যি কি তাই?
ইতিহাস বলছে—অগণিত ধনী মানুষ নিঃসঙ্গ থেকেছেন, আবার অনেক দরিদ্র মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা পেয়েছেন।
কারণ ভালোবাসা কোনো বাজারের পণ্য নয়।
সৌন্দর্যও নয়।
রূপ কখনো কখনো চোখকে মুগ্ধ করে, কিন্তু চরিত্র হৃদয়কে মুগ্ধতা দেয়।
মুখের সৌন্দর্য সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। চুলে পাকে সাদা রঙ, মুখে পড়ে ভাঁজ, চোখের দীপ্তি ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। কিন্তু একজন মানুষের সততা, মমতা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ—এসব যদি সত্য হয়, তবে সেগুলো বয়সের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সেদিন বুঝলাম, আমার এত বছরের সংগ্রামের লক্ষ্য কোনো সুন্দর মুখ নয়।
আমার লক্ষ্য ছিল এমন একটি জীবন গড়া, যেখানে আমি কাউকে সম্মান দিতে পারব, নিরাপত্তা দিতে পারব, ভালোবাসতে পারব, আর তার স্বপ্নের পাশে দাঁড়াতে পারব।
যদি কোনো দিন সত্যিই আমার জীবনে সেই অচেনা মানুষটি আসে, আমি তাকে বলব না—
"আমি এত কষ্ট করেছি, তাই তোমাকে পেয়েছি।"
বরং বলব—
"তুমিও নিশ্চয়ই তোমার নিজের লড়াই লড়ে এখানে পৌঁছেছ। এসো, এবার আমরা দুজনের গল্প একসঙ্গে লিখি।"
সেদিন হয়তো আমরা বুঝব, কেউ কাউকে কেনে না।
কেউ কাউকে জয়ও করে না।
মানুষ কেবল একে অপরকে গ্রহণ করে।
আর সেই গ্রহণের মধ্যেই জন্ম নেয় ভালোবাসা।
হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কগুলো তৈরি হয় তখনই, যখন দুইজন মানুষ একে অপরকে পুরস্কার হিসেবে নয়, বরং সহযাত্রী হিসেবে দেখে।
কারণ জীবন কোনো প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে শেষে একটি সুন্দর মুখ পুরস্কার হয়ে অপেক্ষা করে।
জীবন একটি দীর্ঘ পথচলা।
সেখানে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় হলো—পথের শেষে কে তোমার হাত ধরে বলে,
"চলো, এবার থেকে পথটা আমরা একসঙ্গে হাঁটি।"
রচনায়-
নাঈম