07/10/2026
মেসির ক্যারিয়ারের সেরা গোল কোনটি?
কাতার বিশ্বকাপের আগেও এই প্রশ্নটা আমাকে করা হলে উত্তর দিতে ভিরমি খেতাম। মেসির সব গোলই আমার দেখা, বেশিরভাগই লাইভ দেখা। এতো অজস্র গোলের মধ্যে চোখ জুড়ানো, অবাস্তব, গুরুত্বপূর্ণ, ফলাফল পাল্টে দেওয়া গোলের সংখ্যা নেহাৎ কম না। একটা বিশেষ গোলকে সেরা বলাটা বেশ কঠিন বৈকি।
কিন্তু আজ, আর্জেন্টিনা থেকে মেসির বিদায়ের দিনে এসে আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি। আমার মতো বেশিরভাগ "মেসির শুভাকাঙ্ক্ষী" ই পেয়ে গেছেন উত্তরটা। মেসির ক্যারিয়ারে এখন এমন একটি গোল আছে, যেটাকে অনায়াসে সেরা বলা যায়।
সেই গোল কোনটি? চলুন, ঘুরে আসি একটি শীতের রাতে।
সাতাশ নভেম্বরের প্রথম প্রহর। দু'হাজার বাইশ।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সৌদির বিপক্ষে হেরে গেছে আর্জেন্টিনা। পরের দুই ম্যাচ মেক্সিকো ও পোল্যান্ডের সাথে, জয়ের যেখানে বিকল্প নেই। মেসি অবশ্য সমর্থকদের বলেছেন তাঁদের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে, কিন্তু গোল বলের ঘূর্ণি বোঝার সাধ্য কার? বিশ্বকাপে টিকে থাকতে আর্জেন্টিনার চাই জয় অথবা জয়, এমনভাবেই মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজলো।
প্রথমার্ধে ভয়ংকর রকমের বাজে খেললো আর্জেন্টিনা। সম্ভবত নিজেদের শক্তিমত্তা, প্রত্যাশা এবং প্রতিপক্ষের বিচারে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে জঘন্য হাফ ছিল সেটি। আর্জেন্টিনা তো কোনোরকম সুযোগ পাচ্ছিলোই না, উল্টো মেক্সিকোর দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক আরো দুর্দান্তভাবে সেইভ করে নিজেদেরকে হিসেবের বাইরে যেতে দিলেন না এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। প্রথমার্ধ শেষের বাঁশি বাজতেই একরাশ হতাশা নেমে এলো স্টেডিয়াম এবং বিশ্বের প্রতিটি কোণের স্ক্রিনের সামনে ভীড় করে রাখা আকাশী-নীল সমর্থকদের চোখেমুখে।
কোথায় চ্যাম্পিয়ন হবার স্বপ্ন, কোথায় সবচেয়ে বাজে দল হিসেবে বাদ যাওয়ার আশঙ্কা!
কোথায় মেসির হাতে সোনালী ট্রফি দেখার স্বপ্ন, কোথায় চিরতরে ফুটবলকে বিদায় জানানোর জন্য হাজারো সমর্থকের প্রস্তুতি!
মেসি তখনো শান্ত। ঝড়ের পূর্বে সমুদ্রের মতো। বিস্ফোরণের আগে পিনপতন নীরবতা।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর আগে যথারীতি টানেলে দেখা গেলো মেসি এবং বাকিদেরকে। চোখে-চোখে এবং আলগোছে কীসের যেনো কথা সেরে নিলেন তাঁরা। রেফারির বাঁশি বাজলো, এবং শুরু হলো দ্বিতীয়ার্ধ।
শুন্য হাতে বাড়ি ফেরা ঠেকাতে আর্জেন্টিনার সময় আছে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
হয়তো গোল করো, কেউ একজন স্টেপ আপ করো, নয়তো ম্যাচ শেষে দুঃখের নীল সাগরে ডুবে যাও, ঠিক নিজেদের জার্সির মতো।
কিন্তু আর্জেন্টিনা তো খেলায় তাল মেলাতেই পারছে না। স্টেপ আপ করবে কে?
ম্যাচ ঘড়িতে ৬৩ মিনিট পেরোলো।
এনজো ফের্নান্দেজ পাস দিলেন ডি মারিয়াকে।
ডি মারিয়া ইতিউতি চাইলেন, রাইট উইং ধরে খানিকটা এগিয়ে যাওয়া মলিনাকে পাস দিতে গিয়েও শেষ মুহুর্তে আটকালেন। তারপর লম্বা পাসে বাড়িয়ে দিলেন মিডে থাকা মেসির দিকে।
আচ্ছা, আর্জেন্টিনার একটা গোল দরকার, হাপিত্যেশ করছে পুরো দল, ঠিক সেই মুহুর্তে স্টেপ আপ করেন কে?
চৌদ্দ বিশ্বকাপে ইরানের সাথে, আঠারো বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ারে বাঁচা-মরার ম্যাচে ইকুয়েডরের সাথে কিংবা বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার সাথে? সবগুলোর উত্তর একই না?
হ্যাঁ, একই তো। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি, আরেকবার যখন হাপিত্যেশ করছে পুরো দল, যখন ডি মারিয়া পরম ভরসা করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন বল, তখন তিনি কী করবেন?
মেসি বলটা রিসিভ করলেন, বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাঁ পায়ে শট নিলেন সজোরে। সামনে মেক্সিকোর গোলবার, যেটা আগলে রেখেছেন গুলার্মো ওচোয়া, বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ এলেই যিনি প্রতিপক্ষের জন্য হয়ে ওঠেন ত্রাস!
শটটা যখন মেসি নিচ্ছেন, তখন কি এসব ত্রাস আদৌ শোভা পায়?
মেসি শট নিলেন সজোরে, ওচোয়া সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পেলেন না। বলটা পেরিয়ে গেলো ওচোয়ার হাত, সামনে কেবল জাল, যেখানে পৌঁছালেই লেখা হয়ে যাবে বিশ্বকাপের ভাগ্য।
বলটা পৌঁছে গেলো জালে, আর
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
গর্জে উঠলো পুরো স্টেডিয়াম, রোজারিও-বুয়েন্স এইরেস থেকে ঢাকা-দিল্লী, পৃথিবীর প্রতিটি আনাচ-কানাচ।
ফুটবলের কবি পিটার ড্রুরি তখন গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছিলেন,
"Lionel Messi... Messi's hit... Oh! That's what they came for! The magic man! One more Messi moment and Argentina are alive!"
এরচেয়ে ভালোভাবে বোধহয় কেউ বর্ণনা করতে পারতো না।
ম্যাচ ঘড়িতে তখন দেখা যাচ্ছিলো ৬৩:৩২ মিনিট। ৬৩ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে মেসি রচনা করলেন ইতিহাস, বদলে দিলেন ম্যাচের গতিপথ, স্পিরিট এনে দিলেন সতীর্থদের শরীরে, যারা পরবর্তীতে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বকাপের শেষ মিনিটে।
বিজয়ীর বেশে!
আজ সায়াহ্নে এসে আমরা সেই ইতিহাস মনে করে পরম তৃপ্তিতে জাবর কাটতেই পারি, "আহা! মেসির ক্যারিয়ারের সেরা গোলটি নিজের চোখে দেখেছিলাম বটে!"