08/06/2026
বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে পাঁচ ধরনের ক্যান্সার: কী কারণে বাড়ছে ঝুঁকি?
বাংলাদেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ১ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ এই রোগে মৃত্যুবরণ করছেন। একই সঙ্গে দেশে ক্যান্সার নিয়ে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণ, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার মধ্যে পাঁচটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. খাদ্যনালীর ক্যান্সার
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে খাদ্যনালীর (Esophageal Cancer) ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২৫ হাজার রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
এই ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। মৃত্যুহারও উদ্বেগজনক; ক্যান্সারজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় এক-পঞ্চমাংশই খাদ্যনালীর ক্যান্সারের কারণে ঘটে।
২. মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার
আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার। বর্তমানে দেশে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই রোগে ভুগছেন এবং প্রতিবছর প্রায় ১৬ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জর্দা, গুল, সাদাপাতা, তামাক ও ধূমপানের ব্যাপক ব্যবহার এই ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
৩. ফুসফুসের ক্যান্সার
ফুসফুসের ক্যান্সার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী ক্যান্সার। বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
চিকিৎসকদের মতে, ধূমপানের পাশাপাশি বায়ুদূষণও ফুসফুসের ক্যান্সার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দূষিত বায়ুর দেশ হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
৪. স্তন ক্যান্সার
নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্তন ক্যান্সার। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের নারী ক্যান্সার রোগীদের একটি বড় অংশ এই রোগে আক্রান্ত।
বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি নারী স্তন ক্যান্সার নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীদের মধ্যেই এই রোগ বেশি শনাক্ত হচ্ছে।
৫. জরায়ুমুখের ক্যান্সার
বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে মৃত্যুহারের দিক থেকে জরায়ুমুখের ক্যান্সার অন্যতম শীর্ষে। বর্তমানে ২৬ হাজারের বেশি নারী এ রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর প্রায় ৯ হাজার ৫০০ নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
চিকিৎসকরা মনে করেন, নিয়মিত স্ক্রিনিং, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং HPV টিকার বিস্তৃত প্রয়োগের মাধ্যমে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কেন বাড়ছে ক্যান্সার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে—
- বায়ু ও পরিবেশ দূষণ
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার
- ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
- অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা
- অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
- সংক্রমণজনিত ঝুঁকি ও টিকাদানের সীমিত কভারেজ
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিংয়ের অভাব
চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সারের বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, তামাক বর্জন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণের মাধ্যমে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্যনালী, মুখ ও ঠোঁট, ফুসফুস, স্তন এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে আগামী বছরগুলোতে ক্যান্সার দেশের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।