20/07/2026
|| বিশ্বকাপে যা পেয়েছি ||
বিশ্বকাপ শেষ। কী এক ঘোরের মধ্যে আমাদের কাটল দেড়টা মাস। বিশ্বকাপ এমনই; উত্তেজনা-উন্মাদনায় আমাদের যেন অদ্ভুত এক সময়ে নিয়ে যায়, যখন জীবনের অবিচ্ছদ্য অংশ হয়ে যায় ফুটবল।
ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এই বিশ্বকাপটা অন্যরকম স্মরণীয় হয়ে রইল। প্রথমবারের মতো মাঠে থেকে কাভার করা হলো পুরোটা টুর্নামেন্ট। সেটাও আবার আমেরিকার মতো জটিল-কঠিন দেশের একেকটা স্টেট ঘুরে ঘুরে। এটা একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের কাছে বড় এক স্বপ্ন পূরণের মতোই।
একজন সাংবাদিক হিসেবে চেষ্টা করেছি নিজের সেরাটাই দিতে। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বিরাট ক্রীড়াযজ্ঞে, যেখানে বাংলাদেশের নামগন্ধও নাই, সেখানে বাংলাদেশকে নানাভাবে কানেক্ট করা, প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা ছিল। আপনারা আমার কনটেন্ট দেখেছেন, নানাভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ভিডিওতে বিশেষ জোর দিলেও এ সময়ে আমার পত্রিকায় (Ajker Patrika) এক শর কাছাকাছি লেখাও লিখেছি (এখন ফেসবুকে কিছু শেয়ার না দিলে অবশ্য কাজ সম্পর্কে মানুষ কমই জানতে পারে)। এ যাত্রায় আমার সঙ্গে থাকায় আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
এই বিশ্বকাপ থেকে অনেকগুলো ‘মোমেন্টস’ পেয়েছি, যা আমার কাছে অনেক মূল্যবান। সুযোগ হয়েছে বড় বড় দল, বড় তারকা, ফুটবল কিংবদন্তিদের খুব কাছ থেকে দেখার। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার। চেষ্টা করেছি সে সব আপনাদের সামনে তুলে ধরার।
এটা তো জানেনই, ব্রডকাস্টার বাদে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অনেক জায়গায় বিশেষ করে মিক্সড জোনের (ম্যাচ শেষে যেখানে খেলোয়াড়েরা সাংবাদিকদের খুব কাছে চলে আসেন) প্রবেশাধিকার খুব একটা মেলে না। ডালাসে এরকম একটা সুযোগ আমার মিলেছিল। জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে আছি। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা তাদের স্প্যানিশ ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে চলে যাচ্ছেন। এমিলিয়েনো 'দিবু' মার্তিনেজও চলে যাচ্ছিলেন। শুরুতে ডাক দিলাম, নো রেসপেন্স। সেটাই স্বাভাবিক। তখনই চিৎকার করে উঠলাম, ‘দিবু, আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ’।
বাংলাদেশ শুনেই দিবু ফিরে এলেন। ফিরে আসার এই দৃশ্যটা আমার কাছে অতি মূল্যবান মুহূর্ত হয়ে আছে। আমার কাছে ‘মোমেন্টস অব দ্য টুর্নামেন্ট’। অসংখ্য টেকনিক্যাল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে যেতে থাকা দিবু মার্তিনেজের কাছে আর কী জানতে পারি? মুহূর্তেই মনে হলো, তাঁদের জন্য বাংলাদেশের দর্শকেরা যে পাগল, যেভাবে ভালোবাসে, তাঁদের উদ্দেশেই জানতে চাই। মার্তিনেজ আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বললেন। আর মুহূর্তেই সেই ভিডিও শুধু বাংলাদেশেই নয়; আর্জেন্টিনাসহ প্রায় পুরো ফুটবল পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়ল।
আর্জেন্টিনার অনেক সাংবাদিক এরপর থেকে আমাকে এমনভাবে চিনে গেলেন, সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। আর পুরো টুর্নামেন্টে যেখানেই গিয়েছি, আর্জেন্টাইনরা বাংলা ভাষা শুনলেই চিনে ফেলত, এরা বাংলাদেশি। তারা পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।
আরেকটা অসাধারণ মুহূর্ত এসেছিল আটলান্টায় সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার সংবাদ সম্মেলনে। হলভর্তি ৫০০-৬০০ সাংবাদিকের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে সুযোগ হয়েছিল আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিকে প্রশ্ন করার। ৩০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এত এত প্রশ্ন হলো, আমি আর কী জানতে পারি? আমার কাছে মনে হলো, টেকিনিক্যাল কিছু নয়, বাংলাদেশকে নিয়ে আর্জেন্টিনা কী ভাবে, তাদের উদ্দেশে কী বার্তা থাকবে—এটাই শুনি।
প্রশ্ন করতে যখন মাইক্রোফোন হাতে নিলাম, দেখি আমার গলা কাঁপছে! এত মানুষের মাঝে একজন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কোচকে প্রশ্ন করছি, পেশাদারি বর্ম ছাপিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল। যেভাবে প্রশ্নটা সাজিয়েছি, যেন ঠিকঠাক করতে পারি, ফোনের স্ক্রিনে তাকাচ্ছিলাম। প্রশ্নটা অনুবাদক অ্যাপে শুনে স্কালোনি দারুণ এক উত্তর দিলেন। বারবার ধন্যবাদ জানালেন বাংলাদেশকে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল এই ভিডিও।
নিজের অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝে নানাভাবে চেষ্টা করেছি আপনাদের কাছে বিশ্বকাপের নানা খবর পৌঁছে দিতে। কখনো বিশ্বকাপ না খেলা একটা দেশের সাংবাদিক হিসেবে চেষ্টা করেছি নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরার, চেষ্টা করেছি সব জায়গায় বারবার বাংলাদেশকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে। প্রায় দেড় মাসের জার্নিতে এত এত গল্প, অভিজ্ঞতা, একটা বই না লিখলেই যেন নয়!
লাখ লাখ অডিয়েন্স আমার কনটেন্ট দেখেছেন, ভালো-মন্দ নানা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার জন্য দোয়া করবেন।